বাংলাদেশের আদিবাসীঃ নিরন্তর সংগ্রাম ছাড়া মুক্তি নেই

0
58

আদিবাসীদের জীবনে শোষণ ও বঞ্চনা নিয়ত। বৃটিশ, পাকিস্তান চলে গেল। এখন স্বাধীন বাংলাদেশ, কিন্তু তবুও আদিবাসীদের জীবনে বঞ্চনার শেষ হয়নি। নইলে আজও সাঁওতালরা কেন গান গায় –

‘নোরা নিয়ে নুরু নিয়া/ ডিডা নিয়া ভিটা নিয়/মাপক্ গপচ দো/ নুরিচ নাঁড়াড় গাই কাডা, নাচেল লাগিৎ/পাচের লাগিৎ/সেদায় লেকা বেতাবেতেত ঞাম বুওয়াড় লাগিৎ/ তবে দো বোন হুল গেয়াহো।’ এ সাঁওতাল গানের বাংলা অর্থ এরকম- ‘স্ত্রী, পুত্রের জন্য/ জমি জায়গা বাস্তুভিটার জন্য/ গো-মহিষ লাঙ্গল, ধন সম্পত্তির জন্য/ পূর্বের মত আবার সব ফিরে পাবার জন্য/ আমরা বিদ্রোহ করবো/ ও দেশের মাঝি ও পরাগানারা/ গ্রামের প্রধানরা/ আমরা রক্ত স্নান করেছি দালাল তস্করদের বিরুদ্ধে/ আমরা বিদ্রোহ ঘোষণা করছি।’

Illustration of struggle
Illustration of struggle by Nantu Chakma

আদিবাসীদের জীবনে মূল অবলম্বন হলো ভূমি। অথচ যুগ যুগ ধরে আদিবাসীরা তাদের ভূমি হারিয়েছে। প্রভাবশালী ভূমিগ্রাসী চক্র ক্রমাগতভাবে ওদের জমিজমা কেড়ে নিয়েছে জোর করে। জাল দলিল দেখিয়ে, হুমকি দিয়ে, আইনের ফাঁক ফোকর দিয়ে  স্বর্বশান্ত করেছে আদিবাসীদের। আর দেশের সরকার, যাদের রক্ষা করার কথা আদিবাসীদের অধিকার, তারা সবসময় শক্তিমানদের সহায়তা করেছে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে। আদিবাসীরা হয়ত কখনও কখনও আইনের আশ্রয় নিয়েছে, মামলা করেছে, কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে মামলা চালাতে গিয়ে আরো নিঃস্ব হয়েছে। বছরের পর বছর দরিদ্র আদিবাসী মামলা করে জমি ফেরত পেয়েছে এরকম নজির তো বলতে গেলে নেই। মহাশ্বেতা দেবী তার চোট্টি মুণ্ডা ও তার তীর উপন্যাসে এক মুণ্ডা পহানের মাধ্যমে বলেছিলেন, ‘তুই যদি ভালো গোরমেন, তবে আমাদের এত কষ্ঠ কেন?’ বিহারে বড় লাটের ভাই ইংল্যান্ড থেকে বেড়াতে এসেছিলেন এবং মুণ্ডাদের গ্রাম ঘুরেছিলেন। এই বিদেশী খুব সুন্দর আচরণ করেছিলেন মুণ্ডাদের সঙ্গে। পহান তাকে কথাগুলো বলেন। বৃটিশ সময়ে বলা একজন মুণ্ডার সে কথাগুলো আজও সমান প্রযোজ্য নয়?

প্রতিদিন জমি হারাচ্ছে আদিবাসীরা আর অসহায়ভাবে দেখছে যে তাদের পাশে দাঁড়াবার কেউ নেই। শুধু ভূমিলোভী চক্র নয়, কখনও কখনও স্বয়ং সরকার আদিবাসীদের উচ্ছেদ করছে বিভিন্ন প্রকল্পের নামে। ন্যাশনাল পার্ক, ইকো-পার্ক, সংরক্ষিত বনাঞ্চল, বাঁধ, সামাজিক বনায়ন, মিলিটারী বেইস নির্মাণ ইত্যাদির নামে। বিমান বাহিনীর জন্য ফায়ারিং রেঞ্জ দরকার-দখল করো আদিবাসীদের জমি, রাবার বাগান করতে হবে দাতাদের টাকায় বেছে নাও আদিবাসী অঞ্চল, ইকো-পার্কের নামে খাসিয়া ও ত্রিপুরাদের উচ্ছেদ করো, মধুপুরে গারোদের নামে শত শত মিথ্যা মামলা দায়ের করা, সিরাজগঞ্জে উরাওদের না জানিয়ে গায়ের জোরে আবাসন প্রকল্প করো, পুকুর দখল করো – এইতো আদিবাসী চিত্র সারা দেশের। এমনকি বনবিভাগ সামাজিক বনায়নের নামে চুক্তি করেও আদিবাসীদের সঙ্গে প্রতারণা করছে। চুক্তিতে বলা ছিল যে, আদিবাসীরা গাছ সংরক্ষণ ও যত্ন করবে এবং বড় হলে গাছ বিক্রির ৬৫% ভাগ টাকা তারা পাবে এবং বাকীটা বনবিভাগ পাবে। কিন্তু দশ পনর বছর কষ্ট করে গাছ পালনের পর বনবিভাগ আদিবাসীদের এ প্রাপ্য শেয়ার দিচ্ছে না। মধুপুরের অনেক আদিবাসী প্রতারিত হয়েছে। দিনাজপুরের সাঁওতালরা গত ২৯ সেপ্টেম্বর’০৫ বিশাল সমাবেশ করেছে বনবিভাগের প্রতারণার বিরুদ্ধে। অথচ বাঙালীদের সঙ্গে বনবিভাগ এ প্রতারণা করছে না।

গারোদের কৃষিকাজ
গারো কৃষিকাজ, ছবিঃ ইন্টারনেট

আমি গত ১ অক্টোবর’০৫ কুলাউড়ায় ফুলতলা খাসিয়া পুঞ্জিতে গিয়েছিলাম। ২০০৪-এর জুলাই মাসে এলাকার ভূমিগ্রাসী চক্রের সঙ্গে বনবিভাগের লোকজন মিলে ফুলতলা খাসিয়া পুঞ্জিটি তছনছ করে দিয়েছিল, লুট করে নিয়েছিল খাসিয়াদের সহায় সম্পদ। সেদিন গ্রামে ঢুকবার আগে বনবিভাগের গার্ডরা নির্বিচারে গুলি চালিয়েছিল উপরে। গুলিবিদ্ধ হয়ে ফুলতলা খাসিয়া পুঞ্জির হেডম্যানের ছেলে এখন এক চোখ অন্ধ। তার চোখের ভেতরে ছররা গুলি এখনও রয়ে গেছে। তার মার বাম হাতে গুলি লেগেছিল, তার মাংস ছিঁড়ে গেছে। এরকম অনেকেই এখনও শরীরে গুলির স্প্লিন্টার রয়ে নিয়ে বেঁচে আছেন। এত বড় আক্রমনের পরও খাসিয়ারা থানায় মামলা করতে পারেনি, বরং বনবিভাগ উল্টো খাসিয়াদের ওপর মিথ্যা মামলা দায়ের করে। হেডম্যানের মা, যার বয়স একশত বছরের অধিক, তাকে পুলিশ ধরে নিয়ে যায় এবং হাজতে ভরে। তার ভাইকেও পুলিশ ধরে নিয়ে যায়, সঙ্গে একটি যুবতী মেয়েকেও ধরে নিয়ে যায়। ওরা পালাতে পারেনি ওদের বৃদ্ধ মাকে রেখে, তাই ধরা পড়ে সন্ত্রাসীদের হাতে, আক্রমণকারীদের হাতে। এ আক্রমণের পরও ওরা আবার গড়ে তোলে ওদের গ্রাম। ওদের চারজন স্বজন বিনাদোষে জেলে থাকে দেড় মাস। জেল থেকে ফিরে মিথ্যা মামলা কাঁধে নিয়ে দুজন মারা যায়। ওদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বনবিভাগ, খাসিয়ারা গাছ চুরি করছিল। খাসিয়ারা গ্রামে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে, প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে লুণ্ঠন করার পর আদিবাসীদের নামেই মামলা হয় গাছ চুরির এবং এ মামলা যথারীতি গ্রহণ করে পুলিশ। এখনও আতংকে আছে ফুলতলার খাসিয়ারা। কারণ ওদের জায়গা স্থানীয় চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে যারা দখল করতে চায়, তারা ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়ায় থাকে। থানা পুলিশ তাই জেনেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে না।

Stop ethnic cleansing
Protest against ethnic cleansing, Image: Jumjournal

এরকম ভাবেই বেঁচে আছে আদিবাসীরা বা তারা বেঁচে নেই আসলে কোনোরকম টিকে আছে। যে ভূমিকে তারা মনে করতো তাদের অস্তিত্বের চিহ্নিত, এখানে প্রাণেরা জেগে থাকে, তাতে তাদের অধিকার আছে, ভূমিই জীবন, বাঁচার শেষ অবলম্বন, সেই ভূমির অধিকার তো সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। যে বনকে তারা মনে করতো তাদের এবং পরম মমতায় বনের মধ্যে জীবনকে সাজাতো, সেই বনের উপর তাদের অধিকার তো অস্বীকার করা হচ্ছে। আই এল ও কনভেনশন ১০৭ অনুস্বাক্ষর করার পরও কোনো সরকার  আদিবাসীদের ঐতিহ্যগত ভূমির অধিকারকে স্বীকার করে ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।

আমি বিগত কয়েক বছর ধরে জাতিসংঘ আদিবাসী বিষয়ক স্থায়ী ফোরাম, ওয়ার্কিং গ্রুপ অন ইনডিজিনাস পিপলস আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার ফোরামের সভায় অংশগ্রহণ করছি। একটি সভায় ফিলিপাইনের কর্ডিলেরা পিপলস এলায়েন্সের এক মহিলা প্রতিনিধি বলেছেন, আমাদের নিকট থেকে ভূমি কেড়ে নেয়ার অর্থ হলো একটি বাগান থেকে ফুল ছিড়ে নেয়ার মত। ভূমি নেইতো আদিবাসীদের জীবন নেই। ভূমি নেইতো আনন্দ নেই, উৎসব নেই, সংস্কৃতি নেই। ভূমিহীন মানুষ সংস্কৃতিচর্চা করবে কোথায়, তার নৃত্য করার, কথা বলার, গান করার, ভালোবাসার, মনের কথা বলার জায়গা কোথায়? তাঞ্জানিয়ার এক মাসাই আদিবাসী জাতিসংঘের অধিবেশনে গিয়ে বলেছেন, ভূমিহীন মানুষ হলো স্ট্রাইপবিহীন জেব্রার মতো (A man without land is like a zebra without stripes).

হাওয়াইয়ের এক আদিবাসী বলেছেন, ‘আকাশ, বাতাস, সমুদ্র, নদী,পাহাড়-পর্বত, ভূমি প্রকৃতির সাথে রয়েছে আদিবাসীদের নিবিড় সম্পর্ক। তাদের সংস্কৃতিতে ভূমি হলো মা, অরণ্যের মধ্যে তারা জননীর প্রাণের সন্ধান করেন, তারা প্রকৃতিকে অনুভব করতে পারেন, তারা বন ও সম্পদকে কোনোদিন বেচাকেনার বিষয় হিসেবে দেখেন না, জীবনের অংশ হিসেবে দেখেন। কিন্তু আধুনিক সভ্যতা বন, সম্পদ, প্রকৃতি সবকিছু ভোগ ও বাণিজ্যিক দৃষ্টিতে দেখে। অনেক আদিবাসী বলেছেন, অরণ্য নেই তো জীবন নেই। বাগানের গাছ থেকে ফুল তুলে নিলে যেমন ফুল শুকিয়ে যায়, অরণ্য ধ্বংস হবার ফলে আদিবাসীদের জীবনও আজ বিপন্ন। আদিবাসীরা বনকে বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গিতে না দেখে জীবনের অংশ হিসেবে দেখার আহবান জানান।

আদিবাসীদের বিপন্নতার জন্য মূলত আমাদের নষ্ট রাজনীতি দায়ী। সাম্প্রদায়িকতাপূর্ণ রাজনীতি আদিবাসীদের জীবনকে ছারখার করে দিয়েছে। কত শক্তি রাজনীতির? দেশকে ভাগ করে দেয়? আত্নীয় স্বজন-পরিজনকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়, এখন আদিবাসীরা নিজ বাসভুমে পরবাসী মানুষ। রাষ্ট্র ওদের অধিকার রক্ষা করতে এগিয়ে আসেনি। আমার খুব আশংকা হয়, ওরা একদিন নিজ সংস্কৃতির শেকড় না হারিয়ে ফেলে। এ নিয়ে আমাদের ভাবনা দরকার। ভালোবেসে ওদের পাশে দাঁড়ানো দরকার। আর যেটুকু ভূমি আজও আছে আদিবাসীদের তা প্রাণপণে রক্ষার ব্যবস্থা করা দরকার। আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠনের দাবি আদিবাসীদের দীর্ঘদিনের। আদিবাসীদের ভূমি প্রচলিত আইন দিয়ে ভূমিদস্যুদের হাত থেকে রক্ষা করা যাবে না।

Returning Home
Returning Home by Kanak Chanpa Chakma, Photo: www.artisttrekker.com/kanak-chanpa-chakma

তবে একটি ভালো খবরও আছে, কোথাও রুখে দাঁড়াচ্ছে আদিবাসীরা। এখন আদিবাসীদের এ নিজস্ব সংগ্রামকে শক্তিশালী করা দরকার। নিজবাসভূমে পরবাসীর দুঃখ ঘুচাতে হলে ভূমি রক্ষার কাজই সবার আগে করা দরকার। যে ভূমিতে সাঁওতাল বাস করেন উত্তরবঙ্গে, সে জমির কাগজ বা দলিলপত্র থাকুক বা না থাকুক, সে জমি ঐ সাঁওতালের । সরকারের খাতায় সে জমি খাস হিসেবে চিহ্নিত  হতে পারে, কিন্তু আদিবাসী সংস্কৃতিতে সে জমি ঐ আদিবাসীরই। আদিবাসীদের ঐতিহ্যগত ভূমির অধিকার আন্তর্জাতিক সনদে স্বীকৃত যার একটি হলো আই এল ও কনভেনশন ১০৭ যা বাংলাদেশ সরকারও র‍্যাটিফাই করেছে। সুতরাং যে আদিবাসী মধুপুরের বনে কাগজপত্রবিহীন ভূমিতে বাস করেন, আনারস, আলু, আদা, পেঁপে, বাগান করেন, সে জমি বংশপরম্পরায় তাদের। তাদের কাছ থেকে সরকার বা অন্যরা যদি সে জমি জোরপূর্বক কেড়ে নিতে চায়, সেটা হবে আন্তর্জাতিক সনদের লংঘন, যা মানবাধিকার লংঘন হিসেবে চিহ্নিত হবে। খাসিয়াদের জন্যও একই কথা প্রযোজ্য।

আদিবাসীদের এখন এই স্পিরিটের উপর কাজ করতে হবে। কাগজপত্র থাকুক বা না থাকুক আদিবাসী অধ্যুষিত জমি, সম্পদ, বন, গাছপালা এসবের মালিক আদিবাসীরাই। খাসিয়া এলাকায় ইকো-পার্ক আন্দোলন করে আমরা একটা পর্যায়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছি। সিরাজগঞ্জের তারাশ থানার মাধাইনগরেও আদিবাসীরা জেগে উঠেছে, উচ্ছেদ হওয়ার উপক্রম হওয়ার পরও তারা সরকারি প্রকল্প ঠেকিয়ে দিয়েছে। আমি আশাবাদী, মধুপুরেও আদিবাসীরাই জয়ী হবে তাদের সংগ্রাম, অরণ্যের বুকে অর্থহীন দেয়াল নির্মাণ বন্ধ হবে, বন্দীদশা থেকে আদিবাসীরা মুক্ত হবে।

আদিবাসীরা নিজেরা যে জেগে উঠেছে, এ কাজকেই এখন সবার সহযোগীতা করা দরকার। জীবনে জীবন মেলাবার কাজ শুরু করা দরকার। এসবই আশার কথা। কিন্তু তার জন্য প্রগতিশীল মুক্তমনা সকলের বিরামহীনভাবে কাজ করে যেতে হবে। আদিবাসীদের নিজেদের ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। বঞ্চিত মানুষদের ঐক্য ছাড়া মুক্তি নেই, সংগ্রাম ছাড়া অধিকার আদায়ের সহজ কোনো পথ নেই। আদিবাসীদের মধ্যে আদিবাসী হিসেবে পরিচিতি লাভের আকাংখা প্রতিষ্ঠা করতে হবে, তার মধ্যে গর্বের ও আস্থার জায়গা তৈরি করে দিতে হবে। নেলসন ময়াণ্ডেলা যে আদিবাসী এ কথাই তো অনেকে জানেন না। জানলে আদিবাসীরা সম্মানিত বোধ করতেন। বিশ্বব্যাপী আদিবাসীদের এ চেতনাই এখন আলোচিত হচ্ছে, আদিবাসীদের সম্মান করবার সংস্কৃতি বিস্তৃতি ঘটছে। বাংলাদেশেও জেগে উঠেছেন আদিবাসীরা, এটাই সবচেয়ে আশার কথা।


লেখকঃ সঞ্জীব দ্রং

তথ্যসূত্রঃ মাওরুম, অপরাজেয় ভাষা সংকলন মার্চ ২০০৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here