বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ এখন তেল নয় বরং তথ্য

0
54

বর্তমানের এই ক্রমবর্ধমান ইন্ডাস্ট্রিয়াল যুগে একটি নতুন ধরণের পণ্য ক্রমশই বিশ্বের অর্থনীতির প্রায় পুরোটাই দখল করে নিচ্ছে, যার স্রোত সামলাতে ব্যবসায়িক আইনপ্রণয়নকারীদের এখন প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হচ্ছে।

এক যুগ আগেও পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ এর প্রশ্ন আসলে যে সম্পদটির কথা সবার আগে আসতো সেটি ছিল তেল। কিন্তু এখন বর্তমানে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদের প্রশ্ন আসলে তার উত্তর আর তেল নয়, বরং তথ্য বা ডাটা (Data) যাকে আদর করে এখন ডাকা হয় ডিজিটাল যুগের তেল।

এই ডাটা ইকোনমির (Data Economy) পুরোটাই প্রযুক্তির অদম্য যেসব দানবদের হাতে তারা হচ্ছে – Alphabet (গুগলের প্যারেন্ট কোম্পানী), Amazon, Apple, Facebook এবং Microsoft। বর্তমানে তারা পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান পাঁচটি ফার্ম হিসেবে স্বীকৃত। সময়ের সাথে সাথে তাদের ব্যবসায়ীক মুনাফা ক্রমশ বেড়েই চলেছে, শুধুমাত্র ২০১৭ সালের শুরুর দিকেই তাদের থলেতে জমা হয়েছে প্রায় ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। যুক্তরাষ্ট্রে অনলাইনে বছরে যেই পরিমাণ ডলার খরচ করা হয় তার অর্ধেকই চলে যায় Amazon এর পকেটে। বিগত বছরে যুক্টরাষ্ট্রে ডিজিটাল বিজ্ঞাপন থেকে যে বার্ষিক আয় হয়েছিলো তার প্রায় পুরোটাই গুগল এবং ফেসবুকের দখলে ছিলো।

বিশ্বের অর্থনীতিতে যেখানে তাদের এতো প্রভাব সেখানে এটা আশংকা করাই যায় এই প্রভাবশালীতা এইসব প্রযুক্তির ধনকুবেরদের মধ্যেকার আন্ত সম্পর্কে ভাঙন ঘটানোর জন্যে হুমকিস্বরূপ হয়ে দাঁড়াবে, যেমনটা কিনা বিশ শতকে ‘স্টার্ন্ডাড অয়েল’ এর সাথে হয়েছিলো। এই পত্রিকাটি (দ্যা ইকোনমিস্ট) এর আগেও এই ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে। এই বিশ্বের অর্থনীতিতে সফল হয়ে দেখানোটা কোনো অপরাধ নয়। এই প্রযুক্তি-দানবদের উদ্ভাবনীয় সব টেকনোলজির কারনে তাদের গ্রাহকেরা প্রতিনিয়ত অনেক উপকৃত হচ্ছে। এখন খুব কম সংখ্যক লোকই তাদের নিত্যনিয়মিত জীবনে গুগলের সার্চ ইঞ্জিন, আমাজনের ওয়ান ডে ডেলিভারি কিংবা ফেসবুকের নিউজফিড ছাড়া থাকতে পারবে।

এইসব ফার্মদের কোনোটি এখন পর্যন্ত ‘স্টান্ডার্ড এন্টিট্রাস্ট’ (Standard Antitrust) এর কোনো নিয়ম ভঙ্গ করেনি। তাদের গ্রাহকদের ঠকানো তো দূরের কথা, এইসব ফার্মদের বেশিরভাগ সার্ভিস তাদের গ্রাহকেরা বিনা মূল্য উপভোগ করতে পারে। এইসব ফার্মদের কিছু অফলাইনের প্রতিযোগী ছাড়া তাদের নিজস্ব মার্কেট শেয়ারের ক্ষতি হবার তেমন কোন কারণ নেই। এমনকি Snapchat এর মতোন নতুন প্রযুক্তি কোম্পানির সফলতা প্রমাণ করে দিয়েছে এই ইন্ডাস্ট্রিতে এখনো প্রতিনিয়ত নতুন প্রযুক্তিগত কোম্পানিরা তাদের নিত্যনতুন উদ্ভাবনীয় সব আইডিয়া দিয়ে সবার মাঝে নতুন করে আলোড়ন তুলতে সক্ষম। কিন্তু তবুও কিছু চিন্তার কারণ থেকে গিয়েছে। ইন্টারনেট কোম্পানীগুলোর ডাটা কন্ট্রোল তাদেরকে অসীম সব ক্ষমতার অধিকারী করে দিয়েছে। তাই সেই পুরনো তেল এর যুগে প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানীগুলোর মাঝে যেইধরনের প্রতিযোগীতা হতো বর্তমানের এই “ডাটা ইকোনমি” যুগে সেসব সম্ভব নয়। সেইজন্য দরকার নতুন পদক্ষেপ।

আসলে কি পরিবর্তন হয়েছে? স্মার্ট ফোন এবং ইন্টারনেট ডাটাকে করে তুলেছে আরো বেশি সহজলভ্য, সর্বব্যাপী এবং সেই সাথে করে তুলেছে আরো বেশি মূল্যবান। প্রতিদিনকার জগিং হতে শুরু করে টিভি দেখা কিংবা শুধুমাত্র ট্রাফিকজ্যাম এ বসে থাকা, ভার্চুয়ালি আমাদের সব কাজকর্ম একটি ডিজিটাল পদচিহ্ন বা ট্রেস রেখে যাচ্ছে – প্রযুক্তির গুদামে যুক্ত হচ্ছে আরও নতুন তথ্য।
হাতের মোবাইল থেকে শুরু করে হাত ঘড়ি কিংবা গাড়ি সবকিছুই এখন ইন্টারনেটের সাথে সংযুক্ত ফলে তথ্যের পরিমাণ বাড়ছে, কেউ কেউ ধারণা করে সেল্ফ ড্রাইভিং গাড়ি (স্বয়ংক্রিয় গাড়ি) প্রতিসেকেন্ডে ১০০ গিগাবাইট পরিমাণ তথ্য উৎপন্ন করতে সক্ষম।
অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাগত কৌশল যেমন মেশিন লার্নিং (Machine Learning) বিভিন্ন ডাটা অ্যানালাইসিস করে আরো বেশি পরিমাণে মূল্যবান তথ্য বের করতে পারছে। অ্যালগোরিদম (Algorithm) এর সাহায্যে এখন সহজেই ভবিষ্যদ্বাণী করা যায় যে গ্রাহক কখন পণ্যটি কেনার জন্যে প্রস্তুত, কখন জেট ইঞ্জিনটির সার্ভিসিং এর প্রয়োজন হবে কিংবা কোন একজন লোকের কোন এক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কতোটুকু। GE কিংবা Siemens এর মতোন ইন্ড্রাস্টিয়াল ধনকুবেররা নিজেদেরকে এখন ডাটা ফার্ম হিসেবে পরিচয় দেয়।

এতো বিপুল পরিমাণের তথ্যের সমারোহ পুরো প্রতিযোগীতার ধরণকেই পাল্টে দিয়েছে। প্রযুক্তির এই দানবেরা মানুষের মধ্যেকার নেটওয়ার্কের প্রভাবকে সবসময় কাজে লাগিয়েছে: ফেসবুকে নিবন্ধনকারীর সংখ্যা যত বাড়বে, তা দেখে বাকিরাও ততটা বেশি ফেসবুকে নিবন্ধন করতে আকৃষ্ট হবে। যেখানে তথ্য থাকবে সেইখানেই নেটওয়ার্ক এর প্রভাব বেশি কাজ করবে। বেশি পরিমাণের তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে একটি ফার্ম অধিক সংখ্যক গ্রাহককে আকর্ষণ করতে সক্ষম হবে এবং যখন গ্রাহকের সংখ্যা বেড়ে যায় তাদের থেকেও আরো অধিক তথ্য জমা হতে থাকবে।

টেসলা (Tesla) তার স্বয়ংক্রিয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গাড়ি থেকে যত বেশি তথ্য সংগ্রহ করতে পারবে ততো বেশি নিখুঁতভাবে এর স্বয়ংক্রিয় গাড়ির ড্রাইভিং সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। এইটি সেই ফার্ম যেটি কিনা শুরুতে শুধুমাত্র ২৫,০০০ টি গাড়ি বেচতে সক্ষম হয়েছিল অথচ সেই ফার্মের বর্তমান মূল্য কিনা আজ জেনারেল মোটরস (GM) এর চেয়েও বেশি, টেসলা বিক্রি করেছে প্রায় ২০.৩ লাখের উর্ধ্বে। বিশাল পরিমাণ ডাটা তাই কোম্পানিগুলোর দুর্গপরিখা হিসেবেও কাজ করে। একদিকে এই বিপুল সংখ্যক তথ্য বা ডাটা কোম্পানীগুলোকে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের হাত থেকে সুরক্ষা করে।

এইসব প্রযুক্তির দানবরা সার্বক্ষণিক পুরো ইকোনমি সিস্টেমের দিকে নজরদারি রাখে। গুগল দেখতে পায় মানুষেরা কি সার্চ দিচ্ছে, ফেসবুক জানে সবাই কি শেয়ার দিচ্ছে, আমাজন জানে কে কি কিনছে। এপস স্টোর এবং অপারেটিং সিস্টেম গুলোর উপরেও তাদের মালিকানা আছে, কম্পিউটিং পাওয়ার থেকে স্টার্ট-আপ পর্যন্ত তারা ভাড়া দেয়। “ঈশ্বরের চোখের দৃষ্টির” মতোন তাদের নিজেদের মার্কেটের ভিতরে এবং বাইরের সবকিছুর উপরে তাদের নজরদারি আছে। তারা জানে কখন একটি নতুন পণ্য সফল হচ্ছে এবং কখন হুমকি হয়ে দাঁড়ানোর আগে সেটিকে কপি কিংবা স্রেফ কিনে নিতে হবে।

ফেসবুক যখন ‘WhatsApp -একটি মেসেজিং অ্যাপ’ যার কর্মী সংখ্যা মাত্র ৬০ জন, ২২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিময়ে কিনে নিয়েছিলো তখন অনেকে ধারণা করেছে এটি আসলে ফেসবুক তার প্রতিদ্বন্দ্বীকে নিজের রাস্তা থেকে সরিয়ে ফেলার একটা উপায় মাত্র। নতুন প্রতিদ্বন্দ্বীকে মার্কেটে ঢুকতে বাঁধা দিয়ে এবং আগাম সতর্ক ব্যবস্থা দিয়ে ডাটা কম্পিটিশনকে আনায়াসে এভাবে রোধ করা যায়।

ডাটার যে ধরণ সেটি ন্যায্য কর্পোরেট ব্যবসায়িক আইনী প্রতিকার বা ‘অ্যান্টিট্রাস্ট রেমেডিকে’ খুব একটা কার্যকর করে না।গুগলকে যদি পাঁচটি ভাগেও ভাগ করা হয় তবুও তাদের নেটওয়ার্ক এর খুব একটা ক্ষতি হবে না, কোন না কোন একদিন তাদের যেকোনো কেউ আবার ক্ষমতায় আসবে। তাই নতুনভাবে যুগান্তকারী চিন্তা করার সময় এসেছে এবং শেষপর্যন্ত দুটি সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায়।

প্রথমটি হচ্ছে ন্যায্য কর্পোরেট ব্যবসায়িক আইন নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষকে ২১ শতাব্দীর পুরনো ইন্ড্রাস্টিয়াল যুগের আইনি চিন্তা থেকে সরে আসতে হবে। ডাটা ফার্মদের জন্য তাদেরকে নতুন ধরনের আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। উদাহরণ স্বরূপ যখন কোন বড় কোম্পানি একটি ছোট কোম্পানিকে কিনে তার সাথে সম্মিলন ঘটায়, সেখানে কেনা কোম্পানিটির সাইজ বড় হলেই শুধুমাত্র সেখানে হস্তক্ষেপ করার সিদ্ধান্ত নেওয়াটা যথার্থ নয়। কোন মুনাফা ছাড়াই Whatsapp এর পিছনে ফেসবুকের এতো অর্থ ব্যয় তখন অনেক প্রশ্নের সৃষ্টি করেছিলো।

এছাড়াও আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষকে মার্কেট অ্যানালাইসিস করার সময় আরও কান্ডজ্ঞানের পরিচয় দেওয়া উচিত। উদাহরণ স্বরুপ সিম্যুলেশন ব্যবহারের মাধ্যমে অধিক ক্রয়মূল্য নির্ধারণকারী অ্যালগরিদমকে সন্ধান করে বন্ধ করে দেওয়া কিংবা সঠিক মার্কেট কম্পিটিশনকে কিভাবে প্রমোট করা যায় তা নিশ্চিত করা উচিত।

দ্বিতীয়ত, তারা এমন কোনো নিয়ম প্রণয়ন করতে পারে যার মাধ্যমে অনলাইন সার্ভিস প্রোভাইডারদের ডাটার উপর নিয়ন্ত্রণকে কমানো যাবে এবং যারা ডাটা সাপ্লাই করে তথা গ্রাহকরা তাদের দেওয়া ডাটার উপর অধিক নিয়ন্ত্রণ পায়। অধিক স্বচ্ছতার জন্য কোম্পানীগুলোকে বাধ্য করা যেতে পারে যেন তারা নিজেদের মধ্যে কি তথ্য জমা আছে এবং এর জন্য তারা কতো টাকা আয় করে সেটি তাদের গ্রাহকদেরকে জানায়। সরকার চাইলেই এমন পদক্ষেপ নিতে পারে যাতে করে জনসাধারণের জন্যে এমন একটি সার্ভিস আনা যায় যার মাধ্যমে জনসাধারণের নিজস্ব ডাটা ভোল্ট থাকবে কিংবা তারা ডাটা ইকোনোমির কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ ম্যানেজ করতে পারবে।

ভারত ইতিমধ্যে “Aadhaar” নামক ডিজিটাল আইডেন্টিটি সিস্টেম এর মাধ্যমে তাদের পদক্ষেপ নিয়েছে। এছাড়াও তারা গ্রাহকের অনুমতিতে কিছু বিশেষ ধরনের তথ্য শেয়ারের উপর আইন করতে পারে। যে পদক্ষেপ- ইউরোপ তার বিভিন্ন ফিনান্সিয়াল সার্ভিসে নিচ্ছে, সেখানকার ব্যাংক তাদের কাস্টমারদের ডাটাকে থার্ড পার্টির কাছে কিছু ক্ষেত্রে এক্সেস করার অনুমোদন দিচ্ছে।

এই তথ্য প্রযুক্তির যুগে ন্যায্য কর্পোরেট ব্যবসায়িক আইন নতুন করে তৈরী করাটা সহজ নয়। এর মাধ্যমে অনেক নতুন ধরনে সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। যেমন অধিক ডাটা শেয়ার কারোর ব্যক্তিগত নিরাপত্তার হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু যদি সরকার পুরো ডাটা ইকোনমি শুধুমাত্র কিছু ‘প্রযুক্তির দানব’ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হোক সেটি না চায় তাহলে সরকারকে তার দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।


অনুবাদঃ টরা তঞ্চংগ্যা, শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগ।

তথ্যসূত্রঃ দ্যা ইকোনমিস্ট থেকে অনুবাদকৃত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here