পাহাড়ী সমাজের কথা

0
95

‘আগে কী সুন্দর দিন দিন কাটাইতাম’ শীর্ষক একটি জনপ্রিয় গান আছে সিলেট অঞ্চলের বয়াতি শাহ আব্দুল করিমের। তিনি তাঁর পার করা যৌবনকালের স্বর্নালী সময়কে হাতড়িয়েছেন এ গানের ভেতর দিয়ে। বর্তমানে যার ছিটে ফোটার অংশও আর নেই। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ী সমাজের সেরুপ সোনালী দিন ছিল। শির উঁচু করে দাঁড়ানো খাস পাহাড় পর্বতের মতো ছিল পাহাড়ি সমাজ ব্যবস্থা। কালক্রমে নানা অভিঘাতে সমাজের মাজাও ভেঙ্গে গেছে। সোজা হয়ে আর দাঁড়াতে পারেনি। বর্তমানে যাদের বয়স পঞ্চাশ বা ষাট সেটা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। মোটা দাগে বলতে গেলে পাহাড়ীদের প্রথমে সমগোত্রে ও পরে বহুগোত্রের সমাজ ছিল সমান্তরাল কিংবা সন্নিকটে সমাজও ছিল। এখনও আছে। তবে আরও পরে আন্ত-ভাষীর সমাজেরও পত্তন ঘটে। এদের ভাষাগত ভিন্নতা থাকলেও ভাবের ও চিন্তার নৈকট্য ছিল। এর কারণ সহমর্মিতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ। পারস্পরিক সহযোগিতা এদের সাধারণ রীতি। একজনের বিপদে অন্যরা এগিয়ে যেতে কুন্ঠাবোধ করে না। সামাজিক বন্ধনের এ কাঠামো বাঁধভাঙ্গার মত ভেঙ্গে গেছে। ফরাসী সমাজ বিজ্ঞানী অগাস্ট কোঁত বলেছেন, প্রগতি হচ্ছে নিয়ম শৃঙ্খলার উন্নয়ন। তাই তিনি স্থিতিশীল সমাজের কথা বলেছিলেন। এতে ধারাবাহিক বিকাশ ঘটে। কিন্তু নিয়ম শৃঙ্খলার উন্নয়ন পাহাড়ী সমাজে আজও ঘটেনি। অনিয়ম, অরাজকতা, খামছে ধরেছে।

কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য তাঁর কাব্য রচনায় ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে যাওয়ার কথা বলেছেন। আমরাও নতুন প্রজন্মের সুন্দর পৃথিবী না হোক অন্তত এক স্থিতিশীর সমাজ ব্যবস্থা রেখে যাওয়ার কথা ভাবি। সে ভাবনা আদৌ কি সফল হবে? পারিপার্শ্বিক অবস্থা দেখে মনে হয় তেমন সমাজ রেখে যেতে আমরা আর সমর্থ হবো না। সমাজকে ঢেলে সাজিয়ে এক কল্যাণকর অবস্থা তৈরি করতে আমরা পারি নি। আবার পূর্ববর্তী প্রজন্মের নীতি মেনে প্রচলিত অবস্থাকেও ধরে রাখতে পারিনি। যেমন পারে নি বাঙ্গালী সমাজ।

গ্রামীন ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. মোহাম্মদ ইউনুসের বক্তব্যের একটুখানি আলোকপাত করলে অপ্রাসঙ্গিক হবে বলে মনে করি না। তিনি তাঁর ‘আমরা চাকুরি চাই না, আমরা চাকুরি দেব’ শীর্ষক নাতিদীর্ঘ এক প্রবন্ধ উল্লেখ করেন যে, মৌচাকে শ্রমিক মৌমাছীরা বাইরে রস আহরণ করে মধু তৈরির জন্য চাকের উপরের স্তরে ঠেলে দেয়। এর রস খেতে পারে না। এ রস উপর দিকেই ক্রমান্বয়ে জমা হতে থাকে। বাংলাদেশে নিম্ন শ্রেণীর দায়িত্ব হলো রস তৈরি করে উপরের দিকে ঠেলে দেওয়া। উপরের স্তরে সে রস ছেঁকে সেখানকার লোকেরা আরো উপরের স্তরে ঠেলে দেয়। স্তর যতই উপরের দিকে যাবে লোকের সংখ্যা ততই কমে যাবে। উপরের স্তরের বহু রস জমা হয় এদিকে নিচের স্তরে অনটন দেখা দিলে সামান্য পরিমাণ রস ছেড়ে দেওয়া হয়। এ পদ্ধতিকে তিনি অর্থনীতির নিয়ম বলেই জেনেছেন। তবে তিনি এ ব্যবস্থার অবসান চেয়েছেন। সামাজিক ব্যবসার স্বার্থে অধিকাংশ ‘রস’ নীচের স্তরে রাখা উচিত বলে তিনি মত প্রকাশ করেছেন।

অনেকেই বলেন, মাছের পঁচন শুরু হয় মাথা থেকে। পাহাড়ী সমাজের পচঁনও ধরেছে মাথা থেকে। আমাদের সার্কেল চীফ বা রাজা হেডম্যানরাই সমাজের মাথা। তাঁদের অদূরদর্শীতার কারণে সমাজে পচঁন ধরেছে।

সমাজের মানুষকে তাঁরা প্রজারূপে গণ্য করেছেন। সুখে-দুঃখে তারা সমাজকে সঙ্গে রাখেন নি। তাঁরা শাসকরূপে সমাজের উপর থেকেছেন। তাদের ভাবনা-চিন্তায় সমাজকে নিয়ে নয়। তাদের উদ্দেশ্য ক্ষমতা সংহত করা আর সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করা। অথচ তাদের সামনে একটা সুযোগ ছিল সমাজকে জাগ্রত করবার। সাথে করে লড়াই করবার, করেননি। একটা ঢেউ তোলার চেষ্টা করলেন বিলম্বে। সময়টা বেশ অসময়। তখন তাঁরা সরকারের কাছে দাবি তুললেন, ভাতা বাড়াতে আর দপ্তর দিতে। সমাজের কথা বলেন নি। মানুষের কথা বলেননি। ভূমি সমস্যা সমাধানের কথা বলেন নি। শেষ পর্যন্ত সে দাবিও আর বাস্তবায়নের দাবি তুলেননি।

এ পচঁনময় সমাজের অবস্থা আর নিরাময় হয়নি। কারণ প্রতিটি ক্ষেত্রেই ধ্বস নেমেছিল। সমাজপতিরা অবশ্য ধর্মকে দাঁড় করিয়ে সমাজের মানুষকে একত্র করার চেষ্টা করেছিল। পুরোহিতদের দ্বারা ধর্মবাণী প্রচার করা হয়েছিল। নীতি নৈতিকতার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু চোর না শুনে ধর্মের কাহিনী। তারা ক্ষুধা নিবারণ করতে চায় আর সম্পদ বাড়ানোর সুবিধা চায়। এদিকে সমাজের বৈষম্য নিরসনের কোন পদক্ষেপও নেওয়া হয়নি। এমন টানা পোড়েনের মধ্যে পাহাড়ী সমাজে এক প্রভাবশালী শ্রেণীর উদ্ভব হয়েছে। তারা এক দিকে সামাজিক নেতৃস্থানীয় সার্কেল চীফ (রাজা) হেডম্যানগণের হারানো স্থান দখল করে নিয়েছেন, অপরদিকে নিজেরাই উচ্চশ্রেণী রূপে আবির্ভূত হয়েছেন। সংখ্যায় কম হলেও ক্ষমতার নিকটে থাকায় তারা সমাজে পোক্ত পিলারের মত। অপরদিকে সাধারণ সংখ্যায় বেশি দরিদ্র, শ্রম ও কৃষিজীবী। এদের কাজ শ্রম দেয়া। তাদের আরেক নাম নিম্নবিত্ত। এটা সাধারণ অর্থে। এরা কোন রকম বেঁচে থাকে। অসুখে অপুষ্টিতে ভোগে, কষ্ট পায়। এদের মূল্য ঘোলা পানির চেয়েও কম।

পাহাড়ী সমাজের উচ্চ শ্রেণী বা প্রভাবশালী শ্রেণী যেমন মর্জি বলতে পারেন, চলতে পারেন, করতেও পারেন। এসব কাজে নানারকম বেল্কিও আছে। যেহেতু তারা সমাজে ক্ষমতাধর। তাদেরও সমাজের কথা ভাবতে হয় না। কিন্তু সমাজের অভিভাবকরুপে নিজেদের প্রকাশ করেন। তাঁরা রাষ্ট্রীয় সুবিধা কিছু অংশ নীচের দিকে, অপর অংশ ক্ষুদ্র শ্রেণীকে বিতরণ করেন। এ শ্রেণীর ক্ষমতাও ভয়ানক। যেমন সূর্যের তাপের চেয়ে বালুর তাপ বেশি। সমাজের উপর তারা গদা ঘোরান নিজেদের জানান দিতে। এতে কারো মাথা কেটে গেলেও তাদের কোন অসুবিধা হয় না। তাদের  ভোগবাদিতা ও খামোশ আচরণ নীচের শ্রেণীতে খরচ হয়ে যায়। ফলে তারা সেখানে নমস্য হয়ে থাকেন। রাজনৈতিক ছত্র ছায়ার বাইরে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃত্বেও তারাই থাকেন। তাদের দায়িত্ব হলো নিম্ন শ্রেণীকে রাজনৈতিক প্রয়োজনে উচ্চ শ্রেণীর সামনে হাজির করা। সভা, সমাবেশ, পদযাত্রা কিংবা মিছিলে তাদের নামাতে হয়। জনপ্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠানে তারাই প্রতিনিধি নির্বাচিত হন। নির্বাচিত হওয়ার আগে তারা পাক-পবিত্র হয়ে যান। নির্বাচনী প্রচারের সময়ে নিম্ন বিত্তের পা ধরে কদমবুসি নেন। উন্নয়ন পরিকল্পনার নানা ফিরিস্তি তুলে ধরেন। জনতার পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দেন। নির্বাচিত হওয়ার পর তাদের আর খুঁজে পাওয়া যায় না। এ হয় তাদের জাতি প্রেমের নমুনা।

পাহাড়ী সমাজেও নানা রকম অপরাধ বা অন্যায় সংঘটিত হয়। এগুলোর বহু জনসমক্ষে আসে না। ঝগড়া ঝাটি, হাতাহাতি, মারামারি, প্রায়শই হয়। কোন বখাটে কোন দরিদ্র মানুষকে আক্রমণ করলে অথবা তাদের সম্পদের ক্ষতি সাধন করলে জনপ্রতিনিধিরা আক্রান্তের পাশে দাঁড়ায় না। নূন্যতম সান্তনাটুকু দিতে দেখা যায় না। ক্ষতিগ্রস্ত তার কাছে প্রতিকার চাইতে গেলে থানায় যাওয়ার উপদেশ দেন। অথচ এ জাতীয় অপরাধ বা সমস্যা নিরসনের জন্য সাধারণরা তাদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেন। প্রতিনিধিদের এমন নীরব ভূমিকার কারণে অপরাধী আরও উৎসাহিত হয়ে উঠে। দ্বিতীয়ত গরীব পরিবারের যে সামাজিক সামর্থ্য থাকে, তাতে তার পাশে অপরাধের বিচার চাইতে থানায় যাওয়ার অবস্থা থাকে না। সেখানে টাকা পয়সার ব্যাপরও থাকে। গ্রামীণ কথা আছে, থানার কাছে কানাও যায় না। স্থানীয় নির্বাচন ব্যবস্থার আগে পাহাড়ীরা সামজিক বিচারে আগ্রহী ছিল। সামাজিক বিচার করতেন কার্বারী ও হেডম্যানগণ। এক কথায় হেডম্যানকে তৃতীয় শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রট বলা হত। কিন্তু বর্তমানে সে ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়েছে। এর কারণ পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত গ্রামের গরীব মানুষ আর কোন বিচার বা প্রতিকার পায় না। এ বিচার না পাওয়ার সংস্কৃতি ইতোমধ্যে গড়ে উঠেছে পাহাড়ী সমাজেও। এমনকি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে এসে কেউ দাঁড়াতেই সাহস করে না। কারণ সেখানে আর সামাজিক শক্তি কাজ করে না। ফলে অন্যায় নানা রূপে প্রতিষ্ঠা পায়। অনিয়ম দুর্নীতির প্রসার ঘটে। একে মগের মুল্লুকের পাহাড়ী সংস্করণ হিসাবে সমাজে আবির্ভূত হন। তখন সাধারন আরও কোণঠাসা হয়ে পড়ে। এতে সমাজের ভাঙ্গন নদীর পাড় ভাঙ্গার চেয়ে আরও ভয়াবহ হয়। এমন দৃশ্য পাহাড়ী সমাজে প্রায় দেখা যায়।

স্বাধীনতার এক দশকের পরেও পাহাড়ী সমাজে জনপ্রতিনিধি হওয়ার লোক খুঁজে পাওয়া যেতো না। কেউ স্বেচ্ছায় এগিয়ে আসতে চাইতো না। কিন্তু সচেতন লোক কোন সৎ দরদীকে প্রায় জোর করেই জনপ্রতিনিধির পদে মনোনীত করতেন এবং নির্বাচিত করতেন। ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠা, পরমত সহিষ্ঞুতা বজায় রাখার মধ্য দিয়ে আদর্শ সমাজ কায়েমের জন্য তারা নিবেদিত থাকতেন। এমনও দেখা গিয়েছে যে, সাধারণের উপকার করতে গিয়ে কোন কোন প্রতিনিধির তাঁর পৈতৃক সম্পত্তি পর্যন্ত খোয়া গিয়েছে। অর্থ-সম্পদ না থাকলেও সমাজে তারা সম্মানীয় ছিলেন। যে কোন সভা কিংবা অনুষ্ঠান তাদের কেন্দ্র করেই আবর্তিত হত। সরকারি দান খয়রাত প্রকৃত দরিদ্ররাই পেত। সমাজের এমন চিত্র পাল্ট গেছে এখন। ক্ষমতার কাছাকাছি থেকে রাতারাতি অর্থসম্পদের মালিক হয়েছেন যারা তাদের মধ্য থেকেই জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হন। আর তাদের অনুসারীরাই সরকারি সাহায্য পায়। দু’একজন দরদী যে নেই তা হয়তো বলা যাবে না। কিন্তু তারা থাকেন কোণঠাসা। নাগপাশ ছিন্ন করে সমাজ উন্নয়নের জন্য কাজ করা তার পক্ষে দুরুহ ব্যাপার। সামাজিক ধর্মীয় কিংবা রাষ্ট্রীয় যে কোন সমাবেশে বর্তমান জামানার নেতারাই নেতৃত্ব দেন। তাদের বকৃতা শুনলে মনে হয় গরীব সাধারণের জন্য তাদের হ্রদয় যেন উথলে পড়ে। সমাজের এ বাড়-বাড়ন্ত এমন প্রকট হয়েছে যে, পাহাড়ী জন নেতার কোন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে উপস্থিত না হওয়া পর্যন্ত অনুষ্ঠানও আরম্ভ করা যায় না। ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এ পাবলিক নেতারাই প্রধান আলোচক।  বর্তমান সামাজিক বাস্তবতায় পরোহিতগণকেও অসহায় থাকতে হয়। ক্ষেত্র বিশেষে এ জাতীয় অনুষ্ঠানে তাদের আর্থিক অনুদানও থাকে। এমন অবস্থার প্রেক্ষাপটে সাধারণ মানুষও ধর্মকাজে সরকারের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকে। সমাজের এ মানসিকতা ও আদর্শ পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথে বড় অন্তরায়।

আগে সমাজে বহুমাত্রিক বন্ধন ছিল। একটা সময় প্রধান, জ্ঞানী, গুণী সমাদর ছিল। নানা কাজে তাদের পরামর্শ নেওয়া হত। যে কোন সমাবেশে তাদেরকে সামনের দিকে বসিয়ে সম্মান জানানো হত। পীড়িতদের সাহায্যে সবাই এগিয়ে যেত। সে সব মূল্যবোধও এখন উঠে গেছে। বর্তমানে প্রবীনের সমাদর নেই। উৎসবেও খুব জোরাজুরা না করলে বেড়ানো হয় না। গাছের ফল স্বজনকেও দেওয়া হয় না। হাটে বাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়। অর্থনৈতিক চাহিদার কাছে মানবিকতাও ধরাশয়ী হয়েছে।

সমাজের উপরে স্তরে অর্থ ও ক্ষমতার জন্য প্রতিযোগিতা দেখা যায়। এ দুটো অর্জন করা গেলে মানুষকে টানা যায়। মানুষ টানতে পারলে সমাজকে হাতে পাওয়া যায়। সমাজকে হাত করতে পারলে নেতা(?) হওয়া যায়। নেতা হলে ক্ষমতার আনুকূল্য লাভ করা যায়। এর প্রভাব পড়েছে সর্বত্র। ফলে আমরা নানা ঐতিহ্য হারাতে বসেছি। প্রত্যেকটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে কিছু না কিছু জনহিতকর সামাজিক কার্যক্রম ছিল। যেগুলো সমাজে দীপশিখার মত ছিল। যেমন, মারমা সম্প্রদায় আগে প্রধান সড়কের চৌ-রাস্তায় পথচারীর তৃষ্ণা নিবারণের জন্য রিফুজাং (পানীয় জলের ঘর) তৈরি করত। চরাউত্ (দূরগামী) যাত্রীদের রাত যাপনের ঘর নির্মাণ করত। ধর্মীয় রীতি মেনে বটগাছ রোপণ করত। এগুলো ধর্তব্যে নেওয়া যায় না।

পাহাড়ী সমাজকেও এ অবস্থার কবল থেকে মুক্ত করতে কিছু কিছু দাওয়া আছে বলে মনে করা হয়। অনেকেই বলেন, শিক্ষার হার বাড়াতে হবে। গুণগত মান কম হলেও সংখ্যার হার কিন্তু বাড়ছে। কিন্তু ভঙ্গুর সামাজিক কাঠামো আর জোড়া লাগছে না। অন্যায় অনাচার অত্যাচার অবিচার কমছে না। নীচের স্তরে মাজা ভাঙ্গা, মন বিভক্ত। উপরের স্তরে অর্থ ও ক্ষমতা। আবার সব স্তরে পঁচাগলা কোন না কোনভাবে। কিন্তু চিন্তকরা এখনো পঁচেনি। স্বতন্ত্রতা, বিশিষ্টতায় তারা আজও অনন্য। তাঁরা যে জায়গায় থাকুন না কেন তাঁদের মননশীলতা এখনও বেশ উঁচুতে। নতুন প্রজন্মকে তারা স্বপ্ন দেখাতে পারে না।

আগে স্বপ্ন কেখানোর মানুষ ছিলেন না। ফলে সমাজে বড় ধরনের শূন্যতার সৃষ্টি হয়। এদেরকে উপরের স্তরে এখনও সমীহ করা যায়। তারা এখনও দেশীয় গোলাম। এটাই আশার জায়গা। সমাজের মেলবন্ধনের কাজটা করতে পারেন। প্রতিবিপ্লব বা আন্দোলন করে এ পরিবর্তন আনা যাবে না। তবে উপরের স্তরেই তাদেরকে একটু আওয়াজ তুলতে হবে। কালোকে কালো সাদাকে সাদা বলা আরম্ভ করতে হবে। হ্যামিলনের বাঁশী বাজানোর মতো অনেকটা। এতে ধীর গতিতে হলেও কিছুটা ইতিবাচক ফলাফল আশা করা যায়। এঁরা বুঝতে পারবেন যে, অর্থ দিয়ে সব কিছু অর্জন করা যায় না। সমাজেরও আদর্শ প্রতিষ্ঠা করা যায় না। প্রথমেই কর্ম ও মনের শুচিতা আনতে হবে। অনেকটা বৌদ্ধদের ধ্যান সাধনার মত। এক সময় আত্মজিজ্ঞাসার মাধম্যে অনুধাবন করবেন যে, ক্ষমতা চিরকাল থাকে না। যেমন রাজাগনের থাকে নি। কিন্তু সমাজ থাকবে যত দিন মানুষ জীবিত থাকবে। এক সময় তাদেরকেও সমাজে ফিরতে হবে। সুতরাং সমাজের সাফ সুতর করতে হবে। ‘অনিষ্টের শাসন, শিষ্টের তোষণ’ এ বার্তা পৌঁছাতে হবে সব সমাজের স্তরে। তাদের সমাজের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি, মানুষের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি, সংস্কৃতির প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে ক্রমান্বয়ে। এতেও অতীতের সোনালী দিন হয়তো আর ফিরবে না। কারণ সময়ের বুকে নানা অভিঘাত এসেছে। নানা পরিবর্তন ঘটে গেছে কিন্তু সত্য, ন্যায়, সমতা পুনঃস্থাপন করা গেলে কিছুটা স্থিতিশীল সমাজের রূপ নিতে পারে। এতে ক্ষমতা আর দরিদ্রের মধ্যে দূরত্ব কমে আসবে। এ পদ্ধতি কিছুটা উপরের স্তর থেকে নীচের স্তরে ‘রস’ ছেড়ে দেওযার সাথে তুলনীয়। সমাজে অন্তত এটুকু অর্জন হলেওবা মন্দ কী? পরবর্তী প্রজন্মের জন্য এটুকু করা গেলেও আমাদের ভাবনার কিঞ্চিৎ সার্থক হতে পারে। নিরাময়ের দ্বিতীয় উপায় কেউ বাতলে দিলেও দিতে পারে।


লেখকঃ অংসুই মারমা, ফিল্ড সুপারিনটেনডেন্ট, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, রাঙ্গামাটি।

তথ্যসূত্রঃ দ্বিতীয় পার্বত্য চট্টগ্রাম আদিবাসী লেখক সম্মেলন ২০১৬, স্মারক সম্মেলন। 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here