রাখাইন বা মারমা জাতির সংক্ষিপ্ত ইতি কথা

0
974

রাখাইন বা মারমাদের ক্ষেত্রে যে প্রশ্নটি সর্বদাই লক্ষ্য করা যাই যে এরা জাতি হিসেবে এক নাকি অভিন্ন। রাখাইন, মগ, মারমা, আরাকানী এদের নামের ভিন্নতা থাকলেও আসলে এদের শিকর একই জায়গায় গাঁথা। অনেকের জন্য বিশ্বাস করতে কষ্ট হবে হয়ত কিন্তু  আশা করি লেখাটি শেষ পর্যন্ত পড়লে সব শঙ্কা দূর হবে।

আসলে কালের বিবর্তন, ভৌগলিক অবস্থান গত ভিন্নতা, এই ভূ-খন্ডে আগমনের সময় ভিন্নতা এই সম্প্রদায়ের লোকদের পরিচয় গত এই নাম গত ভিন্নতার কারণ। এই সম্প্রদায়ের কক্সবাজার, বরিশাল এবং পটুয়াখালীতে যারা থাকে তারা নিজেদের রাখাইন, পার্বত্য চট্টগ্রামে যারা থাকে তারা মারমা এবং ভারতে যারা থাকে তারা মগ নামে পরিচয় দিয়ে থাকে। পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন আদিবাসীদের কাছে এই সম্প্রদায় বিভিন্ন নামে পরিচিত। চাকমা ও তঞ্চগ্যা সম্প্রদায়ের কাছে মগ, ম্রোদের কাছে ম্রান, পাংখোয়াদের কাছে ম্রং, চাক্দের কাছে ম্রাইঙ, ত্রিপুরাদের কাছে মুখু, খুমিদের কাছে ত্রামো খিয়াংদের কাছে ওঅঃ নামে পরিচিত। জাতিগত পরিচয়গত এই সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে বোমাং রাজা মং শৈ প্রু ১৯৫১ সালে আদামশুমারির সময়ে তৎকালীন সরকারের কাছে এই সম্প্রদায়কে মারমা নামে উল্লেখ্য করার আবেদন করেন। এই নাম গ্রহণের আরেকটি কারণ হয়ত তারা সে সময়ে নিজেদের মগ নামে পরিচয় দিতে পছন্দ করতেন না।

অষ্টাদশ শতকে বর্মি এবং ইংরেজি দলিলপত্রসমুহে মারমা বাস্তুহারাদের উল্লেখ রয়েছে। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রাজার শাসন আমলে এই ভূ-খন্ডে এই সম্প্রদায়ের লোকদের আগমন ঘটেছে। ১৫০০ ও ১৭৮৪ সাল দুটি এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ।

১৫০০ সালে বার্মা ও আরাকানের মধ্যে এর ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে পেগুর (অনেকে একে পেগুর বদলে হংসবতি বলেও মনে করে থাকেন এ নিয়ে দি মত রয়েছে) রাজকুমার মঙ চ পিঁয়ো এবং রাজকুমারী সাইন্ড হ্না ঙ আরাকানরাজ দাংগা ওয়াদির সমীপে নীত হন। পরবর্তী সময়ে যুবরাজ মঙ চ পিয়ো আপন যোগ্যতায় আরাকানরাজ মিং খা মুং এর দৃষ্টি আকর্ষণে সমর্থ হন এবং আরাকানরাজ তাঁকে ১৬১৪ সালে চট্টগ্রামের প্রশাসন নিযুক্ত করেন। পরবর্তীতে আরাকানরাজ মঙ চ পিঁয়োকে বো মং উপাধিতে ভূষিত করেন। যুবরাজের বংশধরেরা কয়েক পুরুষ ধরে চট্টগ্রামে শাসন করে। দক্ষিণে মারমাদের দাবি তারা সেই রাজাদের বংশধর। ধারণা করা হয় এভাবেই মারমাদের এই ভূ-খন্ডে আগমন। কিন্তু দক্ষিণের মারমাদের এই দাবি সন্দেহমুক্ত নয়। কারন অনেকে মারমাদের তেলেঙ্গ রাজাদের বংশধর হিসেবেও মনে করে থাকেন। কিন্তু এই দাবির পক্ষে তেমন কোনো যুক্তি পাওয়া যায় না। বরং রাখাইনদের সাথেই তাদের বেশি মিল রয়েছে (যেমন –  ভাষাগত, খাদ্যভাস, সংস্কৃতি, পোশাক ইত্যাদি)। তেলেঙ্গ রাজার বংশধর দাবি করলেও তেলেঙ্গ ভাষা তাদের কাছে অপরিচিত। অন্যদিকে আরাকানী ভাষা অর্থাৎ রাখাইন সম্প্রদায় কর্তৃক ব্যবহৃত ভাষা মারমাদের ভাষা হিসেবে স্বীকৃত এবং এই ভাষার বর্ণমালাই মারমা বর্ণমালা হিসেবে পরিচিত।

বর্তমানে রাখাইন নামে পরিচিত এই সম্প্রাদায়ের আরেক অংশের এই ভূ-খন্ডে আগমন ঘটে অন্যভাবে। ১৭৮৪ সালে সামন্তবাদী বর্মীরাজ মংওয়েন বাহিনীর হাতে রাখাইন সাম্রাজ্যের স্বাধীনতার শেষ সূর্য তিরোহিত হয়। খ্রিস্টপূর্ব ৩৩২৫ সাল হতে ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দ সাল পর্যন্ত বিসতৃত এক গৌরবময় ইতিহাসের সমাপ্তি ঘটে। এই যুদ্ধের লক্ষ্য শুধু রাখাইনদের হারানোই ছিল না বরং লক্ষ ছিল এই জাতিকে পৃথিবীর ইতিহাস থেকে বিলুপ্ত করা এবং সকল অস্তিত্ব নির্মূল করা। এই সময় বর্মি আক্রমণকারীদের দ্বারা আরাকান থেকে এই সম্প্রদায়ের অনেক লোকজন বিতারিত হয়ে মাতামুহুরি উপত্যকায় মধ্যে দিয়ে উদ্বাস্তু হিসেবে কক্সবাজার, টেকনাফ, উখিয়া এবং অন্যান্য স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে। আবার অনেকেই পটুয়াখালী বা বরিশালের দিকে চলে যায়।

এমন নয় যে এই ঘটনা গুলোর আগে এই ভূ-খন্ডে এই সম্প্রদায়ের লোকেরা বসবাস করত না। খ্রিস্টপূর্ব ৫৮০ সালে রাখাইন রাজা চেন্দাসুরিয়া আরাকান অঞ্চলে বৌদ্ধধর্ম প্রচারে ব্যাপকভাবে সহায়তা করেন। সেই সময়ে বহু আরাকানী রামু অঞ্চলে ধর্ম প্রচারের নিমিত্তে আগমন করেছিল বলে ধারণা করা হয়। এই কিংবদন্তি মেনে নেয়া হলে সেই সময়কেই রাখাইনদের এই ভূ-খন্ডে আগমনের সময় হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। এছাড়াও আমরা জানি যে চট্টগ্রাম ফেনী সহ এদেশের কয়েকটি অঞ্চল প্রাচীন আরাকান রাজ্যের অন্তরভুক্ত ছিল।


 লেখক: জোয়াং রাখাইন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


তথ্যসূত্র:
লুন্ঠিত সভ্যতা – ক্য থিং অং
বাংলাদেশের রাখাইন জনগোষ্ঠী – সাইফুল আহসান বুলবুল

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here