অশোক কুমার দেওয়ানের সংক্ষিপ্ত জীবনী

0
52

বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রবীণ শিক্ষাবিদ, খাগড়াছড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক এবং রাঙ্গামাটি উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অশোক কুমার দেওয়ান রাঙামাটির মগবান গ্রামে ১৯২৬ সালে এক সম্ভ্রান্ত দেওয়ান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মদন মোহন দেওয়ান। খুব অল্প বয়সে গৃহশিক্ষকের অধীনে প্রাইমারী শিক্ষা গ্রহণ করে ১৯৩৬ সালে রাঙ্গামাটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ৩য় শ্রেণীতে ভর্তির মাধ্যমে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন শুরু হয়। মাত্র ১৬ বছর বয়সে রাঙ্গামাটি সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৪৩ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় ২য় বিভাগে পাশ করেন। এরপর উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণের উদ্দেশ্যে তিনি কলকাতা গমণ করেন। ১৯৪৩ সনে জুলাই মাসে কলকাতা বিদ্যাসাগর কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক বিজ্ঞান শ্রেণীতে ভর্তি হয়ে তিনি ১৯৪৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনুষ্ঠিত উচ্চ মাধ্যমিক বিজ্ঞান পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। অতঃপর কলকাতা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়ে চিকিৎসা শাস্ত্রে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে কৃতিত্বের সাথে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে যথারীতি ভর্তি হন। কিন্তু পারিবারিক কারণে তিনি উক্ত কোর্সে অংশ গ্রহণ করতে পারেননি। পরবর্তীতে তিনি আবার কলকাতা বিদ্যাসাগর কলেজে স্নাতক ডিগ্রীতে ভর্তি হন। ঐ সময়ে তিনি ব্রিটিশ ভারতের বুদ্ধগয়ায় অনুষ্ঠিত বৌদ্ধ সম্মেলনে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিনিধি হিসেবে (বাবু বিনয় কুমার দেওয়ান, প্রাক্তন জাতীয় সংসদ সদস্যসহ) যোগদান করেছিলেন।

অশোক কুমার দেওয়ান
অশোক কুমার দেওয়ান, জুমজার্নাল

তখন থেকেই তিনি বুদ্ধিস্ট হোস্টেল এ থাকাকালীন সময় তৎকালীন রাজনৈতিক নেতা স্নেহকুমার চাকমা প্রমুখদের সংস্পর্শে আসেন। ছাত্রজীবনে পাঠ্যপুস্তক ছাড়াও তিনি সাহিত্য ও ইতিহাস বিষয়ক বই পড়তে ভালবাসতেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নানাবিধ কারণে তিনি স্নাতক ডিগ্রী পড়াশুনা বন্ধ করে বাধ্য হয়ে ১৯৪৯ সালের প্রথম দিকে রাঙ্গামাটি ফিরে আসেন। এরপর কামিনী মোহন দেওয়ান প্রমুখ রাজনীতিবিদের সহকর্মী হয়ে তিনি রাজনীতি চর্চা শুরু করেন। স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৫৪ সালে অনুষ্ঠিত পাকিস্তান যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে পার্বত্য চট্টগ্রামে বুদ্ধিস্ট কমিউনিটির প্রার্থী কামিনী মোহন দেওয়ানের পক্ষে বিভিন্ন জায়গায় সভা করে নির্বাচনী প্রচারাভিযানে অংশগ্রহণ করেন। তাঁর মত বিচক্ষণ রাজনৈতিক কর্মীর জন্যেই কামিনী মোহন দেওয়ান সেবারে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে M.L.A. পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন। এরপর তাঁর নিজ গ্রামের M.E. স্কুলটি জুনিয়র হাই স্কুলে উন্নীত হওয়ার পর সেখানে ১৯৫৪ সাল থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত তিনি সিনিয়র শিক্ষক হিসেবে তিনি শিক্ষতার জীবন শুরু করেন। তদানীন্তন খাগড়াছড়ি M.E. স্কুলটি ১৯৪১ সাল থেকে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত চালু থাকার পর স্কুলটি জুনিয়র হাই স্কুলে উন্নীত করা হয়। তখন পন্ডিত বিপুলেশ্বর দেওয়ান ছিলেন খাগড়াছড়ি জুনিয়র হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক। তারই আমন্ত্রণে তিনি মগবান স্কুলের শিক্ষকতা ছেড়ে খাগড়াছড়ি জুনিয়র হাই স্কুলে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। পন্ডিত বিপুলেশ্বর দেওয়ানের সান্নিধ্যে এসে তিনি স্নাতক ডিগ্রী পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ হাতছাড়া করেননি। খাগড়াছড়ি জুনিয়র হাই স্কুলকে ১৯৫৭ সালে হাই স্কুলে রুপান্তরিত করা হয়। সে বছরই তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনুষ্ঠিত স্নাতক ডিগ্রী পরীক্ষায় External Candidate হিসেবে অংশগ্রহণ করার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নিকট আবেদন করেন। আবেদন অনুসারে চট্টগ্রাম সরকারী কলেজ থেকে ১৯৫৮ সালে অনুষ্ঠিত বিএ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে ৩য় বিভাগে উত্তীর্ণ হন। পন্ডিত বিপুলেশ্বের দেওয়ান খাগড়াছড়ি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের পদে ইস্তফা দিয়ে চলে যাবার পর ১৯৫৯ সাল থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত অশোক কুমার দেওয়ান (১৯২৬ -১৯৯০) প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। যতদূর জানা যায় স্কুলের প্রশাসনিক জটিলতার কারণে প্রধান শিক্ষকের পদ থেকে অব্যহতি নিয়ে কিছুদিন কাচালং উপত্যাকায় ঠিকাদারীর ব্যবসাও করেছিলেন।

দীঘিনালা হাই স্কুলের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বাবু কিরণ বিকাশ দেওয়ান থেকে জানা যায় ১৯৬০ সালে দীঘিনালা M.E. স্কুলকে জুনিয়র হাইস্কুলে উন্নীত করার পর একজন স্নাতক ডিগ্রীধারী শিক্ষকের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলে স্কুল কমিটির সেক্রেটারি অশ্বিনীকুমার দেওয়ানের আমন্ত্রণে অশোক কুমার দেওয়ান দীঘিনালা জুনিয়র হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষকের পদ গ্রহণ করেন। এক বছর পর তিনি দীঘিনালা জুনিয়র হাইস্কুলকে উচ্চ বিদ্যালয়ে রুপান্তরিত করে ১৯৬২ সাল থেকে ঐ স্কুলে নবম শ্রেণীর ক্লাস চালু করেন। প্রধান শিক্ষকের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন অশোক কুমার দেওয়ান (১৯২৬ -১৯৯০) দীঘিনালা হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করতেন এবং সময়োপযোগী গঠনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করতেন। কিন্তু স্কুল পরিচালনা কমিটির তৎকালীন কর্মকর্তাদের সাথে মতানৈক্যের কারণে ১৯৬২ সালের মাঝামাঝি সময়ে তিনি প্রধান শিক্ষকের পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে দীঘিনালা থেকে খাগড়াছড়ি চলে আসেন। এরপরই তিনি C.O. (DEV) এর চাকরি নিয়ে রাঙ্গুনিয়া থানায় কিছুদিন সরকারী চাকরি করেন। তারপর ১৯৬৩ সালে পুণরায় সহকারী শিক্ষক পদে যোগদান করে পুণরায় শিক্ষতার পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। তিনি এক নাগারে ১৪ বছর যাবত নীরবভাবে শিক্ষকতা পেশা পালন করেছিলেন। সহকারী শিক্ষকপদে দায়িত্ব পালন কালে ১৯৬৫ সালে  East Pakistan Education Extension Centre, Dhaka থেকে তিন মাসের একটি বিশেষ কোর্স সম্পন্ন করে উক্ত কোর্সে প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। খাগড়াছড়ি উচ্চবিদ্যালয়ে দীর্ঘ ১৪ বছর শিক্ষকতার দায়িত্ব পালনকালে তিনি বিভিন্ন সমাজ উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডে নিজেকে জড়িত করেন। তিনি ১৯৭৭ সালে তাঁর খবং পড়িয়াস্ত গ্রামকে স্বনির্ভর গ্রাম হিসেবে গড়ে তুলে তৎকালীন স্বনির্ভর আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন এবং মর্হুম রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কর্তৃক স্বনির্ভর গ্রাম প্রতিষ্ঠার প্রসংশাপত্র অর্জন করেন। আজও তাঁর গ্রাম স্বনির্ভর হিসেবে পরিচিতি লাভ করে আসছে। বস্তুনিষ্ট ও বলিষ্ট বক্তব্যে তাঁর পান্ডিত্যের পরিচয় মেলে। সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে ১৯৭৮ সালে পৃথকভাবে রাঙ্গামাটিতে উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করে অরণ্য জনপদের লেখক জনাব আব্দুস সাত্তারকে ইনস্টিটিউটের পরিচালক পদে বহাল করেন। তৎকালীন জেলা প্রশাসক জনাব আলী হায়দার খাঁন সাহেব সরকারের নিকট অশোক কুমার দেওয়ানকে ইনস্টিটিউটের পরিচালক পদে নিয়োগের জন্য প্রস্তাব পেশ করেন। প্রস্তাব অনুসারে তাঁকে ইনস্টিটিউটের পরিচালকের পদ পূরণের জন্য আহ্বান করা হয়। কিন্তু তাঁর সেই পুরণো প্রাতিষ্ঠানিক প্রধানের অভিজ্ঞতার আলোকে পরিচালকের পদের প্রতি অনীহা প্রকাশ করেন। কিন্তু এ পদে একজন উপজাতীয় প্রার্থীকে মনোনীত করার জন্য উপজাতীয় দাবীর পরিপ্রেক্ষিতে তদানীন্তন ডিসি জনাব আলী হায়দার খাঁন সাহেবের সুপারিশক্রমে সরকার অশোক কুমার দেওয়ানকে উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের প্রথম পরিচালক জনাব আব্দুস সাত্তারের স্থলাভিষিক্ত করেন। ইনস্টিটিউটের নতুন পরিচালক হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে তিনি ধীরে ধীরে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড থেকে সম্পূর্ণ পৃথক করে ১৯৮১ সালে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে একীভূত করেন এবং ইনস্টিটিউটে স্থাপন করেন একটি পাঠাগার ও একটি উপজাতীয় জাদুঘর। ইনস্টিটিউটের পরিচালক পদের দায়িত্বের পাশাপাশি নিজেকে গবেষণায় নিয়োজিত করেন। ইনস্টিটিউট থেকে তারই সম্পাদনায় প্রকাশিত উপজাতীয় গবেষণা পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় তাঁর প্রথম গবেষণামূলক রচনা চাকমা জাতির ইতিহাসে অষ্টাদশ শতক লিখেই তিনি চাকমা জাতির ইতিহাস বিচারের ক্ষেত্রে বাস্তবমূখী রাখার চেষ্টা করেন। বর্তমান পান্ডুলিপি ছাড়া অসমাপ্ত অবস্থায় তিনি লিখে গেছেন চাকমা ভাষার শব্দকোষ এবং চাকমা জাতির ইতিহাস বিচার ২য় অধ্যায়। মৃত্যুর চারমাস আগে মনোঘর শিশুসদনে অনুষ্ঠিত সেমিনারে উপজাতীয়  সাহিত্য, শিল্পকলার আঙ্গিক রূপের বিশ্লেষণধর্মী পান্ডিত্যপূর্ণ বক্তব্য যেভাবে তুলে ধরেছেন তা নতুন প্রজন্মকে ইতিহাস গবেষণায় নতুনভাবে ভাবিয়ে তুলবে। এ যাবত বিভিন্ন লেখকগণের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রকাশিত গবেষণাধর্মী ইতিহাস রচনাবলীর সাথে তাঁর গবেষণা নিবন্ধগুলোর অনেক পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। তাঁর ঐ সমস্ত পান্ডিত্য পূর্ণ প্রবন্ধই তাঁকে প্রতিষ্ঠিত করে। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত সেমিনার সিম্পোজিয়ামে অংশগ্রহণ করে মূল আলোচক হিসেবে পান্ডিত্যপূর্ণ বক্তব্য রেখেছেন। রাঙ্গামাটি কলেজে অনুষ্ঠিত উপজাতীয় ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ক সেমিনারে তিনি চাকমা ভাষা ও সাহিত্য সম্পর্কে পান্ডিত্যপূর্ণ বক্তব্য রেখে উপস্থিত সুধীজনের কাছে যে প্রশংসা কুড়িয়েছেন তা স্মরণযোগ্য।

অশোক কুমার দেওয়ানের অবশিষ্ট অপ্রকাশিত পান্ডুলিপি প্রকাশের জন্য সমাজ সচেতন ব্যক্তিগণের এগিয়ে আসা উচিত এবং এযাবত বিভিন্ন সভা সমিতিতে পরিবেশিত তাঁর বক্তব্যের উপর ভিত্তি করে স্মারকমালা গ্রন্থ প্রকাশ করা প্রয়োজন।

অশোক কুমার দেওয়ান গ্যাস্ট্রিক আলসার জনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে ৮ জুন ১৯৯০ সালে বিকাল ৫টায় চট্টগ্রাম সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে বিধবা স্ত্রী দুই পুত্র ও এক কন্যা সহ অনেক আত্মীয় স্বজন রেখে গেছেন। তাঁরই  আদর্শ ও প্রেরণায় উজ্জীবিত তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র মিস্টার সমীরণ দেওয়ান খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার স্থানীয় সরকার পরিষদের প্রথম চেয়ারম্যান। তৎকালীন সময়ে দুই পুত্রের মধ্যে প্রথম পুত্র খাগড়াছড়ি কলেজিয়েট স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক এবং ২য় পুত্র প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রী ধারী প্রকৌশলী। একমাত্র কন্যা সেই সময়ের খাগড়াছড়ি কিন্ডার গার্টেন স্কুলের  প্রাক্তন সহকারী শিক্ষিকা ছিলেন। সমাজ সচেতন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন অগণিত অনুরাগী সহ খাগড়াছড়ি রিজিয়নের তৎকালীন রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার শরীফ আজিজ, জেলা প্রশাসক শামসুল করিম ও স্থানীয় সরকার পরিষদ চেয়ারম্যান মিস্টার সমীরণ দেওয়ান তাঁর আত্মার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।


তথ্যসূত্রঃ চাকমা জাতির ইতিহাস বিচার, অশোক কুমার দেওয়ান।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here