বকুমের দিনরাত্রি

0
28

“বকুম” নামটা আমাদের তল্লাটে খুব একটা পরিচিত নয়। আমার বন্ধু-আত্মীয় মহলের প্রায় সবাই বকুম নাম শুনলে একটু অবাক হয়ে তাকায়। আমি নিজেও এই শহরের নাম প্রথম শুনি ২০১৪ সালের শেষের দিকে। মানবাধিকার সংক্রান্ত একটা কর্মশালায় যোগ দিতে প্রথমবারের মত ইউরোপ এসে এক ঝটকায় জার্মানির পশ্চিম কোণের ৪ টা শহরে বেড়াতে নিয়ে গিয়েছিল বন্ধু পবিত্র এবং মিল্টন। মাত্র এক দিনের এই ঝটিকা ভ্রমণের সময় তাদের কাছ থেকে শুনেছিলাম বকুম শহরে হরি পূর্ণ দাদা পিএইচডি করছেন। ইচ্ছা করছিল তাঁর সাথে দেখা করার। ইচ্ছা ছিল বকুম ঘুরে যাওয়ার। কিন্তু সম্ভব হয়নি। এবার দুটাই হল। নতুন করে ছাত্রত্ব বরণ করার সুবাদে।

আমি বকুমকে পরিচিত করিয়ে দেয়ার জন্য আশ্রয় নেই আশেপাশের বড় শহরগুলোর। যেমন বন। অনেকে বন শহরটা জার্মানির পূর্ব-পশ্চিম কোথায় অবস্থিত না জানলেও বিভিন্ন কারণে চেনেন। এই পরিচিতির পেছনে সবচেয়ে দায়ী সম্ভবত সেই বিখ্যাত কৌতুক। পত্রিকার খবরে শিরোনাম প্রকাশ “প্রধানমন্ত্রী বন থেকে হেগে এলেন”। অগণিত পত্রিকা পাঠক শিরোনামে বিভ্রান্ত হলেন। পত্রিকার কাটতি বাড়ল। প্রধানমন্ত্রী কি সত্যিই বনে সেই প্রাকৃতিক কাজটি সেরে এসেছেন? তবে সেই বিভ্রান্তি সহসাই কেটে গেল বিস্তারিত বিবরণে। না, আমাদের “সভ্য” সমাজের প্রধানমন্ত্রী সেই “অসভ্য” কাজখানা করেননি। প্রধানমন্ত্রী তাঁর বিদেশ সফরকালে জার্মানির বন শহর থেকে নেদারল্যান্ডস (বা হল্যান্ড)-এর হেগ শহরে এসেছেন। তবে এই কৌতুক বাদ দিলে বন শহরটিকে চেনার অন্য একটি প্রধান কারণ আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির পর থেকে আমেরিকা-সোভিয়েত ইউনিয়নের স্নায়ুযুদ্ধের সমাপ্তি পর্যন্ত এই শহরটি পশ্চিম জার্মানির অন্তর্বর্তীকালীন রাজধানী হিসেবে কাজ করত। তবে পূর্ব-পশ্চিম জার্মানিকে ভাগ করা বার্লিন প্রাচীরের পতনের মধ্য দিয়ে বার্লিন তাঁর রাজধানীর মর্যাদা কেড়ে নিলেও বনকে এখনো দ্বিতীয় রাজধানী হিসেবেই গণ্য করা হয়। যদিও অফিশিয়ালি সেই স্বীকৃতি নেই। কিন্তু বকুমের অফিশিয়াল-আন-অফিশিয়াল সেরকম কোনো ধরনেরই স্বীকৃতি নেই। তাই তার সেই পরিচিতিও নেই।

এখানে আশার কয়েক সপ্তাহ কেটে গেলেও বকুম সম্পর্কে বলতে গেলে তেমন কিছু জানি না। এখানে আসার পর হঠাত পরিবেশ-আবহাওয়া নিয়ে খাপ খাওয়ানো, ভাষা শিক্ষা, আমার ফেলে আসা প্রতিষ্ঠানের কিছু বাকি থাকা কাজ আর নানা বিষয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লে কিছু সাধারণ জিনিস ছাড়া এই শহর বলতে গেলে এখনো আমার অচেনা। তাই এই শহরের তথ্য দেয়া আমার পক্ষে অসম্ভব না হলেও তার সত্যতা যাচাই করা আমার সম্ভব নয়। এটুকু জানি যে বকুম জার্মানির পশ্চিমের এক কোনায় মাঝারি গোছের ছিমছাম এক শহর। অনেকের কাছে ইউরোপের বহু মনোরম, জমকালো এবং বিখ্যাত শহরের তুলনায় তাঁকে মলিন এবং তুচ্ছ মনে হবে হয়ত। তবু যত মলিন, তুচ্ছ কিংবা ক্ষুদ্র হোক না কেন, এটা আপাতত আমার শহর। আমাদের শহর।

বকুমে পদার্পণের আগে অনেক ঝক্কি-ঝামেলার কারণে বহু বন্ধু-আত্মীয়-শুভানুধ্যায়ীদের সাথে যোগাযোগ কিংবা দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি। বাসা ছাড়া, অফিসের দায়িত্ব সম্পাদন, জিনিসপত্র বাড়িতে পৌঁছানো, প্রয়োজনীয় শপিং করা, অসমাপ্ত ঋণের দায়, আর্থিক টানাপোড়েন ইত্যাদি নিয়ে দেশ ছাড়ার আগ দিন পর্যন্ত টানাটানি চলেছে। এসব কিছুর উপরে মরার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে ছিল রেসির ভিসা সময়মত হাতে না পাওয়া। অবশেষে তার ভিসা পেলাম যাত্রার মাত্র দু তিন দিন আগে। আর ভিসা নিয়ে টানাটানির কারনে টিকেট হাতে এসেছে যেদিন ভ্রমণ তার মাত্র এক দিন আগে। তাই আমাদের লাগেজ গোছানো চলেছে মধ্যরাত পর্যন্ত।
বকুমের উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়লাম মার্চের ২ তারিখ খুব ভোরে। টিসেল আর হেলি এয়ারপোর্টে বিদায় দিতে আসল। আমাদের টার্কিশ এয়ারলাইন্সের বিমান দেশের মাটি ছেড়ে আকাশে উড়াল দেয়ার আগ পর্যন্ত আমরা আমাদের পরিবারের মানুষদের সাথে ফোনে কথা বলার চেষ্টা করলাম। বিশেষ করে রেসির পরিবারের মানুষদের সাথে। এর আগে দেশের বাইরে থাকার কারণে আমার পরিবার যতটা না তার চাইতে রেসির পরিবার অনেক বেশি একই সাথে এক্সসাইটেড এবং উদ্বিগ্ন। তাঁরা সারা রাত ঘুমাতে পারেনি। আবার মৃদু কান্নাকাটিও করলেন। এদিকে মা কিছুটা অভ্যস্ত হলেও তাঁর অবস্থাও প্রায় একই। বিমান আকাশে ওড়া শুরু করলে রেসি উঠে অনেকক্ষণ চুপচাপ থাকল। মন খারাপ। আর নিজের পরিবার-আত্মীয়-বন্ধু-সহকর্মী-প্রিয় মানুষদের ছেড়ে আসাতে আমার মনও কিছুটা ভারী।

 

Snowfall in Bochum Germany, by Bablu Chakma
জার্মানির বকুমের তুষারপাত, ছবি: বাবলু চাকমা

পরে এই ভাব যখন কিছুটা কেটে গেল তখন আমরা আমাদের অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা শুরু করে দিলাম। দু একটা মুভি দেখার চেষ্টা করলাম। প্লেনে দেয়া খাবার-পানীয় নিয়ে একটু গল্প করলাম। কিছু পরে পাশে বসা এক বিদেশী ভদ্রলোক হঠাত রেসির সাথে কথা বলা শুরু করলো। তাঁরা দু-এক মিনিট কথা বলার পর আমি যোগ দিলাম। ভদ্রলোক রুশ। পেট্রোবাংলার কোনও এক প্রজেক্টে কাজ করেন প্রায় বছরখানেক ধরে। কী নিয়ে জিজ্ঞেস করলে বললেন মানা আছে, গোপনীয়। পৃথিবীর কত লোক যে কত ধরণের ধান্দায় ঘোরে ঠিক নেই। শেখার প্রয়োজনে হোক বা ক্যারিয়ারের প্রয়োজনে আমরা যাই পশ্চিমে আর তিনি এসেছেন পূর্বে! তিনি এক পর্যায়ে জিজ্ঞেস করলেন আমরা কোন দেশ থেকে। বললাম বাংলাদেশ। তাঁর বিশ্বাস হয় না। বলি বাংলাদেশে বাঙ্গালী ছাড়াও আরো বহু জাতির মানুষ থাকে। তাঁকে দোষ দিই না। বাংলাদেশের কত মানুষই তো এখনো হয় জানে না নতুবা মানে না যে বাংলাদেশ বহু জাতির, বহু ধর্মের, বহু সংস্কৃতির এক দেশ এবং সেখানে সবার অধিকার ও মর্যাদা সমান হওয়া উচিৎ। তাঁকে ভালো করে বোঝানোর জন্য আমি আমার একটা ছোট্ট লেখা পড়ার জন্য বললাম। তিনি পড়ে বললেন, তোমার লেখায় তো খালি অভিযোগ রয়েছে, রাষ্ট্রের প্রতি। আমি বললাম, এগুলো অভিযোগ নয়, বাংলাদেশের আদিবাসীদের বাস্তবতা। আমাদের বাস্তবতা।

তো সাত সমুদ্দুর তের নদী পেড়িয়ে যখন ডুসেলডরফ এয়ারপোর্টে নামলাম তখন সূর্য্যি মামা পটে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্লেন থেকে নামার আগে গরম কাপড়ের প্রস্তুতি নিয়ে নিলাম। পাশে শুনলাম একজন ভদ্রলোক আরেকজন ভদ্রমহিলাকে বলছেন, “জানো এখন কিন্তু বাইরে ঠাণ্ডা, তাপমাত্রা মাইনাস ২ ডিগ্রী”। ভদ্রমহিলা বললেন, ”মাইনাস ২ ইজ নাথিং”। ভদ্রমহিলার কথা বলার ঢং আর চেহারা দেখে সন্দেহ করলাম তিনি সম্ভবত রুশীয়। যাই হোক, “মাইনাস ২” তাঁর কাছে কিছু না হতে পারে, আমাদের কাছে অনেক বড় কিছু। সেটা তাপমাত্রা বলুন আর রাজনৈতিক অঙ্গনের কোন বিষয় বলুন।

ক্যারল নামে এক ভদ্রলোক আমাদের এয়ারপোর্ট থেকে নিতে আসার কথা। কিন্তু তাঁর সাথে আমাদের কিভাবে যোগাযোগ হবে কিংবা ভদ্রলোক আমাদের দেখে কিভাবে চিনবে সেটা নিয়ে সামান্য চিন্তা হচ্ছিল। কারণ তাঁর ফোন নাম্বার আমাদের কাছে নেই। আমার বাংলাদেশি ফোন নাম্বার তাঁর কাছে থাকলেও সেটা এখানে অচল। তো ভাবনা-চিন্তা করে আমার ফোন চালু করলাম আর এয়ারপোর্টের ফ্রি ওয়াইফাই খুঁজতে শুরু করলাম। পরক্ষণেই দেখি তাঁর মেসেজ, আই-মেসেজ এর কল্যাণে আমার কাছে তাঁর বার্তা চলে এসেছে। মেসেজে জানান দিলাম যে আমরা এসে পড়েছি। আমরা লাগেজ নিয়ে বহির্গমন ফটকের দিকে যেতেই লম্বা চওড়া মধ্যবসষ্ক এক ভদ্রলোক আমাদের দিকে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন আমরাই তাঁরা কিনা যাদের জন্য তিনি অপেক্ষা করছেন। তো তিনি আমাদের লাগেজের ট্রলি নিয়ে তাঁর কার অব্দি নিয়ে গেলেন। তাঁর আচরণ আগে শোনা জার্মানদের ভাবগম্ভীর প্রকৃতির খ্যাতির সাথে তেমন মিল পাওয়া গেল না। ভদ্রলোক অত্যন্ত মিশুক প্রকৃতির এবং সহযোগিতার মনোভাবসম্পন্ন। গাড়িতে তাঁর সাথে অনেক কথা হল। কথা হল আমার এবং তাঁর দেশের মানুষদের অনেক বিষয় নিয়ে। কথা হল ফুটবলপ্রীতি নিয়ে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন এবার বিশ্বকাপে কাকে সমর্থন দেব। বললাম আগে তো আর্জেন্টিনা বা অন্য কোন টিমকে করতাম, এবার মনে হয় জার্মানিকেই করবো।

প্রায় আধা ঘন্টা পর আমরা আমাদের গন্তব্য বকুম পৌঁছলাম। আমাদের জন্য হরি পূর্ণ দাদা বাসার সামনে অপেক্ষা করে ছিলেন। আমাদের গাড়ি থেকে লাগেজ নামানো শেষ হতেই আমাদের আবাসস্থলের ম্যানেজার স্ট্যাকেলিস চলে আসলেন। তিনি আমাদের বাসার চাবি গছিয়ে দিলেন। সাথে এই ফারনিশড বাসাটির কয়টা চামচ, কয়টা বাটি, কয়টা ছুরি, কয়টা প্যান আছে ইত্যাদি সব লিখে নিলেন। সেগুলো বাসা ছেড়ে দেবার সময় গুনে গুনে ফেরত দিতে হবে। আর পানি, বিদ্যুৎ কিভাবে খরচ করতে হবে তারও একটা ইন্সট্রাকশন দিয়ে গেলেন। বললেন, আমরা আমরা জার্মানরা চেষ্টা করি মিতব্যয়ী করে পানি-বিদ্যুৎ ব্যবহার করার। কিন্তু এদিকে আমরা বিদ্যুৎ-বৃষ্টি-বন্যার দেশের মানুষ, সময়ই বলে দেবে তাঁদের এই নিয়ম আমরা কতটুকু এই নিয়ম মেনে চলতে পারব।

Snow in Bochum Germany, by Bablu Chakma
বকুমের তুষারপাতে আমার পদচিহ্ন, ছবি: বাবলু চাকমা

হরি দা কাছের এক সুপারমার্কেট ঘুরিয়ে নিয়ে আসলেন। কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস, বিশেষত কিছু খাবার-দাবার আর বাসার জিনিস কেনাকাটা করলাম। রাতে হরি দা আর রেখা বৌদির বাসায় খাবারের মহা আয়োজন। মং দাও আসলেন। মাছ তরকারি, মুরগীর গুদাইয়া, ব্রকলি সেদ্ধ, মরিচ ভর্তা ইত্যাদি দিয়ে পেট পুজো করলাম। দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি আর প্রবাসেও নিজেদের খাবারের সুস্বাদ নিয়ে পেট পুজো শেষে বাসায় ফিরে দ্রুতই গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়লাম।

পরদিন ঘুম থেকে উঠে জানালার পর্দা সরাতেই আমি হতবাক। দ্রুত রেসিকে ঘুম থেকে জাগালাম। সে উঠতেই তাকে পর্দা সরিয়ে দেখালাম। রাতে তুষার পড়েছে। দুজন চট করে গরম কাপড়-চোপড় পরে বাসা থেকে বের হলাম। চারপাশ ধবধবে সাদা। পত্র-পল্লবহীন বৃক্ষরাজি তুষারের ভারে কিছুটা নুয়ে পড়েছে। সবুজ ঘাসের লন ঢেকে গিয়েছে শুভ্রতার চাদরে। সারা পৃথিবী যেন নীরব-নিশ্চল ফ্রেমে বন্দী সাদাকালো এক ছবি। এই দৃশ্য আমাদের কাছে স্বপ্ন আর কল্পনার মাঝামাঝি। আমার মনে পড়ে গেল ছোট্ট বেলায় পড়া সোভিয়েত ইউনিয়নের রূপকথাগুলোর কথা আর রুশ বিপ্লবকে ঘিরে পড়া গল্প-উপন্যাসের কথা, যেখানে প্রায়শই শীতল, শুভ্র তুষারের এক পৃথিবীর বর্ণনা থাকত। এর আগে একবার তুষার দেখেছিলাম, কিন্ত তা ছিল কেমন জানি বৃষ্টি আর তুষারের মাঝামাঝি। তাই তুষার দেখার সাধ মেটেনি। রেসিরও দীর্ঘদিনের একটা সাধ ছিল সে তুষার দেখবে। এবার আমাদের দুজনেরই তুষার দর্শনের সাধ মিটল। আমরা দেখলাম, অনুভব করলাম আর তুষারের সৌন্দর্য প্রাণ ভরে আস্বাদন করলাম। এ যেন এই ভিনদেশে আমাদের মত পরিযায়ী পাখিদের প্রকৃতিমাতার এক শুভ্র অভ্যর্থনা। বকুমের প্রকৃতি যেন আমাদের জন্য শ্বেত-শুভ্রতার গালিচা দিয়ে সাদরে বরণ করে নিল। আমাদের মঙ্গলযাত্রা শুভ হোক।


মার্চ ২০১৮
বকুম, জার্মানি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here