ককবরক ভাষা ও সাহিত্য বিকাশ প্রসঙ্গ

0
28

আমি ভাষা গবেষক, ভাষাতত্ত্ব নিয়ে কাজ করি। ককবরক ভাষাতত্ত্বের কাজ করতে গিয়ে ককবরক সাহিত্যের বিভিন্ন ধারার সাথে পরিচিত হতে পেরে গর্ব অনুভব করছি।

সে আলোকেই ককবরক ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশ প্রসঙ্গে কিছু আলোচনা করতে চাই। বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় আসার পরে ১৯৭৯ সালে ককবরক ভাষাকে রাজ্য ভাষার স্বীকৃতি প্রদান করে।

অবশ্য সরকারী স্বীকৃতি পাওয়ার সাথে সাহিত্য বিকাশের কোন সম্পর্ক নেই। ১৭০৩ সালে দুর্গাপ্রসাদ ত্রিপুরার সাহিত্য সৃষ্টি ১৯০০ সালে রাধামোহন ঠাকুরের এবং ১৯৫৪-৫৭ সালে সুধন্বা দেব্বর্মা সম্পাদিত কতাল কথমা যুগেও সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছিল।

সরকারী স্বীকৃতি ছিল না বলে সাহিত্য বিকাশের কাজ থেমে থাকেনি। ককবরক নাটক উপন্যাস এর আগেই তৈরী হয়ে গেছে।

সুধন্বা দেব্বৰ্মার কালজয়ী উপন্যাস ‘হাচুক খুরিঅ’ যার বাংলা অর্থ পাহাড়ের কোলে রাজার আমল থেকে শুরু করে কংগ্রেস এবং আধুনিকতম রাজনৈতিক দল উপজাতি যুব সমিতির চিন্তা ধারা ও কাজকর্ম পর্যন্ত বিস্তৃত।

কিন্তু সরকারী স্বীকৃতি পাওয়ার যে দিকটা সেটা হল স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটিতে সে ভাষা চালু করতে গেলে যে গল্প বই-এর দরকার, যে নাটক বই-এর দরকার এবং উপন্যাস, কবিতা ইত্যাদি বই-এর দরকারের প্রসঙ্গ স্বাভাবিক ভাবে এসে যায়।

সেগুলো আমরা কতটুকু তৈরী করতে পেরেছি সেটা আলোচনার বড় বিষয়। ককবরককে Midium of instruction বা শিক্ষার মাধ্যম করতে হলে যে সমস্ত বাস্তব পদক্ষেপ নেয়া উচিত ছিল সরকারী সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তা হয়ে উঠেনি।

যার ফলে এই ২৫বছরে সাহিত্যের যে দিকটা এগিয়ে এসেছে সে দিকটাই বাণিজ্যিক এবং শিক্ষার স্তরে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে একের সঙ্গে অন্যের পরিপূরক অবস্থাটা সহাবস্থান করতে পারেনি বলে ককবরক সাহিত্যের বর্তমান স্তর সেভাবে পরিস্ফূটিত হয়ে উঠেনি।

ককবরক সাহিত্য আজ জাতীয় স্তরে পুরস্কৃত হওয়ার পরও অনেক লেখকের অভিজ্ঞতা আছে, ককবরক পাঠকগণ সেভাবে সাড়া দিচ্ছেন না।

নরেশ বাবু কথায় কথায় বলেছিলেন, আমাদের পার্শ্ববর্তী রাজ্য আসামের বড়ো ভাষাভাষীদের বছরে অন্তত একশ টাইটেলের বই বেরোয় এবং ভাল বিকোয়।

সে তুলনায় আমাদের ককবরকে সে বাংলা হরফেই হোক কিংবা রোমান হরফেই হোক বই বাজারে বেরোলে পাঠকরা তা কিনেন না।

এমনকি বাড়ীতে পৌঁছে দিলেও ততটা আগ্রহ সহকারে গ্রহণ করেন না। তাহলে আজ সরকারী স্বীকৃতির ২৫ বছরের মাথায় আমাদের সমালোচনা করা দরকার ককবরক পাঠকরা তার মাতৃভাষার সাহিত্য সৃষ্টির প্রতি কেন অনাগ্রহ দেখাচ্ছেন।

এটা আজ বড় প্রশ্ন। চাইনিজ ভাষার লিখিত বয়স যদি পাঁচ হাজার বছর হয় তাহলে চাইনিজ ভাষার অংশ হিসেবে ককবরকের বয়স সমবয়স্কের অধিকারী।

যদিও আধুনিক ককবরকের বয়স অনেক কম হবে। প্রাচীন ককবরক বা Old Boro যাকে বলা হয় তার বয়স আরও বেশী হবে।

ককবরকের দুটো সহোদরা-একটি Bodo এবং একটু দূরবর্তী গারো ভাষা আজ অনেক দূর এগিয়ে।

কিন্তু সাহিত্যের Expression করার ক্ষমতা ককবরকের যা আছে আমি জানিনা তার দুই সহোদরার তা আছে কি না। তাহলে আজ প্রশ্ন হচ্ছে ককবরক পাঠক পাচ্ছেনা কেন?

এর গভীরে যদি তলিয়ে দেখা হয়, তাহলে দেখা যাবে ককবরক ভাষা স্বীকৃতি পাওয়ার প্রশ্নে যতটুকু ঐক্যমতে পৌঁছা গিয়েছিল ককবরক ভাষার শিক্ষাদিক্ষার ক্ষেত্রে এ ভাষাভাষী লেখক বুদ্ধিজীবীগণ সেরকম ঐক্যমতে পৌঁছতে পারেন নি।

সমাজে স্তর বিন্যাস হয়েছে। যারা একটু উচ্চ মধ্যবিত্ত তারা তাদের সন্তান সন্ততিদের লেখাপড়া শেখাচ্ছেন। বাংলাতেও নয় একেবারে ইংরেজীতে।

এই ঝোঁকটা যে কোন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যেই আছে যে ভাষা রিচ্ বা ধনী সে ভাষায় লেখাপড়া শেখানো। কিন্তু নিজ ভাষার প্রতি অবহেলা করে কেন?

ককবরক ভাষার বিকাশের ক্ষেত্রে একটা Understanding-এর অভাব আছে।

প্রধান কথা হচ্ছে, মাতৃভাষায় প্রাথমিক স্তর পর্যন্ত লেখাপড়া শেখাব এই প্রতিশ্রুতি থেকে আমরা সরে আসছি।

এটা সরকারী দোষ নয়, দোষটা হচ্ছে ককবরক ভাষাভাষী গার্জীয়ান, বুদ্ধিজীবী এবং চিন্তাবিদদের।

আজ সরকারী স্বীকৃতির পচিশ বছর পূতির্তে যতটুকু সরকারী দোষ ত্রুটি আছে তার থেকেও বেশী ককবরক বুদ্ধিজীবী, চিন্তাবিদদের।

আমি বাইরের লোক। ভাষা গবেষক হিসেবে এসেছিলাম। আমাদের যা বিচার বুদ্ধি, ভাষাতত্ত্বের যা আঙ্গিক সে বিচার বুদ্ধি এবং আঙ্গিক অনুসারে কাজ করার প্রচেষ্টা নিয়েছি।

আমরা স্ক্রিপ্ট সমস্যা থেকে পিছিয়ে এসেছি। তার কারণ, একটা সেন্টিমেন্ট এসে গেছে রোমান স্ক্রিপ্টে ককবরক লেখা হবে না বাংলা স্ক্রিপ্টে? অথবা ককবরকের জন্য আলাদা স্ক্রিপ্ট গ্রহণ করা হবে কিনা?

আমরা গবেষকরা কোন অবস্থায় কোন স্ক্রিপ্ট হওয়া উচিত তা বলে দিই। কিন্তু যদি তা আঙ্গিকের বাইরে চলে যায় এবং ভাষাতত্ত্বের প্রিন্সিপল এর বাইরে চলে যায়, তাহলে আমরা আর কথা বলিনা, নীরব থাকি।

আমি একটা কথা বলেছিলাম – মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, মেঘালয়ে যে স্ক্রীপ্ট চলে ত্রিপুরায় তা চলে না এবং ত্রিপুরায় যে স্ক্রীপ্ট চলে সে স্ক্রীপ্ট সে সমস্ত রাজ্যে চলেনা।

এটা আমাদের ভাষাতত্ত্বের কথা। কিন্তু এপ্রসঙ্গ এখানে আর তুলছিনা।

সাহিত্যের প্রেক্ষিতে বলতে গিয়ে আমার মনে হয়েছে, ককবরক সাহিত্য যতটুকু এগুচ্ছে আরো বেশী এগুতে পারত, ভারত বর্ষের শ্রেষ্ঠ ভাষাগুলোর মধ্যে আসন নিতে পারত এবং এখনো পারবে যদি আমরা ককবরক ভাষাভাষী বুদ্ধিজীবীরা একটি জায়গায় মিলিত হতে পারি।

রাজনীতির উর্ধ্বে উঠে জাতিগত ভাবে এই ভাষা বিকাশের কাজে মিলিত হওয়া দরকার যেখানে কোন গণ্ডি যেন না ওঠে, কোন ওয়াল যেন না ওঠে।

 


লেখকঃ কুমুদ কুন্ডু চৌধুরী, ককবরক ভাষা গবেষক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here