আদিবাসীদের ভাষা চর্চা ও উন্নয়ন: আমাদের করণীয়

0
188

পটভূমিকা

পৃথিবীর ৭টি মহাদেশের ৭০টি দেশে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ একাংশ, প্রায় ১৫০ মিলিয়ন আদিবাসী বসবাস করে এশিয়া মহাদেশের বিভিন্ন দেশে। যেমনঃ বাংলাদেশ, মায়ানমার, চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, মালয়েশিয়া, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, শ্রীলংকা এবং থাইল্যান্ড। প্রায় ৩০ মিলিয়ন আদিবাসী বাস করে ল্যাটিন আমেরিকায়। বলিভিয়া, গুয়াতেমালা ও পেরুর মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশী হচ্ছে আদিবাসী জনগণ।

আদিবাসীদের রয়েছে স্বতন্ত্র সংস্কৃতি, ভূমিসংলগ্ন জীবন-জীবিকা, ধর্ম এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের কাঠামো। কিছু কিছু ধারণ করে ঐতিহ্যগত জীবন পদ্ধতি। তারা মূলত নিজেদের মৌলিক পরিচিতিটাকে বজায় রাখতে চায়। কিন্তু নিজেদের স্বতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্য সত্ত্বেও আদিবাসীরা অর্থনৈতিক ও সামাজিক দিক দিয়ে পশ্চাৎপদ। অনেক ক্ষেত্রেই তারা বৈষম্য, দারিদ্র, স্বার্থহীনতা, বেকারত্ব প্রভৃতির শিকার। তাদের ভূমি ও সম্পদ, বনায়ন, খনি, বাঁধ, সড়ক নির্মাণ, রাসায়নিক বর্জ্য নিষ্কাশন, পারমাণবিক পরীক্ষা, সেচ প্রকল্প প্রভৃতি ক্ষতিকারক উন্নয়ন কাজের কারণে আজ হুমকির সম্মুখীন।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের মতে, বাংলাদেশে ৪৬টির অধিক আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী স্মরণাতীত কাল থেকে বসবাস করে আসছে। এসব জাতিগোষ্ঠী যুগ যুগ ধরে নিজস্ব সমৃদ্ধ সমাজ, সংস্কৃতি, রীতিনীতি, ধর্ম-ভাষা ও নৃতাত্ত্বিক পরিচিতি নিয়ে এ অঞ্চলে বসবাস করে আসছে। তাদের শাসনতান্ত্রিক ইতিহাস, সামাজিক রীতিনীতি, ভৌগোলিক পরিবেশ, দৈহিক-মানসিক গঠন, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় জীবনযাত্রা বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জনগোষ্ঠী থেকে স্বতন্ত্র।

১৯৯১ সালে আদামশুমারী অনুসারে বাংলাদেশের মোট ১১,১৪,৫৫,১৮৫ জনসংখ্যার মধ্যে প্রাক্কলিত আদিবাসী জনসংখ্যা সর্বমোট ১২,০৫,৯৭৮, যা দেশের জনসংখ্যার ১.০৮%। তার মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে ৫,১৪,৮০৫ জন এবং সমতলে ৬,৯১,১৭৩, যা দেশের সর্বমোট আদিবাসী জনসংখ্যার অনুপাত যথাক্রমে ৪২.৬৭% এবং ৫৭.৩৩%। তবে আদিবাসীদের মতে, যথাযথভাবে আদমশুমারী না হওয়াতে আদিবাসীদের জনসংখ্যা কম দেখানো হয়েছে।

আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীসমূহ নিজেদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবী জানিয়ে আসছে। সরকার এসব জাতিগোষ্ঠীসমূহকে উপজাতি, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, আদিবাসী, indigenous, aboriginal, tribal হিসেবে আখ্যায়িত করে আসছে। তবে ইদানিংকালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় ‘আদিবাসী’ ও ‘Indigenous’ শব্দসমূহকে পরিহার করে ‘উপজাতি’ শব্দ ব্যবহারের পক্ষে মতামত প্রদান করেছেন। অন্যদিকে ২০১০ সনে প্রণীত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইনে আদবাসীদেরকে ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ ও ‘আদিবাসী’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। তবে আদিবাসীরা ‘আদিবাসী’ পরিচয়ই পছন্দ করে এবং বিভিন্ন ফোরামে এই পরিচয় মানার জন্য জোর দাবী জানিয়েছে।

করুণা শিশু সদন
করুণা শিশু সদন

দেশের অনেক আইনে, সরকারী পরিপত্র ও দলিলে এবং আদালতের রায়ে এসব জাতিসমূহকে ‘আদিবাসী’ বা তার সমার্থক গোষ্ঠী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যেমনঃ পূর্ববঙ্গ রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০ আইনে aboriginal castes and tribes শব্দ ব্যবহার হয়। ১৯৯৫ সালের অর্থ আইন Indigenous Hillmen ও “আদিবাসী গিরিবাসী” শব্দ ব্যবহার করে পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসীদের আয়কর প্রদান থেকে অব্যহতি দেয়ার বিশেষ প্রবিধান রেখেছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশন, ১৯০০ (১৯০০ সালের ১নং রেগুলেশন) আইনে Indigenous tribes, Indigenous Hillman শব্দ ব্যবহৃত হয়।

শুধু তাই নয়, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বয়ং ২০০০ ও ২০০৯ সালে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম কর্তৃক প্রকাশিত ‘সংহতি’ সংকলনে প্রদত্ত বাণীতে এসব জাতিসমূহকে “আদিবাসী” হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। এছাড়া মহাজোটের ২৩ দফা দাবীনামা/কর্মসূচী, বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র, ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহার ও ২০০৯ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় কাউন্সিল কর্তৃক গৃহীত ঘোষণাপত্র ও কর্মসূচীতে সুস্পষ্টভাবে “আদিবাসী” শব্দটি উল্লেখ রয়েছে।

এই প্রবন্ধটি মূলত HTNF, JAC, Kapaeeng & Cara-Bangladesh কর্তৃক জুন ২০০৫, রাঙ্গামাটি থেকে প্রকাশিত মায়ের ভাষায় পড়তে চাই Introduce Mother Language Education সংকলনে প্রকাশিত মৃণাল কান্তি ত্রিপুরা, মং সিং ক্রো ও সুখেশ্বর চাকমার লেখা “আদিবাসীদের ভাষা প্রচলন ও চর্চা” প্রবন্ধের উপর ভিত্তি করে রচিত হয়েছে আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীসমূহের পরিচিতি, স্বকীয়তা ও অধিকার রক্ষার্থে সাংবিধানিক সংস্কার, রাজা দেবাশীষ রায় ও মঙ্গল কুমার চাকমা, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস সংখ্যা, কাপেং ফাউন্ডেশন, ১০ ডিসেম্বর ২০১১, ঢাকা।

খ. আদিবাসীদের ভাষাগত অধিকার ও আইনগত ভিত্তি

ইউনেস্কো কর্তৃক একুশে ফেব্রুয়ারীকে ‘আন্ত-র্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণার আগেও আদিবাসীদের মাতৃভাষার অধিকার বিভিন্ন আন্ত-র্জাতিক সনদগুলোতে স্বীকৃত হয়েছিল। ১৯৫৭ সালে ৫ই জুন আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ৪০তম অধিবেশনে ১০৭নং কনভেনশনে আদিবাসী ও উপজাতি ভাষাকে প্রাধান্য দিয়ে কিছু নীতিমালা তৈরি করে। উক্ত কনভেশন-এর ২৩(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর ছেলেমেয়েদেরকে তাদের মাতৃভাষায় পড়তে ও লিখতে শিক্ষা দান করতে হবে, কিংবা যেখানে এটা সম্ভব নয়, সেক্ষেত্রে তাদের সমগোত্রীয়দের মধ্যে সাধারণভাবে প্রচলিত ভাষায় শিক্ষা দান করতে হবে।’ আবার ২৩ (২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘মাতৃভাষা বা আদিবাসী ভাষা থেকে জাতীয় ভাষা কিংবা দেশের একটি অফিসিয়াল ভাষায় ক্রমান্বয়ে উত্তরণের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।’

১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি’-র ‘খ’ খন্ডের ৩৩নং ধারার (খ)-এ বলা হয়েছে, ‘পরিষদের (পার্বত্য জেলা পরিষদ) কার্যাবলীর ৩ নম্বরে নিম্নোক্ত বিষয়সমূহ সংযোজন করা হবেঃ ১) বৃত্তিমূলক শিক্ষা ২) মাতৃভাষার মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষা ও ৩) মাধ্যমিক শিক্ষা।’ চুক্তি অনুযায়ী ১৯৯৮ সালে পার্বত্য জেলা পরিষদ সংশোধনী বিলের মাধ্যমে বিষয়সমূহ আইনে অন্তর্ভূক্ত হয়েছে। রাঙ্গামাটি/খাগড়াছড়ি/ বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন ১৯৯৮-এর ৩৬(ঠ) ধারায় ‘মাতৃভাষার মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষা’কে আইনগত স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ সরকার স্বাক্ষরিত ‘আনর্জাতিক শিশু অধিকার সনদ’এর ৩০নং ধারায় উল্লেখ রয়েছে, ‘যেসব দেশে জাতিগোষ্ঠীগত, ধর্মীয় কিংবা ভাষাগত সংখ্যালঘু কিংবা আদিবাসী সমপ্রদায়ের লোক রয়েছে, সেসব দেশে ঐ ধরনের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ভুক্ত বা আদিবাসী শিশুকে সমাজে তার নিজস্ব সংস্কৃতি ধারণ, নিজস্ব ধর্মের কথা ব্যক্ত করা ও চর্চা করা, তার সম্প্রদায়ের অপরাপর সদস্যদের সাথে ভাষা ব্যবহার করার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।’

১৯৬৬ সালে জাতিসংঘ ঘোষিত International Covenant on Civil and Political Rights -এর ২৭নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “যেসব রাষ্ট্রে নৃতাত্ত্বিক, ধর্মীয় বা ভাষাভিত্তিক সংখ্যালঘু বাস করেন, সেখানে ঐসব সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলির মানুষেরা ব্যক্তিগত এবং গোষ্ঠীগতভাবে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, নিজেদের ধর্ম অনুসরন করা ও প্রচারের অধিকার নিরংকুশভাবে ভোগ করবে।’

এ সমস্ত রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক চুক্তি, সনদ প্রভৃতির আলোকে এখন প্রয়োজন হচ্ছে, আদিবাসীদের মাতৃভাষা রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রচলন ও চর্চা করার ক্ষেত্র তৈরি করে দেয়া।

গ.আদিবাসীদের মাতৃভাষা প্রচলন ও চর্চা: সংকট ও সম্ভাবনা

যুগে যুগে ভাষাগত বৈরীতা ও জাতিগত বৈরীতা মানব ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। অনেক উন্নত ও স্বাধীন দেশেও ভাষার সংঘাত রয়েছে। যেমন- কানাডায় ইংরেজী ও ফরাসীর দ্বন্দ্ব। পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন ভাষাভাষীদের মধ্যে অসহিষ্ণুতা ও বৈরীতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ভাষা বৈরীতার পাশাপাশি জাতিগত বৈরীতাও দেখা যায়। যার কারণে সংখ্যাগুরু ভাষাভিত্তিক জনগোষ্ঠীর চাপে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীরা নিজেদের বড় বিপন্ন মনে করছে বর্তমানে। রাষ্ট্রে ত্রুটিপূর্ণ ভাষা পরিকল্পনা নীতি অনেক সময় সুফল বয়ে আনে না। একটি ভাষাকে আইনের জোরে অন্য ভাষাগুলির উপর চাপিয়ে দিতে গিয়ে নাজেহাল হতে হয়েছে বহু সংস্কৃতিকে। ভাষাগত দ্বন্দ্ব সংঘাত অনেক সময় জটিল করে তোলে জাতিগত দ্বন্দ্ব সংঘাতকে। যার বড় প্রমাণ হল খোদ ১৯৫২ সারের বাংলা ভাষার আন্দোলন।

স্বাধীন বাংলাদেশে যে সকল ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তা বলা যায় না। স্বাধীন বাংলাদেশে যে সংবিধান প্রণয়ন করা হয় সেই সংবিধানে আদিবাসীদের জাতীয় অস্তিত্ব স্বীকৃতি পায়নি। সংবিধানে ৬নং অনুচ্ছেদে লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল- “বাংলাদেশের নাগরিকগণ বাঙ্গালী বলিয়া পরিচিত হইবেন।” উক্ত অনুচ্ছেদের মাধ্যমে কেবল আদিবাসীদের জাতিগত পরিচয়ের অধিকারই বঞ্চিত হয়নি, আদিবাসী জাতিসমূহকে বাঙ্গালী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। যার কারণে বলা যায়, বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই আদিবাসীদের জাতিগত বিকাশের জন্য তাদের ভাষা প্রচলন ও চর্চার ক্ষেত্রে একটি রাষ্ট্রীয় সংকট তৈরি হয়েছে। পরবর্তীকালে জেনারেল জিয়ার আমলে সংবিধান সংশোধন করে বাংলাদেশের নাগরিকদের বাঙ্গালী-র পরিবর্তে ‘বাংলাদেশী’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হলেও সেই বাংলাদেশী জাতীয়তার দৃষ্টিভঙ্গি অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ ছিল না এবং এতে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের সমস্ত উপাদানই উপস্তিত ছিল।

বাংলাদেশের সংবিধানে প্রথম ভাগের (প্রজাতন্ত্র) ‘রাষ্ট্রভাষা’ সংক্রান্ত- ৩ অনুচ্ছেদ “প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা” উল্লেখ রয়েছে। রাষ্ট্রভাষা বাংলা ছাড়া দেশে ৪৬টির অধিক আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা রয়েছে তা সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষিত হয়। ফলে বাংলাদেশের আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীসমূহের ভাষা, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি বিলুপ্তির সম্মুখীন ও সংকটাপন্ন। তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রান্তিকতার প্রেক্ষিতে এবং ন্যায্যতা বিধানের জন্য প্রত্যক্ষভাবে সংবিধানে সংবিধিবদ্ধ ব্যবসা অন্তর্ভুক্তির আলোকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন এবং এই পৃষ্ঠপোষকতা ব্যতীরেকে সংশ্লিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর প্রতি বৈষম্য কার্যকরভাবে দূরীভূত করা সম্ভব নয়।

জেনারেল জিয়ার শাসনামলেই ১৯৭৮ সালে ২য় ঘোষণাপত্র ৪নং আদেশ-এর মূলে উল্লেখিত রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিসমূহ পরিবর্তন করা হয় নিম্নোক্তভাবে- “সর্বশক্তিমান আল্লাহের উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস, জাতীয়বাদ, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র অর্থাৎ অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুবিচার- এই নীতিসমূহ এবং তৎসহ এই নীতিসমূহ হইতে উদ্ভূত এই ভাগে বর্ণিত অন্য সকল নীতি রাষ্ট্র পরিচালনায় মূলনীতি বলিয়া পরিগণিত হইবে।”

Education in cht
পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্কুল

উক্ত আদেশ বলে সংবিধানের (১ক) নামে একটি নতুন দফা সংযোজন করে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহের উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসই যাবতীয় রাষ্ট্রীয় কার্যাবলীর ভিত্তি’ হিসেবে গৃহীত হয়। উক্ত আদেশ বলে ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা সম্বলিত ১২নং অনুচ্ছেদ সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করা হয়। ১৯৮৮ সালে সংবিধানের অষ্টম সংশোধনীতে ২নং অনুচ্ছেদে (২ক) নামে একটি নতুন দফা সংযোজন করা হয় এভাবে- ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, তবে অন্যান্য ধর্মও প্রজাতন্ত্রে শান্তিতে পালন করা যাইবে।’

এই সংশোধনীর ফলে আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীসমূহের জাতীয় পরিচিতি, ভাষা-সংস্কৃতি, ধর্ম, মৌলিক অধিকার প্রভৃতি হুমকির মুখে পড়ে। সাংবিধানিকভাবে আদিবাসীদের এই ভাষাগত ও জাতিগত পরিচয় সংকটের কারণে মূলতঃ আদিবাসীদের নিজস্ব ভাষা প্রচলন ও চর্চার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বাংলাদেশের জাতীয় শিক্ষাব্যবসস্থায় এক ধরনের অন্তর্নিহিত ত্রুটি লক্ষণীয়। পাঠ্যক্রমে আদিবাসীদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির এমন কোন ইতিবাচক উপাদান নেই যা একজন আদিবাসী শিক্ষার্থীকে আগ্রহী ও বিশ্লেষণী হতে শেখায়। আদিবাসী শিশুদের শিক্ষা অর্জনের পথে যে বাধাগুলোর সম্মুখীন হতে হয় তার মধ্যে অন্যতম সমস্যা হল ভাষাগত সমস্যা। স্কুলের শিক্ষকগণ পাঠদান করেন বাংলা ভাষায় অথচ একজন আদিবাসী শিশু স্কুলে পদার্পণ করে তার মাতৃভাষাকে সম্বল করে। একজন বাংলা ভাষাভাষী শিশুর জন্য ইংরেজী ভাষাটি যেমন অপরিচিত ও দূর্বোধ্য, একজন আদিবাসী শিশুর জন্য বাংলা ভাষাও ঠিক তেমনি।

আদিবাসী শিশুরা যখন নতুন ভর্তি হয় তখন তারা যে ভাষা, অভিজ্ঞতা নিয়ে আসে তা তাদের পরিবার ও সমাজের প্রচলিত ভাষা, যা তার পাঠ্য বইয়ের ভাষা বা পাঠদান মাধ্যম হিসেবে প্রচলিত ভাষা হতে সম্পূর্ণ ভিন্ন। যার কারণে আদিবাসী শিশুরা পাঠের বিষয়বস্তু’র সাথে খাপ খাওয়াতে পারে না এবং যে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করার কথা তা করতে পারে না। ফলে পরবর্তী শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হবার পর আরো বেশী অসহায় হয়ে পড়ে। বলা যায়, একই পাঠ্যক্রমের অধীনে একই সময়ে, একই পাঠদান পদ্ধতিতে আদিবাসী শিশুদের বাংলা ভাষাভাষী শিশুদের মত একই যোগ্যতা বা দক্ষতা অর্জন করা সম্ভব নয়।

আদিবাসী ও বাংলাভাষী শিশুদের দক্ষতা ও পাঠের বিষয়ে পূর্ব অভিজ্ঞতা ভিন্ন ও অসম এবং এই ভাষাগত দূর্বলতার কারণে আদিবাসী শিশুরা অনেক বিষয় সমভাবে অর্জন করতে সক্ষম না হয়ে পর্যায়ক্রমে পিছিয়ে পড়তে পড়তে এক সময় প্রাথমিক স্তরেই ঝড়ে পড়ে। বাংলাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়সমূহে শুধু প্রথম শ্রেণী থেকে শতকরা অন্তত ৩০ জন শিশু স্কুল ত্যাগ করছে আর মাতৃভাষা বিবর্জিত শিক্ষা গ্রহণ করতে গিয়ে আদিবাসী শিশুদের অবস্থা আরো বেশী শোচনীয়। ফলে একটি জরীপে দেখা যায় আদিবাসী শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষার স্তরে ঝড়ে পড়ার হার এলাকাভেদে ৬০% থেকে ৭০% হয়ে থাকে।৩ তাই পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রাথমিক স্তরে আদিবাসী ভাষা প্রচলনের বিষয়টি জরুরী হয়ে দাড়িয়েছে।

কিন্তু এখানে আরো কিছু কথা থেকে যায়। শুধুমাত্র প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আদিবাসী ভাষায় শিক্ষা প্রচলন করলেই হবে না। বাস্তবক্ষেত্রে যদি আদিবাসীদের এই ভাষা প্রচলিত না থাকে বা চর্চা করার সুযোগ বা অনুকূল পরিস্থিতি না থাকে তাহলে এক্ষেত্রে আরো এক ধরনের বির্পযয় দেখা দিতে পারে। যেমনটা আফ্রিকার বিভিন্ন আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীগুলোর ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে। আদিবাসীদের মাতৃভাষায় শিক্ষা গ্রহণের পর অনেক ক্ষেত্রেই এক প্রকার উভয় সংকট দেখা গেছে আফ্রিকায়, যেখানে ফরাসী, ইংরেজী বা পর্তুগীজ ভাষা ঔপনিবেশিক শক্তির উত্তরাধিকারী হিসেবে সরকারী চাকুরি, ব্যবসা-বাণিজ্য বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অত্যন্ত- প্রভাবশালী। আদিবাসী ভাষায় শিক্ষা গ্রহণ করে তারা ক্রমশ কর্মক্ষেত্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে পাশাপাশি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে শিক্ষিত সমাজ থেকেও। ইংরেজ বিদ্বেষী আফ্রিকার সর্বত্র দেখা যায় যে, ইংরেজীই হল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও উন্নতির পথে মূল চাবিকাঠি এবং আফ্রিকার ক্লাসরুমগুলোতে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে পছন্দসই ভাষা। যার কারণে সমগ্র আফ্রিকাতেই মাতৃভাষা  বনাম দ্বিতীয় ভাষা কোনটি শিক্ষার মাধ্যম হবে তা নিয়ে বির্তক দেখা দিয়েছে।

মূলত মাতৃভাষা বিবর্জিত এবং এক ভাষাকেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার চেয়ে সমান্তরালভাবে মাতৃভাষাসহ দ্বিভাষিক (Bilingual International Education) শিক্ষা ব্যবস্থা শিশুদের শিক্ষা প্রদানের ক্ষেত্রে অধিক উপযোগী বলে প্রমাণিত হয়েছে। ব্রাজিলের অধিকাংশ স্কুলে নিরঙ্কুশভাবে প্রচলিত ছিল জাতীয় ভাষা, পর্তুগীজ। যার কারণে টেরেনাভাষী শিশুরা শিক্ষার শুরুতেই পশ্চাৎপদ থেকে যায়। অনেকে পর্তুগীজ ভাষা বুঝতে না পেরে প্রথম শ্রেণীতেই অনেক বছর ব্যয় করে। ১৯৯৮ সালের নভেম্বরে একজন শিক্ষা অফিসার স্থানীয় স্কুলগুলো পরিদর্শন করে দেখলেন যে, প্রথম শ্রেণীর ৭৪% শিশুই পর্তুগীজ ভাষা পড়তে ও লিখতে পারে না। বিগত ৬ বছরের অধিককাল ধরে ৮টি টেরেনা গ্রামের স্কুলে ৫৫% শিশু প্রয়োজনীয় ভাষা আয়ত্ব করতে পারেনি, যার দ্বারা তারা দ্বিতীয় শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হতে পারবে। এই টেরেনাভাষী অঞ্চলে ঝড়ে পড়া শিশুর হার ছিল খুবই উঁচু। এই পরিস্থিতি অনেক স্থানীয় মানুষকে উদ্বিগ্ন করে তোলে।

একটি তরুণ টেরেনা দম্পতি Laucidio Sebastiao I Lindomar বিষয়টি নিজেদের হাতে তুলে নিলেন। তারা একদল শিশুকে পড়াতে শুরু করলেন। শিশুরা টেরেনা ভাষায় পড়তে ও লিখতে শেখার পাশাপাশি স্কুলের পড়াশুনাও চালিয়ে গেল। দেখা গেল যে শিশুরা খুব দ্রুত টেরেনা ভাষায় পড়তে ও লিখতে শিখেছে, পর্তুগীজ ভাষায় শিক্ষা গ্রহণের প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্থ না করেই। নিজস্ব মাতৃভাষায় শিক্ষা গ্রহণের ফলে যে আত্মবিশ্বাস তারা অর্জন করেছে সেই আত্মবিশ্বাসই তাদেরকে সহযোগিতা করেছে খুব দ্রুত ২য় ভাষা হিসেবে পর্তুগীজ ভাষা শিখতে। ১৯৯৯ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে ঘটনাটি সম্পর্কে Taunay এর টেরেনা অধ্যুষিত অঞ্চলের স্কুলগুলোর ব্যাপারে দায়িত্বশীল শিক্ষা সচিব অবহিত হলে তিনি Nancy Butler কে সেখানে দ্বিভাষাভিত্তিক একটি শিক্ষা প্রকল্প পরিচালনার প্রস্তাব দেন এবং ২২ ফেব্রুয়ারী ১৯৯৯ এ Grasso do sul -এর তিনটি গ্রামের স্কুলে এই শিক্ষা প্রদান শুরু করা হয়। শিক্ষা সচিব ১৯৯৯ সালে জুন মাসে একই স্কুলগুলি যখন পুনঃপরিদর্শন করলে দেখা গেল পূর্বে যে শিশুরা শিক্ষা গ্রহণের সমস্যা ছিল তাদের ৭১% সহজে পড়তে এবং লিখতে পারছে টেরেনা ভাষায়। ফলে ১৯শে এপ্রিল ১৯৯৯ স্থানীয় সরকার একটি আইন পাশ করে যে, দ্বিভাষিক-আন্তসাংস্কৃতিক (Bilingual Inter-cultural) শিক্ষা টেরেনা অঞ্চলে মিউনিসিপ্যাল স্কুলগুলোতে বাধ্যতামূলক করা হয়।

education in cht
পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষাব্যবস্থা

ইউনেস্কোর অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, মাতৃভাষায় শিক্ষা প্রদান করা হলে শিশুরা শিক্ষা গ্রহণে অধিক ভাল ফলাফল পেয়ে থাকে। নিউজিল্যান্ডে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, আদিবাসী মাওরী শিশুরা মাতৃভাষায় যারা শিক্ষা গ্রহন করেছে, তারা শুধুমাত্র ইংরেজী ভাষায় শিক্ষা নেওয়া শিশুদের তুলনায় এগিয়ে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ার George Mason University-র একটি গবেষণা ইউনিট কর্তৃক ১৯৮৫ সাল থেকে ১৫টি রাজ্যের ২৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনা করে দেখা গেছে যে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা ফলাফলের সাথে মাতৃভাষা শিক্ষার একটা প্রত্যক্ষ বা সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। সেই ছাত্ররা সবচেয়ে ভাল রেজাল্ট করেছে যারা দ্বিভাষিক শিক্ষা গ্রহণ করেছিল।

মূলত আদিবাসীদের জীবনে ভাষা, সংস্কৃতি ও ভূমি – এই তিনটি বিষয় পরস্পর অঙ্গাঙ্গী ও অবিচ্ছেদ্যভাবে সংলগ্ন। ভাষা ও সংস্কৃতির মধ্যে রয়েছে গভীর আত্মীয়তা। আদিবাসীদের সামগ্রিক জীবন ব্যবসা যেহেতু ভূমির উপর নির্ভরশীল সেহেতু আদিবাসীদের ভূমির সাথে ভাষা ও সংস্কৃতির প্রশ্নও জড়িত। পশ্চিমা জাতিরাষ্ট্রের ধারণায়ই সারা বিশ্বজুড়ে আদিবাসীদের ভাষা সংস্কৃতির বিকাশের পথে এক বিরাট অন্তরায় হয়ে দাড়িয়েছে। যার জলজ্যান্ত উদাহরণ হতে পারে বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীসমূহ। নিজস্ব ভাষা সংস্কৃতি চর্চার সুযোগ অনুপস্থিতির কারণে এই আদিবাসীদের জাতিগত বিকাশ সাধিত হয়নি। অথচ আদিবাসীদের মাতৃভাষায় শিক্ষা পদ্ধতি প্রচলন করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভিতরে ও বাইরে ভাষা চর্চার মতো অনুকূল বাস্তবতা সৃষ্টি করার মতো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গৃহিত হলে এ দেশের আদিবাসীরাও জাতীয় সংস্কৃতির যথার্থ অংশীদারিত্ব অর্জন করতে পারত। যার কারণে মাতৃভাষায় শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত- ও সদিচ্ছা ব্যাপারটিও অস্বীকার করা যায় না।

যুক্তরাজ্যের Summer Institute of Linguistics -এর আন্তর্জাতিক কর্মসূচীর প্রাক্তন প্রধান Clinton Robinson  এর মতে “Òfor a Multilingual approach to work, governments must see linguistic divetsity as a boon and not a problem to be delth with. The speakers of those languages must also support itÓ|5 এক্ষত্রে আদিবাসীদের মাতৃভাষা প্রচলনের ক্ষেত্রে যথার্থ পরিভাষার ঘাটতিও কম প্রতিবন্ধকতা নয়। কেননা দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত ও বঞ্চিত ভাষাগুলোতে যথার্থ ব্যবহারের অভাবে আধুনিক সভ্যতার উপযোগী পরিভাষা তৈরি হতে পারেনি। যার জন্য আইনগত, ব্যবসায়িক, কুটনৈতিক এবং প্রযুক্তিগত অনেক শব্দভান্ডার সৃজনের প্রচেষ্টা আবশ্যক। মাতৃভাষায় শিক্ষা প্রদানের পূর্বে এগুলোরও প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের বম আদিবাসী জনগোষ্ঠির ভাষা গবেষণা করে তথ্য পাওয়া গেছে, সেই ভাষায় মাত্র ৩৫০ থেকে ৭০০ শব্দ রয়েছে। এর অন্যতম কারণ হলো দীর্ঘ দিনের অবহেলার কারণে এবং সামাজিক গতিশীলতার অভাবে আধুনিক সভ্যতার উপযোগি পরিভাষা যথেষ্ট পরিমাণে উৎপন্ন হতে পরেনি।

ভাষা যেহেতু সংস্কৃতির বাহন, সেহেতু ভাষার মৃত্যুর সাথে সাথে কোন জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতিরও যে অপমৃতু ঘটবে একথা কোন মতেই অস্বীকার করার উপায় নেই। যার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের ভাষা-সংস্কৃতি রক্ষার জন্য তাদের মাতৃভাষায় শিক্ষা পদ্ধতি প্রচলন ও বাস্তব জীবনে এই ভাষাগুলোকে চর্চা করার মত অনুকুল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে দেবার কোন বিকল্প নেই। পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যাদের রয়েছে ভাষার লিখিত রূপাকার ‘চাকমা প্রাইমার’। এছাড়াও লিখিত পান্ডুলিপি রয়েছে তাহ্‌লিক শাস্ত্র, শাঙেচ ফুলু তারা, আঘর তারা, রাধামন-ধনপুদী পালা, বৌদ্ধরঞ্জিকা প্রভৃতি। মারমা ও চাক জনগোষ্ঠীর রয়েছে ভাষার লিখিত রূপ ‘চা আক্‌খ্রা’। এছাড়া মারমাদের রয়েছে হস্তলিখিত পান্ডুলিপি ‘মনহারি পাংখুং’, ককানু পাংখুং, থাম্রা পাংখুং, উদিনা কাপ্যা-প্রভৃতি। ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর রয়েছে ‘কক্‌বরক্‌ আদিশিক্ষা’, ম্রো জনগোষ্ঠী রয়েছে ভাষার বিভিন্ন লিখিত রূপ থুরাই লাই-ক্লোউমি, তংমি তিয়া প্রাচহ্‌ প্রভৃতি ধর্মীয় গান, গল্প ও আধ্যাত্মিক তত্ত্বের গ্রন্থাবলী। খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী খুমিদের রয়েছে নিজস্ব ভাষায় রোমান বর্ণে লেখা বাইবেল ও ধর্মীয় সঙ্গীত। মায়ানমারে বিশপ জ্যাউঙ্গ কর্তৃক প্রণীত ২৮ পৃষ্ঠাব্যাপী খুমি ভাষায় লেখা প্রাথমিক শিক্ষার জন্য ‘খুমী-চা-আমাটিউ-ইয়াহ্‌-’ নামক পুস্তক রয়েছে বলে জানা যায়।

বম, লুসাই ও পাংখোয়াদের বর্ণমালা মূলতঃ একই। এদের Bawm Bu-Bulbu নামক অক্ষর জ্ঞানের বই রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের মধ্যে একমাত্র খিয়াং জনগোষ্ঠীরই ভাষার কোন লিখিতরূপ নেই। এক্ষেত্রে বর্ণনাত্মক ভাষাতত্ত্বের (Discriptive linguistics) সহযোগিতা নেয়া যেতে পারে। এই বর্ণনাত্মক ভাষাতত্ত্বের গবেষণায় প্রথমেই কোন ভাষায় ব্যবহৃত ধ্বনিগুলোকে চিহ্নিত করে কিভাবে ধ্বনিগুলো পরস্পর যুক্ত হয়ে ব্যবহৃত হয়, সেই রীতিগুলো খুঁজে বের করা হয়। এরপর বর্ণনাত্মক ভাষাতত্ত্বের দ্বারা আন্তর্জাতিক ধ্বনিগত বর্ণমালার (International Phonetic Alphabet-IPA) সাহায্যে ভাষায় ব্যবহৃত ধ্বনিগুলোকে লিপিবদ্ধ করা হয়। এই IPA তৈরি করেছে ভাষাতত্ত্ববিদরা যার দ্বারা পৃথিবীর যেকোন ভাষাকে লিপিবদ্ধ করা সম্ভব। এদেশের যে সমস্ত- জনগোষ্ঠীর এখনো ভাষার কোন লিখিত রূপ নেই, তাদের ক্ষেত্রে IPA-এর মাধ্যমে প্রকল্প নেয়া যেতে পারে। দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনষ্টিটিউটগুলো প্রতিষ্ঠিত হবার পর আদিবাসীদের ভাষা ও সংস্কৃতিগত কার্যক্রম কিছুটা গতিশীল হলেও এই প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্যক্রম আরো বেশি জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। বিশিষ্ট লেখক ও মারমা ভাষা-প্রশিক্ষক ক্যশৈপ্রু মারমা ভাষা ও বর্ণমালা ব্যবহারের জন্য কয়েকটি প্রয়োগক্ষেত্র চিহ্নিত করেছিলেন:

১) মারমা সাহিত্য, মারমা অনুবাদ সাহিত্য ও সৃষ্টিশীল শিল্পকর্মের ক্ষেত্রে,

২) গণশিক্ষা, গণসংযোগ, গণস্বাস্থ্য, নিউজ বুলেটিন সম্প্রচারের ক্ষেত্রে 

৩) ধর্মানুষ্ঠান, সামাজিক অনুষ্ঠান, রাষ্ট্রীয় বা জাতীয় নির্বাচন, সাংগঠনিক  কার্যক্রমের ক্ষেত্রে,

৪) মারমা সামাজিক ও প্রথাগত আইনকে সংরক্ষণ ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে,

৫) মারমা মাতৃভাষা শিক্ষা, চর্চা ও বিকাশের কার্যক্রমে,

৬) ব্যানার, সাইনবোর্ড, পত্রালাপ, বার্তা প্রেরণ প্রভৃতি ক্ষেত্রে,

৭) আঞ্চলিক মারমা ভাষাকে জাতীয় ও আন-র্জাতিক ভাষার সঙ্গে মৈত্রী-সেতুবন্ধন গড়ার ক্ষেত্রে,

৮) মারমা সামাজিক ক্রীড়ানুষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে,

৯) সামাজিক উদ্বুদ্ধকরণে, কুসংস্কার দুরীকরণে, নীতি-নৈতিকতাবোধ ও মূল্যবোধ সৃষ্টি কর্মে,

১০) মারমা অক্ষর জ্ঞান ভিত্তিক ওয়াল ম্যাগ, লিটল ম্যাগ, ম্যাগাজিন প্রকাশনা ও মারমা ভাষার গবেষণা কর্মে,

১১) মারমা সমাজ ও পরিবারে অক্ষরজ্ঞান প্রয়োগ কর্মে,

১২) অধুনা কম্পিউটারে মারমা ফন্ট সংযুক্ত হওয়ায় ঐ কম্পিউটারকে ব্যবহার,

১৩) মারমা শিশু -শিক্ষা ও মারমা ভাষা শিক্ষার কার্যক্রমে, প্রভৃতি।

উল্লেখ্য যে, মারমা ভাষা ও বর্ণমালা প্রয়োগের জন্য যে ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে সেগুলো শুধুমাত্র মারমা ভাষার জন্য প্রযোজ্য নয়, এ দেশের সকল আদিবাসীর জন্যই এ ক্ষেত্রগুলো প্রযোজ্য।

Indigenous girl
আদিবাসী শিশু, ছবিঃ কৃষ্ণ চাকমা

ঘ. সুপারিশ

১) আন্তর্জাতিক সনদগুলোর আলোকে আদিবাসী ভাষাগুলোকে রাষ্ট্রীয় বা সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃতি প্রদানের জন্য সরকারকে রাজনৈতিক সিদ্ধান- গ্রহণে প্রভাবিত করা। এ লক্ষ্যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রয়োজনীয় লবি ও ক্যাম্পেইন জোরদার করা।

২) সংবিধানের প্রথম ভাগের (প্রজাতন্ত্র) ‘রাষ্ট্রভাষা’ সংক্রান্ত ৩ অনুচ্ছেদ “প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা” বাক্যের পর “তবে নাগরিকদের অন্যান্য ভাষার পরিপোষণ ও উন্নয়নেও রাষ্ট্র সমভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করিবেন” বাক্যাংশ সংযোজন করা।

৩) দ্বিতীয় ভাগের (রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি) ‘জাতীয় সংস্কৃতি’ সংক্রান্ত ২৩ অনুচ্ছেদ-এর পর “২৩ক।” নামে এই মর্মে নতুন অনুচ্ছেদ সংযোজন করা- “রাষ্ট্র আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, ভাষা, রীতি, প্রথা, ঐতিহ্য, সাহিত্য, শিল্পকলা, ঐতিহাসিক নিদর্শন ইত্যাদি সংরক্ষণ ও উন্নয়ন তথা বহুমাত্রিক সংস্কৃতির সমৃদ্ধিতে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করিবেন।”

৪) গণ-প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সমস্ত আইন, ঘোষণা, দলিল প্রভৃতি আদিবাসীদের ভাষায় প্রকাশ করা।

৫) আদিবাসীদের সাহিত্য, অনুবাদ সাহিত্য, সৃষ্টিশীল কর্মক্ষেত্রে, গণস্বাস্থ্য, গণশিক্ষা, গণসংযোগ, নিউজ বুলেটিন সমপ্রচার, ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি, সামাজিক অনুষ্ঠানাদি, রাষ্ট্রীয় ও আঞ্চলিক নির্বাচন, সাংগঠনিক কর্মকান্ড, সামাজিক ও প্রথাগত আইন সংরক্ষণ-উন্নয়ন, মাতৃভাষা চর্চা ও বিকাশের কর্মক্ষেত্রে, ব্যানার তৈরি, সাইনবোর্ড তৈরি, পত্রালাপ, বার্তাপ্রেরণ, ক্রীড়ানুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সামাজিক উদ্বুদ্ধকরণ, কুসংস্কার দূরীকরণ, নীতি-নৈতিকতার মূল্যবোধ সৃষ্টি, অক্ষরজ্ঞান ভিত্তিক প্রকাশনা (ওয়ালম্যাগ/লিটল ম্যাগ/ম্যাগ) প্রভৃতি ক্ষেত্রে আদিবাসীদের ভাষা ও বর্ণমালা ব্যবহার করা।

৬) আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী সংক্রান- যাবতীয় চুক্তি, আইন ও দলিলপত্রাদি আদিবাসীদের ভাষায় প্রকাশ করা।

৭) জাতীয় প্রচার মাধ্যমে আদিবাসীদের ভাষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক অনুষ্ঠান চালু ও সসম্প্রসারণ  করা।

৮) ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনষ্টিটিউট-এর আদিবাসী ভাষা ও সংস্কৃতি ভিত্তিক কার্যক্রম সসম্প্রসারণ করা।

৯) যে সমস্ত জনগোষ্ঠীর ভাষার লিখিতরূপ নেই তাদের ক্ষেত্রে লিখিতরূপ তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করা এবং এ লক্ষ্যে প্রকল্প প্রণয়ন করা।

১০) আদিবাসীদের ভাষার অভিধান তৈরি করা এবং সৃষ্টিশীল সাহিত্য, জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন বইপত্র আদিবাসীদের ভাষায় অনুবাদ করা।

১১) বাংলাদেশ আদিবাসী ভাষা একাডেমী স্থাপন করা।

১২) পার্বত্য জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদের বিভিন্ন সভায় প্রত্যেক সভ্য নিজ নিজ মাতৃভাষায় বক্তব্য রাখার ব্যবস্থা করা ও দোভাষীর মাধ্যমে সেগুলি তর্জমা করা।

১৩) পার্বত্য চট্টগ্রামে স্বতন্ত্র্য একটি শিক্ষাবোর্ড গঠন করে আদিবাসী ছাত্র-ছাত্রীদেরকে দ্বিভাষি ও বহুভাষিক  পদ্ধতিতে শিক্ষা প্রদান করা এবং শিক্ষকদেরকে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেয়ার ব্যবস্থা গ্রহন করা। এ লক্ষ্যে আদিবাসী ভাষা ও সংস্কৃতিকে পাঠ্যসূচীতে অন্তর্ভূক্ত করা।


লেখক: Jumm Khisa


তথ্যসূত্রঃ

১। বাঙালীর জাতীয়তাবাদ- সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ২০০০, ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, রেডক্রিসেন্ট বিল্ডিং, ১১৪, মতিঝিল বা/এ, পোষ্ট বক্স-২৫১১, ঢাকা-১০০০।

২। মায়ের ভাষায় পড়তে চাই Introduce Mother Language Education, সম্পাদক জনলাল চাকমা, নির্বাহী সম্পাদক- মথুরা ত্রিপুরা, HTNF, JAC, Kapaeeng & Care-Bangladesh, জুন ২০০৫, রাঙ্গামাটি।

৩। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথমিক শিক্ষার মানউন্নয়নে আদিবাসী ভাষা প্রয়োগ সম্ভাবনা- সুখেশ্বর চাকমা, আমাঙ, ২০০৩ সম্পাদক- রনেল চাঙমা, জুম ঈসথেটিক্‌স কাউন্সিল (জাক), রাঙ্গামাটি।

৪। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস বিশেষ সংখ্যা, কাপেং ফাউন্ডেশন, ১০ ডিসেম্বর ২০১১, ঢাকা।

৫। Making Local Laanguagees Count. By-Peter Mwaura. Guardian August ২১, ২০০৩

৬। EDUCATION – The mother tongue dilemma; UNESCO

৭। What Do You Lose When You Lose Your Language? Joshua Fishman, November 16, 1994.

৮। উপজাতীয় ভাষা ও সংস্কৃতি, ভাষা বিষয়ক সেমিনার সংকলন: ১৯৯৯-২০০১; উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইন্সটিটিউট, পার্বত্য জেলা পরিষদ, বান্দরবান।

৯। এই পৃথিবীর মানুষ- এ কে এম আমিনুল ইসলাম; বাংলা একাডেমি, ঢাকা। ১৯৮৫

১০। AMANI KOK – 2002; Hill Tracts NGO Forum; রাজবাড়ী রোড, রাঙ্গামাটি।

১১। সংহতি, ২০০৩; বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, বাড়ী-৩, রোড-২৫/এ; বানানী, ঢাকা, বাংলাদেশ।

১২। চেদ্‌না, ২০০৪; মারমা সমাজ ও সংস্কৃতি বিষয়ক প্রকাশনা; বি.এম.এস.সি.কেন্দ্রীয় কমিটি।


LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here