কেন আন্দোলনে এলাম: ইলিরা দেওয়ান

0
9
বিদ্যুৎহীন গাঁয়ে সন্ধ্যার পর পরই মনে হয় যেন গভীর রাত। সেই নিশুতি রাতে একটা গ্রামের শ’ দুয়েক লোক নিঃশব্দে এগিয়ে চলছে গহিন অরণ্যের দিকে- নিরাপত্তার খোঁজে।
কিন্তু তার আগে পেরিয়ে যেতে হয় গাঁ ঘেষে চলে যাওয়া একটি পথ, যে পথই কিনা যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। যেকোনো মুহূর্তে সেনাবাহিনীর লরি এসে হেডলাইটের আলোতে পুরো পথ আলোকিত করতে পারে।
তাই সর্বদা আতঙ্ক থাকত, এই বুঝি সেনাসদস্যরা এসে পড়ল! কেউ পেছনে থাকতে চাইত না। পিঠে একটা সুড়সুড়ি অনুভব করত। খুব ছোটবেলায় এই ঘটনা ছিল প্রায় নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা।
‘আর্মি আসছে’- এই দুটো শব্দে মুহূর্তে প্রত্যেকটি মানুষের মুখের ভৌগোলিক রেখা পরিবর্তিত হয়ে যেত এবং যত দ্রুত সম্ভব বহনযোগ্য তল্পিতল্পা গুটিয়ে অনিশ্চিত যাত্রা শুরু হতো।
এভাবেই একটা অবোধ শিশুর জীবনসংগ্রামের পথচলা শুরু। সেই অভাগা শিশুটি আর কেউ নয়, স্বয়ং আমি।

বর্তমানে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসেছি। হয়তো ভাগ্য আমাকে বিমুখ করতে পারেনি বলে আজ এই ঢাকা শহরে অন্য দশটি স্বাধীন ছাত্রছাত্রীর সঙ্গে পড়তে পারছি।

আজ যারা আমার সহপাঠী তারা নিশ্চয় আমার মতো আতঙ্কের মধ্যে বড় হয়নি। তাদের শৈশব ছিল পিতামাতার আদর-ভালোবাসার ছায়ায় নিরাপদ একটি সুন্দর জীবন।

আর সেই সময়ে আমি ছিলাম সেনাবাহিনীর তাড়া খাওয়া আতঙ্কিত এক অবোধ শিশু। এই পরিবেশে বড় হওয়া যেকোনো শিশুর পক্ষে মানসিক বিকারগ্রস্ত হওয়া অসম্ভব কিছু নয়।

কিন্তু যে শিশুর বোধ-জ্ঞান এভাবে আতঙ্কের মাঝে শুরু হয়েছে, তার পরও সেই শিশু আজ পর্যন্ত সুস্থ মস্তিষ্কে লেখাপড়ার পাশাপাশি সামাজিক, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে জড়িয়ে রেখে শৈশব পেরিয়ে কৈশোর, তারুণ্যে পা রেখে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে- এ যেন অলৌকিকতা। এভাবেই আমার শৈশব শুরু।

সেনাবাহিনী নিরাপত্তার নামে যখন পার্বত্য অঞ্চলের বনজ সম্পদ ধ্বংসের খেলায় মেতে ওঠে তখন পাহাড়িদের লুকিয়ে থাকার আর কোনো জায়গা নেই।

চারদিক থেকে ন্যাড়া পাহাড়গুলো যেন তাদের দুরবস্থা দেখে বিদ্রুপ করত। এই পরিস্থিতিতে প্রতিরোধই একমাত্র হাতিয়ার হয়ে দাঁড়াল।

তাই তো দেখেছি, আমাদের গ্রামে যখন পার্শ্ববর্তী এলাকার অনুপ্রবেশকারী (সেটেলার) বাঙালিরা হামলা করতে আসত তখন সবাই যার যার বাড়িতে যেসব আত্মরার হাতিয়ার- দা, কুড়াল, বঁটি, বিয়ং (তাঁতের সরঞ্জাম) ইত্যাদি নিয়ে রুখে দাঁড়াত।

তবে এসব হামলার ক্ষেত্রে বরাবরই সেনাবাহিনী প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করত। তাই প্রতিটি হামলায় পাহাড়িরা হয় প্রাণ দিত, নতুবা মারাত্মকভাবে জখম হতো।

এভাবে ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছি, পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরাপত্তার নামে নিয়োজিত সেনাবাহিনী কীভাবে পাহাড়ি নিধন খেলায় মেতে উঠত।

মনে পড়ে, অনেক ছোটবেলায় একবার খুব ভোরে আমাদের পুরো গ্রাম সেনাবাহিনী ঘিরে ফেলল। সকাল হতে না হতেই গ্রামের ছোট-বড় সবাইকে স্কুলের মাঠে জড়ো করে, প্রথমে গ্রামকে দুই ভাগ করে ঘিরে রাখে।

গ্রামের উত্তর পাশে আমার বাবার জ্ঞাতিগোষ্ঠীরা বেশি থাকত এবং দক্ষিণ পাশেও ছিল। যাহোক, ভোর হতেই সেনাসদস্যরা বাড়ির উঠোনে জড়ো করে একজন একজন করে ডাকছে আর পিটিয়ে পিটিয়ে তাদের স্কুলের মাঠে পাঠিয়ে দিচ্ছে।

যখন সবাইকে একে একে আসতে বলা হচ্ছে তখন কেউ আগে আসতে চাইছিল না। কিন্তু সবাইকে তো আসতেই হবে।

মনে আছে, বাবাই প্রথম এসেছিলেন। আসার সঙ্গে সঙ্গেই বাবাকে বাঁশের গোড়ার অংশ দিয়ে পেটাতে শুরু করল। বাবার মুখ থেকে তখন কেবল একটিই শব্দ বের হচ্ছিল- যম! যম!! উফ্! মনে করতে চাই না আর সেই স্মৃতি।

এরপর পিটিয়ে পিটিয়ে নারী, শিশু এবং পুরুষদের আলাদা করে রাখা হলো। বাচ্চাদের একদিকে জড়ো করে সবাইকে দুপুর পর্যন্ত মাথা নিচু করে থাকতে হয়েছে।

কেউ মাথা তুললে তাকে চিকন বাঁশের কঞ্চি দিয়ে মাথায় পেটাত। আর পুরুষ ও নারীদের একজন একজন করে ডেকে বিভিন্নভাবে নির্যাতন ও জিজ্ঞাসাবাদ করত আর নির্বিচারে পেটাত।

কেউ প্রতিবাদ করতে গেলে তাকেই আমগাছে ঝুলিয়ে নাকে মুখে কলসি থেকে পানি ঢেলে দিত। এ ঘটনা এখনো চোখ বুঝলে স্পষ্ট দেখতে পাই। খুবই ছোটবেলার ঘটনা বলে এখনো মনের গভীরে ত হয়ে আছে।

১৯৮৩ সালের একটি ঘটনা। ছোট ছিলাম বলে মাসটা আর মনে নেই। শীতকাল ছিল- এইটুকু মনে আছে।

ভোরে ঘুম থেকে জেগে উঠেছি বাড়ির বড়দের চাপা কথাবার্তা শুনে। কিছুক্ষণ পর্যন্ত কোনো কিছু ঠাহর করতে পারিনি।

পরে বুঝেছিলাম, গ্রামে সেনাবাহিনী ঢুকেছে এবং বেশ কয়েকটা বাড়ি তল্লাশি করার পর আমার এক কাকাকে ধরেছে এবং সকাল থেকে সেই শীতের মধ্যে খালি গায়ে রেখে তাঁকে পেটাচ্ছে। কারণ কাকা ছিলেন শান্তিবাহিনীর সদস্য।

পরে শুনেছি, এক ইনফরমারের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর লোকেরা নির্দিষ্ট টার্গেট নিয়ে এসেছিল এবং কাকাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। সেদিনই কাকাকে খাগড়াছড়ি সদর থেকে হেলিকপ্টারে করে চিটাগং নিয়ে যায়।

দাদু ছিলেন গ্রামের কার্বারী। কিন্তু দাদুকে গ্রামের মুরুব্বি হিসেবে সেদিন সেনাবাহিনী কোনো কথাই বলতে দেয় নি। এদিকে দাদিমা, পিসি ও কাকিমারা বিলাপ করতে করতে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন।

কারণ কাকা ছিলেন খুবই হালকা-পাতলা। যেভাবে পেটাচ্ছিল, পরে আবার প্রাণটাও না হারায়!

মনে পড়ে, খুব ছোটবেলায় আতঙ্ক-ভরা দৃষ্টি নিয়ে সরকারি রাস্তার দিকে চেয়ে থাকতাম। তখন ঝাঁকে ঝাঁকে বাঙালি সেটেলাররা পিলপিল করে পাহাড়ে ঢুকছিল।

খুব ছোট ছিলাম বলে মাঝে মাঝে কৌতূহল ভরে ‘ওই বাঙালিরা’ বলে চিৎকার করতাম। আর দাদু চাপা গলায় ধমক দিয়ে সেখান থেকে সরে যেতে বলতেন। তখন তো বুঝিনি কী সর্বনাশটা তখন হচ্ছিল।

১৯৮৬ সাল। তখন কাস সিক্সে পড়ি। আমরা ছোট ছোট তিন ভাইবোন খাগড়াছড়িতে থাকতাম। বাবা আর মা গ্রামের বাড়িতে থাকতেন তাঁদের কর্মস্থলের কারণে।

সেদিন (১ মে ১৯৮৬) স্কুলে গেছি। টিফিন পিরিয়ডের সময় হঠাৎ হইচই শুরু হয়ে গেল। মুহূর্তে জানা গেল, সেটেলার বাঙালিরা মহাজনপাড়ায় বাড়িঘর পুড়িয়ে দিচ্ছে।

আমরা কেবল স্কুলের বারান্দা থেকে কুণ্ডলী পাকিয়ে ওঠা ধোঁয়া দেখতে পাচ্ছি। অবশেষে টিচারদের সহায়তায় সন্ধ্যার আগে বাসায় পৌঁছলাম।

সেখানে দেখলাম, রাস্তার পশ্চিম পাশের বাড়িঘরগুলো বহাল তবিয়তে থাকলেও রাস্তার পূর্ব পাশের প্রায় সব বাড়িঘর পুড়ে ছাই হয়েছে।

যেহেতু এসব বাড়িঘর ছিল পাহাড়িদের। সৌভাগ্য, না দুর্ভাগ্য বলব আমাদের বাসা ছিল রাস্তার পশ্চিমাংশে। তাই তো সেদিন বাসায় ঢুকতে পেরে কিছুটা স্বস্তি পেলেও শান্তি পাইনি। সর্বদা আতঙ্ক ছিল, এই বুঝি আমাদের বাসায়ও হামলা করতে আসছে।

১৯৮৬ সালের পর থেকে কেবল ভয়ে ভয়ে থাকতাম। আর প্রায় প্রতিদিনই খবর আসত, আজ অমুক জায়গায় ঘটনা হয়েছে তো কাল আরেক জায়গায়। ঘটনাগুলো নানা মুখ ঘুরে বিভিন্নভাবে বিশ্লেষিত হয়ে আসত আরেকভাবে। তখন ভয়টা আরও চেপে বসত।

১৯৮৮ সালের ঘটনা। আমার এক মাসির সঙ্গে দীঘিনালায় বেড়াতে গিয়েছিলাম। তাঁদের বাড়ি ছিল দীঘিনালা থেকে বেশ দূরে ‘উদলবাগান’ নামক গ্রামে।

সেদিন গাড়ি পাইনি। তাই কেবল দুজনে হেঁটে যাচ্ছিলাম। তখনো জানতাম না, সেসব জায়গায় বাড়িঘর থাকলেও সেগুলো ছিল জনশূন্য। পরে নানা কথা বলতে বলতে মাসি হঠাৎ বললেন, ‘জানো, এই যে বাড়িঘর দেখছ, এগুলোতে কিন্তু লোকজন নেই। সবাই ভারতে শরণার্থী হয়ে গেছে।’

‘কেউ নেই’- কথাটা শুনে এমন শিউরে উঠলাম, তখন আর আমার পা চলছিল না। একটা ভয় চারপাশে কেমন যেন ঘিরে ধরেছিল। চারপাশে জনমানব নেই। ওই ভরদুপুরে রাস্তার ওপর আমরা কেবল দুটি মানুষ হাঁটছি। এও কি সম্ভব?

রাস্তায় মানুষ ছিল না, কিন্তু প্রাণী ছিল। নির্দিষ্ট দূরত্ব অন্তর সেনাবাহিনীর চেকপোস্ট ছিল। সেদিনের অভিজ্ঞতা আজও আমাকে কুঁকড়ে রাখে।

১৯৮৯ সালে জেলা পরিষদ নির্বাচন এল। শান্তিবাহিনীর নির্দেশ, ‘নির্বাচন বয়কট করো।’ আর সেনাবাহিনীর নির্দেশ, ‘তোমরা ভোটকেন্দ্রে আসো।’

উভয় সংকটে পড়ল সারা পার্বত্য জনগণ। বাবা খাগড়াছড়িতে এসে বলে গেলেন, ‘ভোটের দিন তোমরা কেউ বাড়ির বাইরে যেয়ো না।

কারণ শান্তিবাহিনী নাকি খাগড়াছড়ি টাউনের দিকে রকেট ছুড়ে মারবে। সুতরাং সাবধান থেকো।’ এদিকে বাবার ভোটের ডিউটি পড়েছে ‘নুনছড়ি’ নামক একটা জায়গায়।

ভোটের দিন বাবা ডিউটি শেষ করে আর বাড়ি ফিরতে পারেননি যথাসময়ে। তবে ওই কেন্দ্র থেকে এসে অন্য জায়গায় ছিলেন।

রাত আনুমানিক ১১টার সময় গোলাগুলি শুরু হলো। আমরা সবাই ঘুম থেকে উঠলাম। তখন সবাই ধারণা করছিল, নুনছড়িতেই বোধ হয় ওই যুদ্ধটা হচ্ছিল।

আর বাবার কথা চিন্তা করে আমি কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছি। দাদা (বড় ভাই) যত চুপ করতে বলে তত আমার কান্নার বেগ বাড়ে। হয়তো আমার কান্না দেখে তারও সে সময় খারাপ লাগছিল। তাই আমাকে চুপ থাকতে বলছিল।

এরপর ১৯৯২ সালের এপ্রিল মাস। বিজু উৎসবের আয়োজন প্রায়ই শেষ। কেবল দিনটির অপেক্ষায় ছিলাম। কিন্তু তার আগে সর্বনাশ ঘটল।

১০ এপ্রিল লোগাংয়ে সেটেলার বাঙালি আর সেনাবাহিনীর সদস্যরা মিলে গ্রাম পুড়িয়ে দিল আর শতাধিক লোককে গুলি ও জবাই করে মেরে ফেলল।

সারা বছরের কাক্ষিত উৎসবটাই শোকে পরিণত হলো। এর প্রতিবাদে খাগড়াছড়িতে হাজার হাজার লোকের শোকমিছিল বের হলো। এ মিছিল দেখে প্রশাসনও ভয় পেয়েছিল।

১৯৯১ সালে সংসদীয় নির্বাচনের মাধ্যমে নাকি গণতন্ত্র ফিরে এসেছে দেশে। সেই গণতান্ত্রিক সরকারের উপহার হিসেবে আমরা পেয়েছি ‘৯২ সালের লোগাং গণহত্যা, ‘৯৩ সালের ১৭ নভেম্বর নানিয়াচরের গণহত্যা, ‘৯৬ সালে সহযোদ্ধা ও বন্ধু কল্পনা চাকমাকে হারালাম সেনাবাহিনীর কারণে।

‘৯৭ সালে আবার বিজু উৎসবকে বানচাল করে দেওয়ার জন্য মাইচছড়িতে সামান্য পকেটমারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সেটেলার ও সেনাবাহিনী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধিয়েছিল।

কল্পনা চাকমার অপহরণের প্রতিবাদ করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে রূপন, মনতোষকে যেমন হারিয়েছি তেমনি অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে নিতীশ চাকমা, ক্যজাই মারমা, অমর বিকাশ চাকমাসহ ভরদাস মুণির মতো ৭০ বছরের বৃদ্ধকেও প্রাণ দিতে হয়েছে।

বহু মা-বোনকে লাঞ্ছিত হতে হয়েছে সেটেলার বাঙালি ও সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য নিরাপত্তাবাহিনীর হাতে।

এর পরও কি একজন সচেতন ছাত্রী হিসেবে জুম্ম জনগণের মুক্তিসংগ্রামে সম্পৃক্ত হওয়া যুক্তিযুক্ত নয়?

এসব অন্যায়-অবিচারের প্রতিবাদ করতে তাই আজ রাজপথে নেমেছি। অশ্রু ভেজা মায়ের মুখে একটুখানি হাসি ফোটাবার জন্য এই লড়াই। মায়ের মুখে আমরা হাসি ফোটাবই ফোটাব।

(১০ বছর আগের এই লেখা খুঁজে পেলাম। পড়ে দেখছি এ লেখার উপযোগিতা এখনো অনেকাংশে বিদ্যমান। পাঠকরাই বলুন, কতটা বদলেছে পাহাড়ের চিত্র? )

 


 লেখকঃ ইলিরা দেওয়ান: হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক।
[email protected]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here