জাগো হে জুম্ম নারী, জাগো!

0
41

চারপাশে নিরবিচ্ছিন্ন ঝিঝিপোকার ডাক। ঘুতঘুতে অন্ধকারে মোড়া ভীষণ কালো রাত। পাহাড়ের কোলে নিষ্পাপ একটি ঘুমন্ত গ্রাম। গ্রামের নির্জন কিয়ংটার (বিহার) পাশে যে শতবছরের বটগাছটি সেখান থেকে প্রহরী কুকুরগুলো কেন যেন খুব করে ডাকছে। ঠিক এমনই এক মধ্যরাতে ১০-১৫ জনের একটি আর্মির দল আপনার বাড়িতে এসে কড়া নাড়ছে। অত:পর! জলপাই রঙের উর্দিওয়ালারা আপনার ভাই-বাবার সামনে থেকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যেতে থাকলো আপনাকে….

ভাবতেই ছমছম করে গা শিউড়ে উঠে!! এভাবেই হারিয়ে গিয়েছিলো কল্পনা চাকমা। ১৯৯৬-র ১১ জুন কালো রাতে। আমরা আর ফিরে পাইনি তাকে!

লংগদুর ১৬ বছর বয়সী সুজাতা চাকমা গিয়েছিলো পাশের ধানখেত থেকে ছেড়ে দিয়ে আসা গরুগুলোকে নিয়ে আসতে। ফিরে আসে নি! সন্ধ্যাবেলায় তাঁর ক্ষত-বিক্ষত দেহখানি পড়েছিলো ঝোঁপের ভিতরে। থুমাচিং মারমার কথা মনে আছে? স্কুল পড়ুয়া মেয়েটির কত স্বপ্নই হয়তো ছিলো! লোলুপ আগ্রাসী থাবায় হারিয়ে গেছে এই তো কদিন হলো মাত্র!! সবিতা চাকমা, বলিমিলা চাকমা তালিকাটা করতে গেলে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘ হতে থাকবে কেবল!

এমনিতর এক ভয়ঙ্কর বাস্তবতায় আমাদের বাস! পার্বত্য চট্টগ্রাম! যুগ যুগ ধরে নিপীড়ন-নিষ্পেষণ-নির্যাতনের ইতিহাসে মোড়া পার্বত্য চট্টগ্রাম। একই সাথে প্রতিরোধের-সংগ্রামের এবং বীরত্বের সাক্ষ্য বয়ে নিয়ে চলা পার্বত্য চট্টগ্রামও বটে!

শত বঞ্চনা-লাঞ্চনা, নিপীড়ন-নির্যাতন-নিষ্পেষণের যাঁতাকলে পিষ্ট হতে থাকা জীবনের শেষ রক্তবিন্দুটিতে যেটুকু পরিমাণ আবেগ এখনো জমে থাকে অনাদরে তা পুজি করেই তবু আজো তান্যেবীকে মনে করে, ধনপুদিকে মনে করে পুনংচান এবং রাধামনরা হাজার বছরের বিরহী-বিপ্লবী সুরে গান বাঁধে! সে গানে একবার কান পেতে দেখো না জুম্মবী-

“আইলো পাহাড়ী কন্যা গো, তোকে গান শুনাবো

আইলো বনের কুমারী গো তোকে গান শুনাবো

সেই গানেতে প্রেম আছে, প্রেমের ভিতর বারুদ আছে

ভালোবাসার অপমানে জ্বলতে শিখাইবো

তোকে এমন গান শুনাবো!”

–মাদল

এই গানের যে মর্মব্যাথা, এই গানের যে অর্ন্তবেদী আহবান সেই মর্মব্যাথা হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করে জুম্ম তরুণের আহবানে সাড়া দিয়ে মিছিলের স্রোতে মিলিত হোক জুম্মবীর ভালোবাসা!

“বনের যত কাঁচা সবুজ অঙ্গেতে মাখিবি

বুনো ফুল খোঁপায় বেঁধে মিছিলেতে যাবি”

— মাদল

বুনোফুল খোপায় বেঁধে নিতে জুম্মবীর জুড়ি মেলা ভার। রাজা বিজয়গিরির যুদ্ধফেরত সেনাপতি রাধামন ধনপুদির জন্য ‍”ঘিলেফুল” পারতে যেয়েই তো জীবন সঁপে দিলেন “কালাজামুরো” সাপের বিঁষে! ধনপুদি ফিরে এসো। ফিরে এসো জুম পাহাড়ের বুকে। বুঝে নাও এ লড়াই! এ লড়াই হোক তোমার-আমার শাশ্বত প্রেমের অঙ্গীকার!

কেবল প্রেম-বিরহের উপাখ্যানে নয়, সমাজ পরিবর্তনের লড়াইয়ে, রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে জুম্ম নারী কেবল অণুপ্রেরণার উৎস হয়ে উপমায় সীমাবদ্ধ থাকে নি, যুগে যুগে পুরুষের পাশে অসীম সাহসিকতায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছে।

১৯৭২ সাল! সবে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা সংবিধানে জুম্ম জনগণের জন্য বেঁচে থাকার অধিকার চাইলেন। প্রত্যাখ্যান করা হলো। লারমার নেতৃত্বে গঠিত হলো জনসংহতি সমিতি। সমিতির নেতারা নেমে পড়লেন জাতীয় সংগ্রাম গড়ে তোলার কাজে। সমগ্র জুম্ম সমাজে সংগ্রামী এক নতুন দিনের আশা। দিকে দিকে আন্দোলনের কথা ছড়াতে লাগলো। সেই আন্দোলনের সংস্পর্শে এলেন মাধবীলতা চাকমা। আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জানলেন। জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে যুক্ত থাকার শপথ নিলেন। ১৯৭৩ সালের দিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতি প্রতিষ্ঠাক্ষেত্রে ভূমিকা রাখলেন। শান্তিবাহিনীর দীর্ঘ ২৪ বছরের সশস্ত্র সংগ্রামে নিজেকে নিয়োজিত রাখলেন। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই চালিয়ে গেছেন জ্যোতিপ্রভা লারমা, জড়িতা চাকমা, উমে মগ প্রমুখদের সাথে। আজীবন কুমারী হয়ে থাকলেন, কিন্তু জুম্ম জনগণের জন্য লড়াই এখনো পর্যন্ত থামাননি। এখনো রাজপথে থাকে তাঁর সরব উপস্থিতি।

একজন জ্যোতিপ্রভা লারমার সংগ্রাম, একজন মাধবীলতা চাকমার সংগ্রাম, একজন কল্পনা চাকমার সংগ্রাম কখনোই বৃথা যেতে পারে না। জুম্ম জনগণের জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে জ্যোতিপ্রভা লারমা, মাধবীলতা চাকমা, কিংবা কল্পনা চাকমাদের বীরত্বপূর্ণ অংশগ্রহণই প্রমাণ করে দেয় জুম্ম নারীকে “অবলা” খেতাব দিয়ে কখনোই দমিয়ে রাখা যায় নি, যাবেও না। কল্পনা চাকমাকে অপহরণ করা হয়েছে, তাঁর চেতনাকে দমিয়ে রাখা যায়নি।

ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে জুম্ম নারী জুম্ম পুরুষের সাথে সমানতালে কদম চালিয়েছে সম্মুখে। পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র সংগ্রাম চলাকালীন সেই উত্তাল দিনগুলোতে কী সাহসী ভূমিকাই না রেখেছিল জুম্ম নারী। সফল কোন গেরিলা অপারেশন শেষে মাইলের পর মাইল মার্চ করে আসা ক্লান্ত সৈনিকদের জুমঘরের “ইঝোরে” বসিয়ে “হত্তি” থেকে “নন্যেশিলো হুয়োর” পানি পান করানো সেই মহীয়সী জুম্ম নারীর “পিনোন” এ যে দুখীনি “সাবুগী” তাতে একটু “রেবেক” ফুলের হাসি তুলে দেওয়ার জন্যই তো আজো ফুরমোন, ফালিটাঙ্যে, এহদোশিরে মৌনে নতুন করে মার্চিং করার স্বপ্ন দেখে শতশত জুম্ম যুবক! এ সপ্নের সারথি আর কেউ না হোক জুম্মবী নিশ্চয়ই হবে। সেই ভরসাতেই তো আজো পথ চলা। সেই ভরসা নিয়েই তো আজো আগামীর সমৃদ্ধ জুম পাহাড়ের স্বপ্ন!

কবিতা চাকমার লেখা সেই বিখ্যাত চাঙমা কবিতাটি পড়া হয়েছে কখনো? কী অমিয় সাহসেই না তিনি উচ্চারণ করেছেন,

“জ্বলি ন উধিম কিত্তেই?”

জুম্মবী, বলতো “জ্বলি ন উধিম কিত্তেই?” “জ্বলে উঠবো না কেন?” কল্পনা চাকমারা যদি হারিয়ে যেতেই থাকে, থুমাচিংদের দেহ যদি শকুনের লোলুপ দৃষ্টি থেকে রেহাই না পায়, সুজাতার ক্ষত-বিক্ষত দেহগুলি যদি পড়ে থাকে ধানখেতে তবে জ্বলে না উঠে যে উপাই নেই!!

রাণী কালিন্দী! হুরোহুট্টে গোজার বুদ্ধিমতী এক রমণী! রাণী হওয়ার আগে নাম ছিলো কালাবি। চাকমা রাজা ধরম বক্স খাঁর প্রিয়তমা রাণী। কারো কারো মতে, ১৮৪৪ সালে তিনি চাকমা রাজ্য শাসনের অধিকার অর্জন করেন। আবার কারো কারো মতে রাজা হরিশচন্দ্রের মৃতু্যর পরপরই ১৮৩২ সালের দিকে তিনি সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন। যাই হোক, ইতিহাস মতে, বর্তমান চট্টগ্রাম-রাঙ্গামাটি সড়কের রাণীরহাট বাজারটি রাণী কালিন্দীর সময়েই প্রতিষ্ঠিত। তাই রাণীর সম্মানার্থে বাজারটির নাম হয় রাণীর হাট। অনেক ঐতিহাসিকের দৃষ্টিতেই রাণী কালিন্দী ছিলেন অনেক বেশী স্বাধীনচেতা এবং সাহসী! তাই জনশ্রুতি আছে যে, সেসময়কার ব্রিটিশরাজের কোন এক প্রতিনিধি (খুব সম্ভব ক্যা্পেটন লুইন!) রাণীর সাক্ষাৎ প্রার্থনা করলে রাণী বলেছিলেন, ‘সাদা বান্দরদের মুখ আমি দেখতে চাই না”! যেখানে আমাদের ইতিহাস প্র্রবল পরাক্রমশালী ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের নিকট মাথা নত না করার ইতিহাস, সেখানে রাণী কালিন্দীর এই যুগের উত্তরসুরীরা তবে কেন প্রতিদিন রক্তাক্ত হবে সেটেলারদের আগ্রাসনে? কোন প্রতিরোধ ছাড়াই? জাগো হে জুম্ম নারী, জাগো।

কোন সন্দেহ ছাড়াই বলা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান যে নাজুক বাস্তবতা সে বাস্তবতার সবচেয়ে করুণ শিকার হচ্ছে জুম্ম নারীরা। কিন্তু হাজার বছরের স্বতন্ত্র ঐতিহ্যের ভাঁজে মোড়ানো জুম পাহাড়ে আজ যখন নিত্য ভূমি থেকে উচ্ছেদের আয়োজন, কারণে-অকারণে সাম্প্রদায়িক হামলার কারসাজি, চারিদিকে ওঠ পেতে থাকা ধর্ষণযজ্ঞের কুশীলবদের দ্যৌড়াত্ম্য তখন কেন জুম্মবীর ফ্যাকাশে মুখ পালিয়ে বেড়াতে চায় কৃত্রিম সান্তনার বাণী খুঁজে নেওয়ার ভ্রান্ত মোহে?

কত সাধ নিয়েই তো গাইতে চেয়েছিলাম,-

“মা গঙ্গারে সাক্ষী রাগেই, বুগোত তরে লোম তুলি

দূরর ঐ হালা মোনত চিগোন গুরি ঘর বানি”

মা গঙ্গাকে সাক্ষী রেখে বুকে তোমায় নেবো তুলে

দূরের ওই কালোপাহাড়ে ছোট্ট একটা জুমঘরে

নিত্য ঘর জ্বলে। নিত্য জ্বলে বুক। এত এত জ্বালা-জ্বালির ভীড়ে কীসের আবার সুখ? নিজের ধ্বংসস্তুপের সামনে দাঁড়িয়ে, মরার আগেই যখন এই দেহখানিকে আবিষ্কার করি চিতার উপরে তখন কীভাবে দূরের ঐ পাহাড়চূড়াই ছোট্ট জুমঘরটির স্বপ্ন বুনি? না, তবুও আমাদের স্বপ্ন বুনতেই হয়। আমরা আশায় বুক বাঁধি জুম পাহাড়ে “অধিকার” শব্দটি ফিরে আসবে, হারানো ভিটেমাটিতে আমাদের বাপ-দাদারা বসত গড়বে, স্কুলফেরত থুমাচিং-সুজাতাদের শরীর আর ক্ষত-বিক্ষত হবে না। এমন স্বপ্ন আমাদেরকে বুনতেই হবে। সে যাত্রায় লড়াই ছাড়া কী কিছু হয়, বন্ধু?

তাই শতবছরের চলমান বঞ্চনার বিরুদ্ধে অনেক ক্ষোভের আগুন নিয়ে যখন রাজপথে নামতে যাই, ভীষণভাবে গাইতে থাকি –

“জুম্মবী হমলে আহধিবে ম ঢাগত

হমলে ত গাঙান মিজিবো ম গাঙত?”


লেখকঃ সুলভ চাকমা 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here