আমি মাচাং ঘরেই ভালো ছিলাম, তাই মাচাং ঘরেই থাকতে চাই

0
58

১.দাও ফিরিয়ে সে অরণ্য, লও এ নগর।

                                                 ~~~~~~~~ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ

২. আজার সুগে এলং আমি, ভাজে নেযেয়ে সে সুগকানি। (হাজার সুখে ছিলাম আমরা, [কাপ্তায় বাধেঁর পানি] ভাসিয়ে নিয়ে গেছে সে সুখগুলো)  ~~~~~~~~  আমাদের চাকমা ভাষায় রচিত গান।

রাঙ্গামাটি সহ পুরো পার্বত্য এলাকার সংকট এবং আমার কিছু কথাঃ

গত কিছুদিন আগে সাজেকে যে খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছিল তার জন্য আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জুম্ম শিক্ষার্থী পরিবার তথা রাঙ্গামাটি সহ পাহাড়ের বিভিন্ন সংগঠন, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের জুম্ম ছাত্র/ছাত্রী, ব্যক্তিবিশেষ অনেকেই ত্রাণ উত্তোলন তথা সেগুলো সাজেকবাসীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য তৎপরতা শুরু করি। যে ধারাটা আধো চলমান। আর যে উদ্যোগটা সাজেকের জন্য চলমান ছিল তা আরো নতুনভাবে বেগ দিতে হয়েছে হায়েনাদের কতৃক সৃষ্ট লংগদু সহিংসতায় (২জুন ‘১৭) ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ৩০০টির অধিক ঘরছাড়া আর এক কাপড়ে থাকা মানুষদের কথা ভেবে। এ উদ্যোগটি চলমান রাখতে না রাখতে শুরু হল প্রাকৃতিক সৃষ্ট সংকট।

আজ (১৩জুন ‘১৭) রাঙ্গামাটি শহর সহ পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন জায়গায় অতিরিক্ত বৃষ্টির দরুণ পাহাড় ধসে এ পর্যন্ত প্রায় ১০০ জনের মৃত্যু! অধিকাংশের ঘড়বাড়ি ধসে পড়েছে, ফাটল ধরেছে। কত সংকট!! আমি উক্ত তিনটি জায়গায় সংকটগুলোর কথা বললাম সবগুলো একই। আর সব সংকটকে আমি উপরোক্ত কবিগুরুর কথার আলোকে একই সূত্রে গাথাঁ বলে ধরে নেব।

প্রথমেই আসি সাজেকে সংকট দিয়ে। সাজেকের খাদ্যভাবের পেছনে রাজনৈতিক কিছু প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কারণকেই দায়ী করতে আমি দ্বিধাবোধ করবো না। কেননা, আমার জানা মতে সাজেক পর্যটন কেন্দ্রের ফলে যে মানুষগুলোকে তাদের বাপ দাদার চিরায়ত ভূমি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে তাদের ক্রমশ প্রান্তিক থেকে প্রান্তিক সীমানায় নেয়া হয়েছে। যার ফলে তারা হারিয়েছে তাদের জীবিকার মূলবাহন জুম চাষের মূল ক্ষেত্র – ভূমি। যে ভূমিতে এখন গড়ে উঠেছে রমরমা পর্যটন কেন্দ্র। অার অন্যের পেটে লাথি মেরে গড়া পর্যতন কেন্দ্রে ফুর্তি, আমোদ,বিলাস ভাব নিয়ে সমতল থেকে নানা মানুষ যাই আহ্লাদে, আনন্দে ঘুরতে। আর তারা বড় বড় দালান-বাড়ি দেখে স্বভাবতই ধরে নেয় শাসকগোষ্ঠী সে অঞ্চলে কী উন্নয়ন না করেছে! কিন্তু যে উন্নয়নের জোয়ারে ভেসে গিয়ে কারা যে শুন্য উদরে চাপা ক্ষোভ আর হতাশা-দুঃখ নিয়ে দিনাতিপাত করছে তা জানে না। কাজেই শাসকের চাপানো উন্নয়ন যেহেতু সে অঞ্চলের ভূমিপুত্রদের কাছে নিরর্থক সেহেতু সেখানে খাদ্যসংকট দেখা দেবে বৈকি! কাজেই সাজেকের খাদ্যভাবের ক্ষেত্রে শাসকগোষ্ঠীর আদিবাসী উচ্ছেদের যে নীতি সে নীতিটির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রতিফলন হিসাবে দেখছি।

অন্যদিকে এ সংকট কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই বিগত ২জুন আবারো প্রত্যক্ষভাবে লংগদুতে যে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হল!!

আমি সে কথাই (লংগদু সহিংসতা)বলব এখন,
নিরাপত্তাবাহিনীর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদদে বলি,সাপোর্টে বলি যেভাবেই হোক স্থানীয় সেটেলার বাঙালি কতৃক পাহাড়ীদের প্রায় ৩০০টির অধিক বাড়ীতে যে অগ্নিসংযোগ করে লুন্ঠন করা হল, পুড়িয়ে দেয়া হল জুম্মদের ঘরবাড়িগুলো! এ মানুষরা আধো এক কাপড়ে এ তুমুল বর্ষার দিনে ছাদহীন অবস্থায় খোলা আকাশের নিচে রয়েছে! এদের অপরাধটা কী!

নুরুল ইসলাম নয়ন নামে এক বাঙালী হত্যা হয়েছে। তার দায় কী লংগদুর এ ৩০০পরিবারের!! হত্যা হয়েছে। তদন্ত করুন, রাষ্ট্রের প্রচলিত আদালতে আইন অনুসারে বিচার করুন। প্রকৃত দোষীকে শাস্তি দিন। কিন্তু এ সহিংসতা কেন!

অতঃপর বলি আজকের(১৩জুন) রাঙ্গামাটির প্রাকৃতিক দুর্যোগে সৃষ্ট সংকটের কথা। অতিরিক্ত বর্ষণের দরুণ পাহাড় ধসে এ পর্যন্ত প্রায় ১০০জনের মৃত্যু, অনেকের নিখোঁজ হওয়া! এর থেকে আর কত্ত বড় সংকট হতে পারে! এ সংকট যদিও বা প্রাকৃতিক হয় কিন্তু এই প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রনে যেহেতু মানুষের হাত রয়েছে সেক্ষেত্রে আমি বলব এক্ষেত্রে মানুষই দায়ী। আর সে মানুষরা নিশ্চয়ই শাসকের কাটারে থাকা নিষ্ঠুররা। কেননা আমরা আদিবাসীরা প্রকৃতির পরম বন্ধু। বন, জঙ্গল, পাহাড়ের সাথে আমাদের যে বন্ধুত্ব সে বন্ধুত্বে শাসকেরা উন্নয়নের দালান নিয়েই টো গেছেন আমাদের কাছে! নয় কি?

আমি আজকের এ বয়সে এসে কেবল এ প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে পাহাড়ের এতগুলো মানুষের মৃত্যুকে দেখলাম।আরো হয়ত বাড়তে পারে এ সংখ্যাটা। মৃত মানুষগুলো পাহাড়ী হোক, বাঙালী হোক এমনকি জানামতে বেশ কয়েকজন সেনাসদস্যও মারা গেছে, যাই হোক সবাই মানুষ। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে এত বড় সংখ্যায় পাহাড়ের মানুষের মৃত্যুর খবর আমি আগে কখনো শুনিনি। পাহাড়ী আদিবাসীরা আগেকার দিনে পাহাড়ের ঢালে ঢালে কত মাচাং ঘর বেধে বসবাস করেছেন। কিন্তু সে পাহাড় ধসে এত লোকের মৃত্যু তো আগে কখনো হয়নি! কিন্তু এখন কেন!

আমি কোনো মৃত্তিকা বিজ্ঞানিও নয়, পরিবেশবিদও নয় কিন্তু স্বাভাবিক এক দৃষ্টিকোণ দিয়ে দেখলে দেখা যাই যে, রাজনৈতিক কুউদ্দেশ্যে পাহাড়ের ডেমোগ্রাফিকে পরিবর্তন যদি করা না হতো তাহলে পাহাড়ী বাঙালী কাউকে পাহাড়ের ঝুকিঁপূর্ণ জায়গায় দালান বানাতে হত না। আমরা পাহাড়ীরা মাচাং ঘর নিয়েই শান্তিতে ছিলাম। এই মাচাং এর বদলে যখন উন্নয়নের ফিরিস্তি হাতে বিল্ডিং গড়া হল পাহাড়ে তখন সে পাহাড় ধসে না পড়ে উপায় আছে? আমি রাঙ্গামাটি শহরের অনেক ঝুকিঁপূর্ণ জায়গায় অনেক স্থাপনা দেখি। এগুলোর মূল কারণ কিন্তু আমরা পাহাড়ীরা কম জনসংখ্যায় আমাদেরকে নিয়ে সে হাজারো সুখে ছিলাম সে সুখে ক্রমাগত আঘাত করে পাহাড়ে জনবিষ্ফোরণ ঘটানোর ফল বলে মনে করি। আর আমরা অনেক সময় দেখি, পাহাড়ের কাঠ কোথায় পাচার হচ্ছে। আমরা সবাই জানি। কাজেই হায়েনারা যেখানে পাহাড়ের অতন্দ্র প্রহরী সেই বৃক্ষকে ধ্বংস করে নিজেই অতন্দ্র প্রহরী সেজে লুন্ঠন করছে,বন ধ্বংস করে ফায়ারিং ল্যান্ড করছে তখন সে পাহাড় ধসে পড়বেনা তো কোন পাহাড় ধ্বসবে! যেখানে পাহাড় তার মাথা গুজাবার ঠাইঁটুকু পাচ্ছে নাহ্। কাজেই আমি বলব, আমরা মাচাং ঘরে ভালোই ছিলাম।

কিন্তু এখন পাহাড়ের পাদদেশে পাহাড়ের ঢাল কেটে বিল্ডিং গড়েই আমরা মরছি ১০০ এর উপরে।

উপরোক্ত সকল সংকটে শাসকের আদিবাসী উচ্ছেদের যে পায়তারা সে নীতির প্রতিফলন কিছুটা হলেও রয়েছে বলে মনে করি। তাই হাজারো প্রতীক্ষায় আধো গায়- “আজার সুগে এলং আমি, ভাজে নেযেয়ে সে সুগকানি।”

আর সে সুখ খুজঁতে চাই আমার সেই মাচাং ঘরের ইজোরে দক্ষিণা বাতাসের স্রোতে বসে, কৃত্রিমতার মোড়কে, উন্নয়নের আদলে তৈরী বিল্ডিং এ নয়।


লেখকঃ সতেজ চাকমা, শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here