সেদিন কলকাতায় কোন ‘সবুজ পাহাড়ের’ ছবি ছিল না

2
691

জানা কথাগুলোাই সেদিন তিনি বলেছিলেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে কথা বললে অবধারিতভাবেই যে বিষয়গুলোর কথা সকলে বলে তিনিও সেগুলোই বলেছিলেন। কাপ্তাই বাঁধ, পরোক্ষ সেনাশাসন, আঞ্চলিক দলগুলির বিভাজন, সাম্প্রদায়িক হামলা, সেটেলার বাঙালী দ্বারা আদিবাসী নারী ধর্ষণ ও অবৈধ ভূমি বেদখল প্রভৃতি। তবে তিনি এসবের কথা বলেছেন চিত্রকর্মের মাধ্যমে। সবুজ পাহাড়ের কাহিনী তিনি রং তুলি দিয়ে বর্ণনা করেছেন ক্যানভাসে। তবে সেখানে কোন সবুজ পাহাড়ের ছবি ছিল না।

গত ১৭ থেকে ১৯ জুলাই কলকাতার আইসিসিআর ভবনের অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর গ্যালারীতে হয়ে গেল চাকমা চিত্রশিল্পী জয়তু চাকমার প্রথম একক চিত্রপ্রদর্শনী যিনি সম্প্রতি রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘এমএফএ ইন পেইন্টিং’ নিয়ে পড়াশোনা শেষ করছেন। শিরোনাম ছিল ‘এল মোনো হদা’। যেটা বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘সবুজ পাহাড়ের কথা’। সেদিন প্রতিটি চিত্রকর্ম যেন এক একটি ঘটনা, এক একটি গল্প বলছিল দর্শনার্থীদের। তার মধ্যে থেকে মূল বিষয়কে ধরে কিছু চিত্রকর্মের উপর আমার এই লেখা।

Ehl mono hoda
এল মন হদা, আর্টিস্ট: জয়তু চাকমা

‘পরোক্ষ অভিবাসন’কে মূল বিষয় ধরে জয়তু চাকমা তার প্রদর্শনীর ছবিগুলো সাজিয়েছিলেন। তাই অবধারিতভাবেই এসেছে কাপ্তাই বাঁধ পরবর্তী উদ্বাস্তুদের কথা। তিনি বলছিলেন, পর্যটন কিংবা বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক হামলার কারণেও অনেকে জায়গা জমি হারিয়ে নিজের ভিটে মাটি ছেড়ে যেতে বাধ্য হন। আর অনেকের জায়গা জমি সেটেলার বাঙালিদের দ্বারা দখল হয়ে যাওয়ায় তারাও ‘পরোক্ষ অভিবাসনের’ শিকার হন। তিনি আরো বলছেন, বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমা জনগোষ্ঠীর লোকেরা বহু দশক ধরে বসবাস করে আসছে। কিন্তু তারা দেশটিতে সংখ্যালঘু হওয়ায় মৌলিক মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তারা পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে থেকে আসা বহিরাগতদের কাছে তাদের জায়গাজমি হারাচ্ছে। ফলস্বরুপ, তারা অস্তি¡স্ত সংকটের মূখে পাশের দেশসমূহে শরনার্থী হচ্ছে।

জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য রাঙামাটির কাপ্তাই এ বাঁধ দেয়া হয়েছিল ১৯৬০ এর দিকে। যার দরুন সেখানকার মোট আবাদী জমির প্রায় ৪০% পানির নিচে তলিয়ে যায় এবং উদ্বাস্তু হয় হাজার হাজার মানুষ। তলিয়ে যায় চাকমা রাজার রাজপ্রাসাদ। ভেঙে যায় হাজার হাজার স্বপ্ন। অনেকেই চলে যেতে বাধ্য হয় ভারতের মিজোরাম, ত্রিপুরা আর অরুণাচলে। সেটিই স্থান পেয়েছে কাপ্তাই সিরিজের দুটি চিত্রকর্মে। একটিতে দেখা যাচ্ছে কাচের পাত্রে ডুবন্ত পা। আরেকটাতে ছড়ানো ছিটানো জিনিসপত্র ও একটি মস্তকহীন মানবদেহ, দেখলে মনে হয় ফ্রেম থেকে ছিটকে পড়ছে। তিনি বলছিলেন, কাপ্তাই বাঁধ কৃত্রিম পাত্র হয়ে মানুষকে ডুবিয়ে রেখেছে এবং মানুষের জীবনকে ‘জীবন’ থেকে ছিটকে দিয়েছে।

Kolkata Exhibition 2
কাপ্তাই সিরিজের দুটি ছবির সাথে চিত্রশিল্পী জয়তু চাকমা

বর্ডার-১ চিত্রকর্মে দেখা যায়, একটি দাগকাটা সীমারেখার দুই পাশে দুইটি ক্ষতবিক্ষত ব্যান্ডেজ লাগানো মানবদেহ যাদের চোখেও ব্যান্ডেজ অথাৎ তারা একে অপরের দিকে ক্ষতবিক্ষত শরীর নিয়ে তাকিয়ে আছে কিন্তু দেখতে পাচ্ছে না। দুইজনের মধ্যে কে যে শরনার্থী তা অবশ্য বোঝা যাচ্ছিল না। আবার এমন ও হতে পারে তারা একে অপরের আত্বীয় বা জাতি ভাই যারা বর্তমানে সীমানার এপার ওপার থেকে ক্ষতবিক্ষত শরীর নিয়ে একে অপরকে দেখছে কিন্তু কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছে না। আরেকটা চিত্রকর্মে দেখা যায়, একই ধরনের একটি ক্ষতবিক্ষত মানবদেহ সীমানা পিলারে কপাল ঠেকিয়ে আছে।

Kolkata Exhibition 3
বর্ডার সিরিজের একটি ছবি

একটি জিনিস খেয়াল করেছিলাম, শিরোনামে পাহাড়ের কথা বলা হলেও প্রদর্শনীতে একটি ও সুন্দর, সবুজ পাহাড়ের ছবি ছিল না। যেটিকে তাকাই, চোখসহ পুরো শরীর ব্যান্ডেজ লাগানো ক্ষতবিক্ষত মানবদেহ। ব্যাপারটা জিজ্ঞেস করাতে তিনি বলছিলেন, এটাই পাহাড়। এরাই পাহাড়ের মানুষ। ক্ষতবিক্ষত। ব্যান্ডেজ লাগানো। তাই সেদিন সেখানে কোন ‘সবুজ পাহাড়ের’ ছবি ছিল না।

সাম্প্রদায়িক হামলা পার্বত্য চট্ট্রগামে একটি নিয়মিত ঘটনা যেটি ওখানকার বৈশিষ্ঠ্যে পরিণত হয়েছে। এ যাবত পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসীদের উপর অনেকগুলো সাম্প্রদায়িক হামলা ও বেশ কয়েকটি গণহত্যা সংঘঠিত হয়েছে। সর্বশেষ প্রায় ১ বছর আগে, লংগদুতে সেটেলার বাঙালিরা আদিবাসীদের ঘরবাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয় যেখানে অনেকগুলো বাড়ি আগুনে পুড়ে যায় এবং এক বৃদ্ধা আগুনে ভস্মীভূত হয়ে যায়। তিনি বলছিলেন, সেটিই স্থান পেয়েছে প্রদর্শনীতে ‘হোয়াট হ্যাপেন্ড দেয়ার’ বা ‘সেখানে কি ঘটেছিল’ শিরোনামে। যেখানে দেখা যাচ্ছে দূরে একটি পেট্রলবোমা। তার কিছু দূরেই ব্যান্ডেজ লাগানো ক্ষতবিক্ষত তিনটি মানবদেহ। যাদের একজন অসহায়ভাবে তাকিয়ে আছে পেট্রলবোমার দিকে। বাকি দুজনের একজন কানে হাত দিয়ে আর অপরজন মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে।

Kolkata Exhibition 4
শিরোনাম- “What happened there”

‘আনটাইটেলড’ শিরোনামের একটি ছবিতে দেখা যায়, একটি সিমপুক আর একটি মিলিটারি ট্যাংক মুখোমুখি দাঁড়ানো। তার উপরে একটি খেলনা পুতুল আর নিচে একটি হাত একটা খেলনা সৈনিককে তুলে নিচ্ছে। ব্যাপারটি কি জিজ্ঞেস করতেই তিনি বললেন, সিমপুক আর ট্যাংক দুটোও খেলনাই। বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করতেই বললেন, পাহাড়ে এখন সিমপুক পাওয়া যায় না, কিন্তু ট্যাংক পাওয়া যায়। তাই পাহাড়ে এখন সিমপুক এর বদলে বন্দুক ও ট্যাংক নিয়ে খেলা হয়। সিমপুক হচ্ছে এক ধরনের পোকা যেগুলো দিয়ে আমরা ছোটকালে পেয়ারা, সিনডিরে দিয়ে ধরি এবং খেলি। আমিও নিজেও খেলেছি। নিচের ছবিটা দেখলে আশা করি আপনাদের বুঝতে অসুবিধে হবে না।

Kolkata Exhibition 5
শিরোনাম – Untitled

সেদিন সেখানে আরো অনেকগুলো চিত্রকর্ম ছিল। যার কয়েকটির শিরোনাম, ‘দ্য মিরর’, ‘ডার্কনেস’, ‘সিটুয়েশন’, ‘হ্যোয়ার দ্য ওয়ে’, ‘উই ওয়ান্ট টু ফ্লাই’ ‘উই আর ডিভাইডিং’। যার প্রত্যেকটিই এক একটি ঘটনা বা এক একটি গল্প বলছিল। সিটুয়েশন সিরিজে দেখা যায়, একটি ক্ষতবিক্ষত ব্যান্ডেজ লাগানো মস্তক পা হীন মানবদেহ ভূপাতিত এবং আরেকটা ছবিতে দেখা যায়, চোখসহ পুরো শরীর ব্যান্ডেজ লাগানো সত্ত্বেও একটি মানবদেহ হাত দিয়ে কান চেপে আছে যেন কিছুই শুনতে চাই না। সিটুয়েশন থেকেই চাইলে আপনি ‘অবস্থা’ বুঝে নিতে পারেন। ‘উই ওয়ান্ট টু ফ্লাই’ শিরোনামের একটি ছবিতে দেখা যায়, ব্যান্ডেজ লাগানো ক্ষতবিক্ষত অনেকগুলো পা যেন বলছে উড়া তো দূরের কথা আমরা হাটতেই পারছি না। উই আর ডিভাইডিং শিরোনামের ছবিতে দেখা যায়, চার ভাগের একটি ফ্রেমে শরীর থেকে মাথার একটি ভাগ দূরে সরে যাচ্ছে। এটাকে দুই ভাবেই সংজ্ঞায়িত করা যায় জানিয়ে আমাকে তিনি বলছিলেন, এটা আঞ্চলিক দলগুলোর বিভাজন এবং বিভিন্ন কারণে শরনার্থী হওয়ার দরুণ চাকমা জাতির ছিটকে পড়া দুটোকেই নির্দেশ করে। দি মিরর ছবিতে দেখা যায়, একটি ক্ষতবিক্ষত ব্যান্ডেজ লাগানো নারীদেহের মূখে অনেকগুলো চোখ। ব্যাপারটা তিনিই খোলাসা করলেন, চোখগুলো মিররের মত তার মুখে দেখা যাচ্ছে, যে চোখগুলো আসলে সেই নারীদেহকে প্রতিনিয়ত দেখছে।

কথাগুলো পাকা পাকা শোনা যেতে পারে। কারণ যিনি চিত্রকর্মগুলো এঁকেছেন, আমার বয়স তার থেকেও কম। তবু ও আমি বলব, তরুণ চিত্রশিল্পী জয়তু চাকমার আঁকা চিত্রকর্মগুলো আমাকে বেশ আতংকিত করে তুলেছে। যিনি পাহাড়ের কথা বলতে গিয়ে শুধু ক্ষতবিক্ষত মানবদেহের ছবি একেঁছেন। ব্যাপারটা এমন না যে, তিনি পাহাড় আঁকতে পারেন না। কিন্তু তিনি সবুজ পাহাড়ের কথা বলতে গিয়ে একটি সবুজ পাহাড় ও আঁকেন নি। একজন তরুণের কেন মনে হবে পাহাড় মানেই ক্ষতবিক্ষত ব্যান্ডেজ লাগানো মানবদেহ। একজন তরুণ কেন পাহাড়ের কোন আশার কথা শোনান না? পাহাড় কি আসলেই ক্ষতবিক্ষত মানবদেহ? । তাঁর ভাবনাগুলো আমলে নেয়া জরুরী। কারণ, আমরা শান্তিপূর্ণ, সুখী, সুন্দর, সবুজ পাহাড় চাই।

সেদিন কলকাতায় জয়তু চাকমা সম্ভবত বোঝাতে চেয়েছিলেন, পাহাড়ে ‘পাহাড়’ নেই। কারণ পাহাড়ের কথা বলা হলেও তার প্রদর্শনীতে একটি ও পাহাড়ের চিত্রকর্ম ছিল না।

সেদিন ব্যাথা নিয়েই আমি ফিরেছিলাম। মনে হয়েছিল, আমার শরীরেও অসংখ্য ব্যান্ডেজ। কারণ আমিও পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি পাহাড়। একটি মানবদেহ। একজন চাকমা।


লেখকঃ এডিট দেওয়ান, ছাত্র, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা।
২৮ জুলাই ২০১৮

2 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here