সাঁওতাল বিদ্রোহ: ভগনাডিহির সিদু-কানু

0
120

সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে থেকে ওই অঞ্চলের সাথে খাপ খাইয়ে যারা কৌমজীবন বা গোষ্ঠীজীবন যাপন করে, তাদের আদিবাসী বলে। চাকমা, গারো, মারমা, মনিপুরি, খাসিয়া- ওরাই আমাদের দেশের আদিবাসী। ওদের কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্যও থাকে। ওদের আলাদা নিজস্ব উৎসব, রীতি-নীতি, নিজস্ব প্রথা-আচার থাকে। এমনকি ওদের আলাদা নিজস্ব ধর্মও থাকে। ওদের বিয়ে করার পদ্ধতি আলাদা, চাষ-বাসের পদ্ধতিও আলাদা। আমাদের দেশের এমনি এক আদিবাসী জনগোষ্ঠী হলো সাঁওতাল।

সাঁওতাল
সাঁওতাল

 

বাংলাদেশের রাজশাহী, বগুড়া, দিনাজপুর ও রংপুর জেলায় সাঁওতালরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে বাস করে। ওদেরকে বলা হয় এ অঞ্চলের প্রকৃত আদি অধিবাসী। বাংলা ভাষাতে এ অঞ্চলের পুরনো অধিবাসীদের যে সব শব্দ আছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আছে সাঁওতালি শব্দ। ওদের গায়ের রং কালো, চুল কালো ও কোঁকড়া, নাক আর ঠোঁট মোটা।

 

অন্যান্য আদিবাসীদের মতো ওদেরও মিষ্টি-প্রাচীন ঐতিহ্য আর মিষ্টি একটা ধর্ম আছে। আর ওরা ভীষণ সহজ-সরলও। পরিশ্রমও করতে পারে খুব। কাজ করার সময় ছেলে-মেয়ে কোনো ভেদাভেদ নেই, সবাই মিলেই কাজ করে।

 

বাংলাদেশের বাইরে ভারতেও অনেক সাঁওতাল থাকে। ওদের বসতি বা গ্রামগুলোকে সাধারণভাবে বলা হয় সাঁওতাল পল্লী।

 

এই শান্ত সাঁওতালরাও একবার বৃটিশদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছিল। সে ঘটনা ইতিহাসে বিখ্যাত ‘সাঁওতাল বিদ্রোহ’ নামে। সেই বিদ্রোহের দুই বীর যোদ্ধা দুই ভাই সিদু আর কানু। তাদের আরো দুই ভাই ছিলো- চাঁদ আর ভৈরব। বাবার নাম চুনার মুরমু। বাস ভগনাডিহি গ্রামে। বাবা চুনার মুরমু ছিলেন ভগনাডিহি গ্রামের মোড়ল। গল্পের শুরু ১৮৫৫ সালে।

 

এর অনেক আগে থেকেই অবশ্য অত্যাচারী ইংরেজ শাসক আর জমিদার মহাজনদের সাথে সাঁওতালদের এক রকম দ্বন্দ্ব চলছিলো। সাঁওতালরা সহজ সরল হলে কী হবে, ওরা কিন্তু খুবই স্বাধীনচেতা। কারো বশ্যতা স্বীকারই করতে চায় না। তাই ইংরেজরা অনেক চেষ্টা করেও তাদেরকে শাসনে আনতে পারছিলো না। শেষমেশ তারা সৈন্য পাঠালো। ক্যাপ্টেন ব্রুকের নেতৃত্বে একদল সৈন্য সাঁওতালদের দমন করতে গেলো। সেটা ১৭৭২ সালের কথা। শুরু হলো ইংরেজদের সাথে সাঁওতালদের সংগ্রাম।

 

অনেক যুদ্ধে হেরে, অনেক কৌশলের আশ্রয় নিয়ে, শেষমেশ ইংরেজরা সাঁওতালদের অধীনে আনলো। তারপর তারা সাঁওতালদের সরলতার সুযোগ নিয়ে স্রেফ প্রতারণা করলো। তারা সাঁওতালদের হাতে মুর্শিদাবাদ, বীরভূম আর ভাগলপুরের বিশাল অঞ্চল ছেড়ে দিলো, যার প্রায় পুরোটাই ছিলো পাহাড়ি বনাঞ্চল। কথা ছিলো সেখানে চাষবাস করলে সাঁওতালদের খাজনা দিতে হবে না। তাই সাঁওতালরা ওখানে জঙ্গল সাফ করে গ্রাম প্রতিষ্ঠা করলো। কিন্তু কিছুদিন পরেই ইংরেজরা তাদের প্রতিশ্রæতি ভঙ্গ করে খাজনা আদায় করা শুরু করলো। শুধু শুরু করলো না, দিনকে দিন খাজনার পরিমাণও বাড়াতে লাগলো। ১৮৫৪-৫৫ সালের দিকে খাজনার পরিমাণও যেমন বেড়ে গেলো অনেক, তেমনি বেড়ে গেলো খাজনা আদায়ের জন্য সাঁওতাল কৃষকদের উপর অত্যাচারের মাত্রাও। এমনি পরিস্থিতিতে দুই ভাই সিদু আর কানু ডাক দিলো বিদ্রোহের।

 

১৮৫৫ সালের ১৫ জুন সিদু-কানু সাঁওতাল গ্রামে গ্রামে ‘গিরা’ পাঠালো। গিরা হলো শালগাছের ডাল। সাঁওতালদের কাছে গিরা পাঠানোর মানে হলো ধর্মীয় আহ্বান জানানো। সিদু-কানু সকল সাঁওতালদের দেবতার নামে ডাক দিলো। ওদের নিয়মই হলো, ওরা কখনো ধর্মের ডাক আর গোত্রের ডাক উপেক্ষা করে না। প্রায় সকল কৌমজীবী আদিবাসীদেরই এই নিয়ম। আর তাই সব সাঁওতালরাই ওদের ডাকে সাড়া দিল।

 

পুরো বনাঞ্চলে আওয়াজ উঠলো, চল চল ভগনাডিহি চল।

 

জুন মাসের ৩০ তারিখ। ভগনাডিহি গ্রামে প্রায় ১৫ হাজার সাঁওতাল জড়ো হলো। হাতে তীর-ধনুক, টাঙ্গি-কুড়াল, ধামসা-মাদল। সিদু-কানু ওদের সবাইকে বললো, কীভাবে তারা প্রতারিত হচ্ছে। তাদের কষ্ট করে জঙ্গল কেটে তৈরি করা জমি কীভাবে তাদেরকে না দিয়ে জমিদাররা নিয়ে নিচ্ছে। তারা দেবতার নামে স্বাধীন সাঁওতাল রাজ্য প্রতিষ্ঠার ডাক দিলো। সিদু-কানুর বলিষ্ঠ ভাষণে ১৫ হাজার সাঁওতাল এক সুরে গর্জে উঠলো। তারা ঠিক করলো- কলকাতা অভিমুখে পদযাত্রা করবে।

 

সিদু-কানুর নেতৃত্বে প্রায় ৩০ হাজার সাঁওতাল একসাথে হেঁটে হেঁটে কলকাতার পথে রওয়ানা হলো। তবে সাথে নিয়ে আসা খাবার শেষ হয়ে যাওয়ার পর কিছু বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে লাগলো। পথের মাঝেই তারা খবর পেলো দুইজন সাঁওতালকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সিদু-কানু খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্ত বদল করলো। আগে ওদের দুজনকে উদ্ধার করতে হবে। তারা দুই সাঁওতালকে নিয়ে যাওয়ার সময় দারোগার পথরোধ করলো।

 

দারোগা তো প্রথমটা হকচকিয়ে গেলো। সে ভাবতেও পারেনি সহজ সরল সাঁওতালরা এমন রণমূর্তি ধারণ করতে পারে। সিদু-কানু তার হাত থেকে বন্দী দুই সাঁওতালকে মুক্ত করে নিলো। রেগেমেগে দারোগা সিদু-কানুকে গ্রেফতারের নির্দেশ দিলো। বেঁধে গেল সংঘর্ষ। উত্তেজিত সাঁওতালদের হাতে দারোগা আর তার সঙ্গী মারা গেলো।

 

সেদিন ছিলো ৭ জুলাই। সিদু-কানু ঘোষণা দিলো, আজ থেকে এখানে কোনো সরকার নেই। আজ থেকে সাঁওতাল রাজ চলবে।

 

এবার সাঁওতালরা সিদু-কানুর নেতৃত্বে কুখ্যাত কুখ্যাত সব মহাজনদের ধরে ধরে শাস্তি দিতে লাগলো। এসব মহাজনরা এতোদিন তাদের সহজ সরল পেয়ে তাদের উপর অত্যাচার করে যাচ্ছিলো। কাজেই এবার শাস্তি পেতে লাগলো।

 

১১ জুলাই তারা পাকুরের রাজবাড়ি আক্রমণ করলো। ১৫ জুলাই পাকুরের তরাই নদীর তীরে ইংরেজদের সাথে সাঁওতালদের এক বিশাল যুদ্ধ হলো। এ যুদ্ধে অবশ্য সাঁওতালরা জিততে পারেনি। অসংখ্য সাঁওতাল যুদ্ধে মারাও যায়। আহত হয় সিদু, কানু আর ভৈরব।

 

কিছুদিন পরে ফুদকিপুরের কুখ্যাত কুঠিয়াল লারকিন্স তার লাঠিয়াল বাহিনী নিয়ে সাঁওতালদের মুখোমুখি হয়। যুদ্ধে তার শোচনীয় পরাজয় ঘটে। সে আর তার ছেলে সাঁওতালদের হাতে মারা যায়।

 

১৬ জুলাই মেজর বরোজ এক বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে পিয়ালপুরে ঘাঁটি গাড়েন। সঙ্গে ছিলেন মেজর স্টুয়ার্ট আর কর্নেল জেন্স। কাছেই এক পাহাড়ের উপর ছিলো সাঁওতালদের ঘাঁটি। বিশাল সৈন্যবাহিনী বন্দুক-কামান নিয়েও তীর-ধনুক নিয়ে যুদ্ধ করা সাঁওতালদের সাথে পারলো না। দীর্ঘ ৫ ঘণ্টার যুদ্ধ শেষে মেজর বরোজের বিশাল সৈন্যবাহিনী হেরে গেলো।

 

যুদ্ধে জিতে সাঁওতালদের আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেলো। ২১ জুলাই কাতনা গ্রামে একদল পুলিশের সাথে বিদ্রোহীদের মুখোমুখি সংঘর্ষ হলো। যুদ্ধে পুলিশরা হেরে গেলো। এদিকে ক্রমশ দুর্বার হয়ে ওঠা বিদ্রোহীদের দমন করতে লেফটেন্যান্ট টোলমাইন ও রাইকস এক বিরাট সৈন্যদল নিয়ে হাজির হলেন। খয়রাশোলে প্রচণ্ড যুদ্ধ শেষে এবারও হেরে গেলো ইংরেজরা। লেফটেন্যান্ট টোলমাইন যুদ্ধের ময়দানেই মারা গেলেন।

 

যুদ্ধে না পেরে ইংরেজরা এবার অন্য কৌশল নিলো। নিতান্ত কাপুরুষোচিত কৌশল। তারা সাঁওতাল পল্লীতে আগুন ধরিয়ে বৃদ্ধ, নারী, শিশুদের হত্যা করতে শুরু করলো। একের পর এক পুড়িয়ে দিতে লাগলো সাঁওতাল পল্লী। তারপর ১৭ আগস্ট বিদ্রোহীদের আত্মসমর্পণ করতে বললো। স্বাধীনচেতা সাঁওতালরা সিদু-কানুর নেতৃত্বে সে ঘোষণাকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করলো।

 

অক্টোবর মাসের শেষের দিকে সিদু-কানুর নেতৃত্বাধীন সাঁওতালরা সংগ্রামপুরের কাছে এক পাহাড়ের গোড়ায় ঘাঁটি গাড়লো। অন্যদিকে ইংরেজরাও অস্ত্রে-শস্ত্রে সজ্জিত হয়ে এক বিশাল বাহিনী নিয়ে জমায়েত হলো। সমস্ত বনভূমি নাগাড়া আর মাদলের শব্দে কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগলো। যুদ্ধ শুরু হলো। ইংরেজরা কামান আর বন্দুক নিয়ে পাহাড়ের দিকে অগ্রসর হলো। তারপর আবারও ইংরেজদের প্রতারণা। বিদ্রোহীরা ১০০ গজের ভেতর আসামাত্রই তারা ফাঁকা গুলি করতে শুরু করলো।

 

গুলি গায়ে লাগছে না দেখে সহজ সরল সাঁওতালরা মনে করলো, তাদের দেবতা তাদের সঙ্গে আছেন। তিনিই গুলি ‘হাওয়া’ করে দিচ্ছেন। তারা দলে দলে পাহাড় থেকে নেমে এসে ইংরেজদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে শুরু করলো। এবার আর ফাঁকা গুলি না, সত্যিকারের গুলি ছুঁড়তে লাগলো ইংরেজরা। নির্বিচারে। সাঁওতালদের রক্তে সংগ্রামপুরের মাটি লাল হয়ে গেলো। গুলিবিদ্ধ হয়ে সিদু-কানু দুই ভাই-ই গুরুতর আহত হলো। তবু সাঁওতালরা আক্রমণ চালিয়ে যেতে লাগলো। একের পর এক ইংরেজ সৈন্য মারা পড়তে থাকলো। শেষ পর্যন্ত অবশ্য সাঁওতালরা পিছু হঠতে বাধ্য হলো।

 

তারপরও সাঁওতালরা সিদু-কানুর নেতৃত্বে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে লাগলো। এবার তারা কৌশল পরিবর্তন করলো। তারা এবার গেরিলা হামলা শুরু করলো। দিশেহারা হয়ে ইংরেজ সরকার ১০ নভেম্বর সামরিক শাসন জারি করলো। সেই সাথে আবার শুরু হলো সাঁওতালদের উপর অমানুষিক অত্যাচার। ধরপাকড় আর অগ্নিসংযোগ।

 

১৮৫৬ সালের ৩ জানুয়ারি সামরিক শাসন তুলে নেয়া হলো। আর ২৩ জানুয়ারি থেকে আবার শুরু হলো সাঁওতালদের গেরিলা আক্রমণ। ইংরেজ বাহিনি গেরিলা আক্রমণের চোটে অতিষ্ঠ হয়ে উঠলো। ২৭ জানুয়ারি লেফটেন্যান্ট ফেগানেরর বাহিনির সাথে ভাগলপুরে সাঁওতালদের মুখোমুখি যুদ্ধ হলো। যুদ্ধে মারা গেলো সিদু-কানুর দুই ভাই, দুই বীরযোদ্ধা সাঁওতাল- চাঁদ ও ভৈরব।

 

এসময় সিদু-কানুর খোঁজে ইংরেজ সৈন্যরা গ্রামে গ্রামে হানা দিতে শুরু করলো। সাঁওতালদের উপর চালাতে লাগলো অমানুষিক নির্যাতন। সে নির্যাতন সইতে না পেরে কয়েকজন সাঁওতাল সিদু-কানুর গোপন আস্তানার খবর ইংরেজ সৈন্যদের বলে দিলো।

 

ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে সিদুকে তার গোপন আস্তানা থেকে গ্রেফতার করে। অবশ্য গ্রেফতার করে নিয়ে যায় না তারা, সেখানেই গুলি করে মেরে ফেলে তাকে। পরের সপ্তাহে বীরভূমের জামতারা থেকে পুলিশ কানুকে গ্রেফতার করলো। পরে তাকে প্রকাশ্যে ফাঁসি দেয়া হয়।

 

এই দুই বীর নেতার মৃত্যুর পর সাঁওতালদের আর বিদ্রোহ চালিয়ে যাওয়ার মতো মনোবল থাকেনি। তাদের প্রিয় দুই নেতার মৃত্যুর পর, ভগ্ন হৃদয় সাঁওতালরা পরাজয় মেনে নেয়। স্বাধীনচেতা সাঁওতালরা বন্দীত্ব বরণ করে। সাঁওতালদের এই অসম সাহসী বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে প্রায় ২৫ হাজার সাঁওতাল মারা গিয়েছিলো।


লেখকঃ নাবীল অনুসূর্য, লেখাটি উনার ব্যক্তিগত ব্লগ থেকে নেওয়া।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here