১৯৪৭ সালের ভারত বিভক্তি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে আরো কিছু অজানা বিষয়

3
115

[পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক অনেক তথ্য আমরা জানতামই না। বিশেষত দেশ বিভাগের আজ প্রায় ৭০ বছর পর পার্বত্য চট্টগ্রাম কেন, কিভাবে ভারতের না হয়ে পূর্ব পাকিস্তান ও তার ধারাবাহিকতায় বর্তমান বাংলাদেশের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হলো তার অনেক ঘটনাপ্রবাহ ও তথ্য জানতে পারছি। এসব ইংরেজী ভাষায় লেখার মর্মার্থ অনেকের কাছে সম্পূর্ণ বোধগোম্য নাও হতে পারে। অথচ এ সকল সত্য তথ্য আমাদের সকলের বিশেষত নতুন প্রজন্মের জানা বা এই অতি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনার ভেতরের খবর সর্ম্পকে অবগত থাকা খুবই জরুরী। এই গুরুত্বের কথা ভেবে দেশবিভাগ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রসঙ্গে একগুচ্ছ লেখা বাংলা অনুবাদের প্রচেষ্টা।]

১) দেশবিভাগের সবচেয়ে বড় ভুল: পূর্ব পাকিস্তানে পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্ন্তভুক্তি ভারতের চাকমাদের মধ্যে স্বনামধন্য রাষ্ট্রদূত প্রয়াত মুকুর কান্তি খীসার লেখা ‘অল দ্যাট গ্লিটর্স’ বইয়ে উল্লেখিত তথ্য থেকে দেশ বিভাগের সময়কার কিছু স্মৃতিচারণা নিন্মরুপ:

১৯৪৭ সালের ‘ইন্ডিয়ান ইনডেপেডেন্স এ্যাক্ট’-এর প্রথম পরিকল্পনায় নতুন প্রদেশ পূর্ববঙ্গে (পরবর্তীতে পূর্ব পাকিস্তান) বেঙ্গলের কোন কোন জেলা অর্ন্তভুক্ত হবে তার একটা তালিকা ছিল। সেখানে স্পষ্ট লেখা ছিল যে, চট্টগ্রাম বিভাগে চট্টগ্রাম জেলা, নোয়াখালী এবং তিপেরা। এখানে পার্বত্য চট্টগ্রামের কোন নাম উল্লেখ ছিল না। দেশবিভাগের মৌলিক আইন খুবই পরিষ্কার ছিল। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ পাকিস্তানে আর অমুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ভারতে থাকবে। বেঙ্গল ও পান্জাবের কিছু অঞ্চলকে নিয়ে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের নেতাদের মধ্যে কিছু মারাত্নক মতপার্থক্য থাকার কারনে সেই এলাকাগুলির সীমা নির্ধারণে গঠন করা হয় বাউন্ডারী কমিশন।

সুতরাং স্যার সিরিল রেডক্লিপের সভাপতিত্বে গঠিত কমিশনের কাজটিও ছিল অত্যন্ত সুস্পষ্ট। কাজেই পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়টিও বাউন্ডারী কমিশনের এক্তিয়ারের বাইরে ছিল। ১৯৪৭ সালের আগষ্টে, দেশবিভাগের সময় পার্বত্য চট্টগ্রামের অমুসলিম জনসংখ্যা ছিল ৯৮.৫% আর মুসলিম জনসংখ্যা ছিল মাত্র ১.৫%।

নিচের পরিসংখ্যান তার একটি স্পষ্ট চিত্র দেবে-

বুড্ডিস্ট                          ৮৫.৫%

হিন্দু (প্রধানত ত্রিপুরা)                ১০%

প্রকতি পুজারী                      ০৩%

মুসলিম                           ১.৫%

তাহলে গোটা পার্বত্য চট্টগ্রামের জনসংখ্যার চিত্রটি ছিল-

পাহাড়ী জনসংখ্যা                     ৯৭.৫%

সমতল থেকে আসা জনসংখ্যা             ২.৫%

(হিন্দু মুসলিম ও বড়ুয়া)

কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় যে ভারতের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে লর্ড মাউণ্ট ব্যাটেনকে তার কৃতিত্বের জন্য উজ্জল দৃষ্টান্ত হিসেবে মনে করা হলেও তিনি ছিলেন খুবই ব্যস্ততার মধ্যে। তার লক্ষ্যও ছিল দেশভাগের ন্যায় একটি বিশাল কর্মকান্ডকে দ্রুত সম্পন্ন করা। ভারত উপমহাদেশে বৃটিশের শেষ রাজপ্রতিনিধি (ভিসরয়) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহনের  আগেই তিনি রাজা ৬ষ্ঠ জর্জকে (যিনি তার ঘনিষ্ঠ আত্নীয়) শর্তারোপ করেন যে- ‘আমি এই দায়িত্ব গ্রহন করতে রাজী একমাত্র শর্তে যে, ১৯৪৮ সালের জুলাইয়ের  মধ্যেই ভারতকে স্বাধীনতা দিতে হবে এবং আমি তার একদিনেরও বেশি সেখানে থাকব না’। মাউণ্ট ব্যাটেন ভারতে আসেন ১৯৪৭ সালের  মার্চ মাসে এবং দেশবিভাগের বিশাল এই কাজ সম্পন্ন করতে তার হাতে ছিল প্রায় ১৬ মাস। অথচ তিনি সেই কাজ শেষ করেন ১৯৪৭ সালের আগষ্টের ১৫ তারিখ অর্থাৎ মাত্র ৫ মাসের মধ্যে যার জন্য তাকে যথেষ্ট কৃতিত্বও দেয়া হয়।

রেড ক্লিপ কমিশনের এওয়ার্ড বা সনদ জমা দেয়া হয় ১৯৪৭ সালের ৯ই আগস্ট। এরপর ১২ই আগস্ট যখন স্টাফ মিটিং হয় তখনই হট্টগোল শুরু হয়ে যায়। সর্দার বল্লব ভাই প্যাটেলের প্রতিনিধি ভি পি  মেনন পার্বত্য চট্টগ্রামকে পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে জেনে তীব্র প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেন কমিশনের সনদে। ১৩ই আগস্ট সর্ব ভারতীয় কংগ্রেস কমিটিও বিষয়টি উত্তাপন করে এবং উল্লখ করে যে, কমিশনের সিদ্ধান্ত অযৌক্তিক, বিচারহীন, সামঞ্জস্যহীন ও অর্থহীন। সুতরাং এই সিদ্ধান্ত কার্যকরী হওয়ার উপযোগী নয়। মাউণ্ট ব্যাটেনকে লিখিত চিঠিটে সরকার প্যাটেল রুষ্টভাবে উল্লেখ করেন- ‘কমিশনের সিদ্ধান্ত বেআইনী ও শর্তের পরিপন্থী। আমি পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষদের আহব্বান করছি তারা যেন পাকিস্তানভুক্তিকে বলপূর্বক প্রতিহত করে’। বাউন্ডারী কমিশনের এওয়ার্ড (সনদ) ১৩ই আগস্ট প্রকাশ করার কথা ছিল। কিন্তু মাউণ্ট ব্যাটেন ছিলেন নির্লিপ্ত। মাউণ্ট ব্যাটেনের জীবনী লেখক ফিলিপ জিগলারের মতে- ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের বিষয়টা মাউণ্ট ব্যাটেনের  মাথায় ছিল বেশ দুচিন্তার। তিনি (মাউণ্ট ব্যাটেন) আশঙ্কা করছিলেন নেহেরু স্বাধীনতা উদযাপনের দিনটিকে বয়কট করবেন, ভারতের জন্ম কোন শান্ত পরিস্থিতির মধ্যে না হয়ে, হবে চরম বিদ্রোহ ও হিংসায় উম্মত্ত। তাই মাউণ্ট ব্যাটেন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ১৫ই আগস্ট যখন স্বাধীনতার দিনটি উদযাপনের অনুষ্ঠান সমাপ্ত হবে ঠিক তারপরের দিন অর্থাৎ ১৬ই আগস্ট কমিশনের সনদটি ঘোষনা করবেন। জিগলার যেভাবে লিখেছেন- ‘পার্বত্য চট্টগ্রামকে পাকিস্তানে অর্ন্তভুক্ত করার কারণে দেশ বিভাগের সনদের উপর ভারতীয় নেতৃত্ব জ্বলে উঠতেও পারে এই ভাবনা থেকেই মাউণ্ট ব্যাটেন নিজেই স্বাধীনতা দিবসের পরের দিন সনদ ঘোষনার কথা ভেবে রেখেছিলেন’।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে সর্দার প্যাটেলের ভয়ংকর প্রতিক্রিয়া দেখে মাউণ্ট ব্যাটেন নিজেই আচর্য হয়েছিলেন। তার স্মৃতিচারনায় মাউণ্ট ব্যাটেন লিখেছেন- ‘একজন প্রকৃতই রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে আমি যে ব্যক্তিকে সম্মান করতাম, দেশের মাটিতে যার শক্ত ভিত্তি রয়েছে এবং যিনি বলিষ্ঠ কথার মানুষ হিসেবে সমধিক সম্মানিত তিনি যদি নিয়ন্ত্রনের বাইরে যান। একটি সামান্য বিষয়ে নিভৃতে এমন ভয়ংকর সংকট যদি সৃষ্টি হয়ে যায় তথাপি জরুরী বড় বিষয়গুলিতে মনোনিবেশ করতে গিয়ে কোন অবস্থাতেই যাতে সেই ব্যক্তিত্ব গর্জে না উঠে তা অনুধাবন করতে বেশ কিছুদিন ভারতে কাটাতে হয়েছিল আমাকে’।

বাউন্ডারী কমিশনের মুসলিম সদস্য মোহম্মদ মুনিরও বলেন- ‘আমি শুরু থেকেই নিশ্চিত ছিলাম যে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভারতে অন্তর্ভুক্ত হবে’। পার্বত্য চট্টগ্রামকে পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্তি করা নিঃসন্দেহে নীতিগতভাবে একটি অবিচার, শর্তের পরিপন্থী এবং অন্যায়।

ইন্ডিয়ান কনসিটিটিউয়েণ্ট এসেম্বলীর সাব কমিটির মেম্বার মি. জয়পাল সিং যিনি ভারতের (শাসন বহিঃর্ভুত অঞ্চল) এক্সক্লুডেড এরিয়াগুলি নিয়ে কাজ করছিলেন তিনি লিখেছেন- ‘পার্বত্য চট্টগ্রামকে অবশ্যই ভারতের ফেরত চাইতে হবে’। পরবর্তীতে কিছুদিনের মধ্যে কোলকাতায় এক ভাষণে নেহেরুজি নিজেই বলেছেন- ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে গুরুতর অন্যায় করা হয়েছে’। তিনি আরো ঘোষনা করেন, বিষয়টি নিয়ে পাকিস্তানের কাছে উত্থাপন করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে কিছুই করা হয়নি।

যাই হোক, মুকুর কান্তি খীসা আরও উল্লেখ করেন, ‘আমরা তবুও আমাদের প্রতিনিধি দিল্লীতে পাঠিয়েছিলাম আমাদের দুর্ভাগ্যের কথা, আমাদের দাবীর কথা বলতে। সর্দার প্যাটেল তাদের স্বাগত জানিয়েছিলেন এবং মনোযোগের সাথে তাদের কথা শুনিয়েছিলেন। পরামর্শও দিয়েছিলেন যা শক্তি আছে তা দিয়ে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্তিকে প্রতিরোধ করার জন্য। সর্দার প্যাটেল প্রতিনিধিদলকে বলেছিলেন- এই মুহূর্তে কাশ্মীর, হায়দ্রাবাদ এবং জুনাগাদ নিয়ে আমি পুরোপুরি ব্যস্ত রয়েছি। এই সমস্ত সমস্যাগুলি সমাধা করার পর আমি নিশ্চয়তা দিচ্ছি যে আমি আপনাদের উদ্ধার করতে এগিয়ে আসব’। বড়ই দুর্ভাগ্যের বিষয় যে, ১৯৫০ সালের ১৫ই ডিসেম্বর সর্দার প্যাটেলের অপরিণত জীবনাবসানে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষদের আবেদন পরিত্যক্ত হয়ে রইল ইতিহাসের আস্তাকঁড়ে। আর এভাবেই পার্বত্য চট্টগ্রামের অসহায় মানুষদের প্রতি অবহেলা, অত্যাচার, নির্যাতন, গণহত্যার সীমাহীন গল্পের শুরু।

২) ভারতের স্বাধীনতা: দেশবিভাগের তথ্যসূত্র-৯:

১৯৪৭ সালের ১৬ই আগস্ট, শনিবার বিকাল ৫টা, নতুন দিল্লীর সরকারী ভবনে অনুষ্ঠিত সভার সংক্ষিপ্ত কার্য-বিবরণী নিম্নরূপ-

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বেঙ্গল আর পাঞ্জাবের অংশবিশেষের সীমানা নির্ধারণের বাউন্ডারী কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহন করতে ১৯৪৭ সালের ১৬ই আগস্ট, শনিবার বিকাল ৫টা, নতুন দিল্লীর সরকারী ভবনে অনুষ্ঠিত সভার সংক্ষিপ্ত কার্য-বিবরণীতে [আই ও আর: এল/পি এন্ড জে/১০/১১৭] কেবল পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে যে কয়েকটি বিষয় নথিবদ্ধ হয়েছিল তার বয়ান নিম্নরূপ-

সভায় উপস্থিত ছিলেন- রাজপ্রতিনিধি মাউণ্ট ব্যাটেন-গর্ভণর জেনারেল অব ইন্ডিয়া। পন্ডিত জওহর লাল নেহেরু- প্রধানমন্ত্রী, ভারত। মি. লিয়াকত আলী খান-প্রধানমন্ত্রী, পাকিস্তান। সর্দার বল্লবভাই প্যাটেল-হোম মিনিস্টার, ভারত। মি. ফজলুর রহমান- অভ্যন্তরীণ মন্ত্রী, পাকিস্তান। সর্দার বলদেব সিং-প্রতিরক্ষামন্ত্রী, ভারত। মি. মোহম্মদ আলী-ক্যাবিনেট সেক্রেটারী, পাকিস্তান। রাও বাহাদুর ভি.পি. মেনন- সেক্রেটারী অব স্টেটস ডিপার্টমেণ্ট, ভারত। লে.কর্ণেল ভি.এফ. ইরকাইন- কনফারেন্স সেক্রেটারী অব দি গর্ভনর জেনারেল অব ইন্ডিয়া।

১) বাউন্ডারী কমিশনের সনদ মিটিং-এ আলোচিত হয়। সনদের কপি সেদিন সকালে জয়েণ্ট ডিফেন্স কাউন্সিল-এর মিটিং-এর পর মন্ত্রীদের কাছে বিলি করা হয়।

২)পন্ডিত নেহেরু বলেন- তিনি কখনও চিন্তাই করেননি যে বাউন্ডারী কমিশনের শর্ত অনুসারে পার্বত্য চট্টগ্রামকে পূর্ব বাংলায় অর্ন্তভুক্ত করা হবে।  খ্যাতনামা আইনজীবিরাও এই বিষয়ে নিশ্চিতভাবে ধারণা করেছিলেন। এই পার্বত্য অঞ্চলটি ছিল শাসন বহির্ভূত অঞ্চল এবং বাংলার সংসদে এর কোন প্রতিনিধিত্ব ছিল না। তিনি এবং তার সহকর্মীবৃন্দ পার্বত্য চট্টগ্রামের চীফ ও নেতৃত্ব যারা সাক্ষাৎ করতে এসেছেন তাদের বার বার নিশ্চয়তা দিয়েছেন যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কোন প্রশ্নই উঠে না। পার্বত্য চট্টগ্রামের জনসংখ্যা ক্ষুদ্র (প্রায় এক চর্তুথাংশ) হলেও সেখানে ৯৭% ভাগ বুড্ডিস্ট ও হিন্দু। এই অঞ্চলের জনগণের মধ্যেও ভারতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার প্রত্যাশার ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছিল না যে তারা ভারত গঠনের অংশীদার হবে। ধর্মীয় এবং সংস্কৃতিগত কারণেই পার্বত্য চট্টগ্রাম ভারতের অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত। স্যার সিরিল রেডক্লিপের এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার কোন এখতিয়ার ছিল না।

৩) পার্বত্য চট্টগ্রামকে স্যার সিরিল রেডক্লিপ কেন পূর্ববাংলার সাথে অন্তর্ভুক্ত করেছেন তার ব্যাখ্যা করেছেন গভর্ণর জেনারেল। তিনি বিশেষভাবে গুরুত্ব দেন চট্টগ্রামের সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে। তিনি আরও গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেন পার্বত্য চট্টগ্রামের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত একটি নদী কর্ণফুলীর যথাযথ তত্ত্বাবধান নিয়ে যা চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য অপরিহার্য।

৪)মি. ফজলুর রহমান তার মতামত দেন যে, চট্টগ্রাম জেলা থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিচ্ছিন্ন করলে তা নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করতে পারবে না। তার মতে, পূর্ববঙ্গের সাথেও এই পার্বত্য অঞ্চলকে অন্তর্ভুক্ত করা প্রশ্নাতীতভাবে দেশবিভাগের শর্তের সাথে অ-অনুমোদনযোগ্য। বাস্তবে, শর্ত অনুসারে পশ্চিমবঙ্গের সাথেও পার্বত্য চট্টগ্রামকে অন্তর্ভুক্ত করার উপায় নেই।

৫) গর্ভণর জেনারেল বলেন যে, স্যার ফ্রেডরিক বুরোসের মতেও পার্বত্য চট্টগ্রামের সমগ্র অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে যদি তা পূর্ববঙ্গের সাথে অন্তর্ভুক্ত করা না হয়। তথাপি, তিনি নিশ্চত করেন যে, স্যার ফ্রেডরিক এই বিষয়টি স্যার সিরিল রেডক্লিপকে প্রকাশ করেননি, তাই তিনি সিদ্ধান্ত নেয়ার বেলায় প্রভাবিত হয়েছেন বলে বলা যায় না।

৬) গর্ভণর জেনারেল প্রস্তাব রাখেন যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রশাসন যদি ভারতের হাতে দিয়ে দেয়া হয় তাহলে কর্ণফুলীর উপরিভাগের জলসম্পদের সুরক্ষার জন্য নদীর উভয়তীরের একভাগ পূর্ববঙ্গকে দেয়া যায় কিনা তারও সমঝোতা হতে পারে।

৭) এই বিষয়টি উভয়পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য সমাধান নয় বলে মনে হয়। পন্ডিত নেহেরুর মতামত ছিল, সমগ্র অঞ্চলটির শাসন ভারতের হাতে হওয়া উচিত; পাকিস্তানের হাতে নদীর উভয় তীরের একটি ভাগ দিয়ে দিলে অঞ্চলটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। যদি পার্বত্য চট্টগ্রামকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করা হয়, দুই দেশের সরকারের মধ্যে এমন একটি চুক্তি হতে পারে যাতে পাকিস্তান তার প্রত্যাশিত জলসম্পদের সুবিধা লাভ করে।

৮) মি. লিয়াকত আলী খান বলেন যে, তিনি কেবল এই অঞ্চলটির ক্ষেত্রে কোন প্রকার সমঝোতাকে (এডজাস্টমেণ্ট) মেনে নিবেন না। দুই কমিশনের সনদের বেলায় সমগ্র বিষয়ে অবশ্যই পুর্ণবিবেচনা করতে হবে। যদি তা হয়, তাহলে দেখা যাবে যে স্যার সিরিল রেডক্লিপ সম্পূর্ণভাবেই শর্ত অনুসারে মৌলিক ভিত্তিকে অবহেলা করছেন। তাছাড়াও পূর্ববঙ্গের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামই কেবল জলবিদ্যুতের একমাত্র উৎস।

৯) গভর্ণর জেনারেল এরপর প্রস্তাব রাখেন যে, তাহলে ভারত ও পাকিস্তানের দুই সরকার কিছু অঞ্চল ভাগাভাগি নিয়ে সম্মত হোক কমিশন যেখানে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল ভারতে অন্তর্ভুক্ত করে দিয়েছে তা পাকিস্তানে ঢুকিয়ে দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামকে ভারতে অন্তর্ভুক্ত করা যায় কিনা।

১০) মি. লিয়াকত আলী খান জোর দেন যে, সার্বিকভাবে ধরলে কমিশনের সনদ পাকিস্তানের জন্য এমন বিপক্ষে গিয়েছে যার ফলে প্রস্তাবিত সুপারিশের মতো কোন সামান্যতম রদবদলও তিনি মেনে নিতে পারেন না।

১১) মি.ফজলুর রহমান দার্জিলিং এবং জলপাইগুরি জেলাকে ভারতে অন্তর্ভুক্ত করায় জোরালোভাবে প্রতিবাদ জানান। তার মতে, স্যার সিরিল রেডক্লিপ এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশভাগের শর্তের মৌলিক নীতি লঙ্ঘন করেছেন।

১২) পন্ডিত নেহেরু অবশেষে গুরুত্বরোপ করেন যে, তিনি ও তার সহকর্মীরা নিজেরাই পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে নৈতিকভাবে অনিশ্চয়তায় পড়ে গেলেন। কারণ বিগত দুই থেকে তিন মাস যাবত তারা পার্বত্য অঞ্চলের প্রতিনিধিদের অসংখ্যবার প্রতিশ্রতি দিয়েছেন যে, তাদের অঞ্চলটি পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত হবে না। তাছাড়া, এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল আইনজীবিদের সাথে পরামর্শের ভিত্তিতে।

(৩) ‘দেশভাগ এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা’- ত্রিদিপ শান্তাপা কুন্ডু

ত্রিদিপ শান্তাপা কুন্ডু বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের আসানসোলের বানওয়ারি লাল ভালোটিয়া কলেজের ইতিহাসের এসিস্ট্যণ্ট প্রফেসর। ১৯৪৭ সালে বাংলার  বিভক্তি নিয়ে বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে গবেষণা করছেন। ‘দেশভাগ এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা’ শিরোনামে ২০০৬ সালের জুন মাসের ১৮ তারিখ এক লেখা প্রকাশ করেন। তারই বাংলারূপ প্রকাশ করা হলো রেগা-এর সৌজন্যে।

গোটা দক্ষিন এশিয়ায় সমসাময়িক ইতিহাসে ভারতীয় উপমহাদেশ বিভক্ত হওয়ার ঘটনাটি একই খুবই তাৎপর্যপূর্ন ঘটনা। পান্জাব এবং বাংলার জনগনই নিঃসন্দেহে এই দেশভাগের সর্বাধিক শিকার। বাংলার বিভক্তির প্রক্রিয়ার সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা ও অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতিগোষ্টিগুলোর ভাগ্য একাকার হয়ে যায়। পার্বত্য চট্টগ্রাম ছিল একটি শাসন বহির্ভূত অঞ্চল এবং এখানকার অধিবাসীরা হিন্দুও নয় মুসলিমও নয়। তারা ছিল কিছু বৌদ্ধ ধর্মী ও কিছু প্রকৃতি পূজারী। ৯৭% অ-মুসলিম জনসংখ্যার পার্বত্য চট্টগ্রাম পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্তি হওয়া দেশভাগের একটি চরমতম ভুল। বর্তমান লেখাটি সেই দেশভাগের প্রক্রিয়া এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা ও অন্যান্য জাতিসত্তাদের দেশভাগের কারনে কি পরিনতি হলো সে সর্ম্পকে অনুধাবন করার একটি উদ্যোগ। ৩ জুন উপমহাদেশ বিভক্তির কর্মসূচীর জন্য মৌলিক নীতিমালা দেয়া হয় এবং ১৯৪১ সালের জনগণকে ভিত্তি হিসেবে গ্রহন করা হয়। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল পাকিস্তানে ও হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল ভারতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এ যৌক্তিক কারণে ৯৭% অমুসলিম অধ্যুষিত পার্বত্য চট্টগ্রাম ভারতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা। স্বাধীনতার আগে চাকমা নেতারা দিল্লীতে যান এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম ভারতে অন্তর্ভুক্ত হবে এরকম আশ্বাসও পান ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতাদের পক্ষ থেকে।

পরিকল্পনা অনুসারে বাংলার আইনসভাকে দুই অংশে বিভক্ত করা হয় এবং তারা আলাদা আলাদাভাবে ১৮৪৭ সালের ২০ জুন দেশভাগের প্রশ্ন নিয়ে সিদ্ধান্তের জন্য দেখা করেন। হিন্দু প্রধান জেলাগুলির সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিনিধিরা বাংলা ভাগ করার পক্ষে ভোট দেন। অপরদিকে, মুসলিম প্রধান জেলাগুলির প্রতিনিধিরা এর বিরুদ্ধে ভোট দেন। এই ভোটের ভিত্তিতে ভাগের পক্ষে মতামতকে যথেষ্ট প্রতিষ্ঠিত করা হয়। এখানে উল্লেখ করা সমীচীন হবে যে, পাহাড়ী জনগণের বাংলার আইনসভায় কোন প্রতিনিধিই ছিল না এবং সে কারণে বাংলার বিভক্তি সর্ম্পকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রশ্নে ১৯৪৭ সালের ২০ জুন তারিখে মতামত প্রদানে তাদের কোন বক্তব্যই ছিল না। বাউন্ডারী কমিশনের কাছে মুসলিম লীগ পার্বত্য চট্টগ্রাম উপর শক্ত দাবি উত্থাপন করে। তাদের মতানুসারে-‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চট্টগ্রাম জেলারই একটি অর্থনৈতিক এবং ভৌগলিক অংশ, তাই একে ভাগ করলে উভয়ের স্বার্থই ক্ষতি। চট্টগ্রাম বন্দরের যথাযথ ব্যবস্থাপনার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামকে তাদের ভাগে ঢুকিয়ে দেয়া প্রয়োজন। বহিঃর্বিশ্বের সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল যোগাযোগ চট্টগ্রাম জেলার উপর দিয়েই। পার্বত্য চট্টগ্রামে একট বর্ধিত বা অবিচ্ছেদ্য জেলা এবং খাদ্য সরবরাহের জন্য চট্টগ্রামের উপরই নির্ভরশীল। চট্টগ্রামে যেহেতু কোন কয়লা খনি নেই, তাই কর্ণফুলী নদীতে তৈরি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পটি গোটা অঞ্চলের বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য প্রয়োজন।

অপরদিকে, বাউন্ডারী কমিশনের অমুসলিম সদস্যরা শাসন বহির্ভুত অঞ্চল পার্বত্য চট্টগ্রামকে ভারতীয় ইউনিয়নে অন্তর্ভুক্তির জন্য বেঙ্গল বাউন্ডারী কমিশনের এখতিয়ার বিষয়ে কিছু মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করেন। সন্দেহতীতভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়টি স্যার সিরিল রেডক্লিপের জন্য একট জটিল বিষয় হয়ে প্রতীয়মান হল। ‘যে অঞ্চলে সমগ্র জনসংখ্যার মাত্র ৩% মুসলিম জনসংখ্যা এই পার্বত্য চট্টগ্রামকে কোন রাজ্যে ঢুকিয়ে দেয়া যায়? চট্টগ্রাম জেলার নিয়ন্ত্রনে থাকা এটিকে অন্য কোন ভিন্ন রাজ্যে ঢুকিয়ে দেওয়াও কঠিন। পূর্ব পাকিস্তানে ঢুকিয়ে দিলে কেমন হয়, যেহেতু কোলকাতাকে পশ্চিম বাংলায় দেয়া হচ্ছে। পূর্ববঙ্গে কেবল বিকল্প হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরটিই থেকে যাচ্ছে, পার্বত্য চট্টগ্রামকে বন্দর নগরী চট্টগ্রামেরই পশ্চাদপদ ভূমি হিসেবে গণ্য করা যায়। অধিকন্তু, পাকিস্তান যেহেতু কলকাতাকেও পেল না আর পাঞ্জাবের ক্ষুদ্র অংশই মাত্র পাচ্ছে, রেডক্লিপ চেষ্টা করেছিলেন পাকিস্তানে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামকে দিয়ে সেই ক্ষতি পূরণ করতে। তথাপি, কমিশনের এই রায় দেশভাগের মৌলিক যুক্তিকে ভঙ্গ করেছে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের জাতিগোষ্ঠীগুলি স্বায়ত্তশাসনের অধিকারকে অবহেলা করেছে। যেহেতু পার্বত্য চট্টগ্রাম ভারতেই অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সম্পর্কে চাকমা নেতারা সম্পুর্নভাবে বিশ্বাসী ছিলেন, তাই আনন্দের সাথে তারা ১৫ আগস্ট রাংগামাটিতে ভারতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। বাউন্ডারী কমিশনের প্রতিবেদন তৈরি হয়ে থাকলেও বৃটিশ সরকার কর্তৃক তা তখনও প্রকাশিত হয়নি। এটি প্রকাশিত হয় ১৭ আগস্ট। পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা ও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীরা তাদের ভূল অংশে পড়ার জন্য দুঃখভরাক্রান্ত হয়ে পড়ে।

চাকমা নেতারা কালবিলম্বনা না করে নতুন দিল্লী চলে যান এবং ভারতীয় নেতারা তাদের ভারতীয় হ্স্তক্ষেপের জন্য আন্দোলন গড়ে তোলার পরামর্শ দেন। প্রতিবাদ মিছিল সংগঠিত করা হয় এবং ২১ আগস্ট পাকিস্তানী সেনা এসে নামিয়ে না দেয়া পর্যন্ত রাঙ্গামাটির সকল সরকারী ভবনে ভারতীয় পতাকা উড়তে থাকে। এস কে চাকমা ও তার অনুসারীরা গ্রেফতার এড়াতে ভারতে পালিয়ে আসেন।

পরবর্তী দুই বছর যাবত তিনি ভারতীয় নেতাদের সেখানে সামরিক হস্তক্ষেপের জন্য কনভিনসড করতে চেষ্টা করেন। ‘প্যাটেল আশাবাদী ছিলেন বটে কিন্তু নেহেরু ছিলেন অনাগ্রহী, এমন কিছু করতে তিনি অনিচ্ছুক ছিলেন যা করলে উল্টো কাশ্মীরকে দখল করতে পাকিস্তানকে উৎসাহিত করে’। যার ফলে চাকমাদের জন্য নির্মম হয়ে ওঠে। রেডক্লিপ এওয়ার্ড প্রকাশের পর চাকমাদের ভারতীয় পতাকা উত্তোলন ও প্রতিবাদ আন্দোলনকে পূর্ব পাকিস্তান সরকার খুব কঠোরভাবে নেয় বলেই মনে হয় এবং সরকার নিশ্চিত হয় যে চাকমারা ভারতপ্রেমী এবং পাকিস্তানের প্রতি আস্থাশীল নয়। ফলে, পাহাড়ী মানুষদের নতুন ইতিহাসের সূচনা হয় সন্দেহ, অবিশ্বাস এবং ভুল বুঝাবুঝির মাধ্যমে। পূর্ব পাকিস্তান সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের জাতিগোষ্ঠীদের পূর্ব পাকিস্তানের সাথে একীভূত করতে প্রয়োজনে বল প্রয়োগেও প্রতীজ্ঞাবদ্ব ছিল। পার্বত্য চট্টগ্রামের জাতিগোষ্ঠীরা আশংকিত হয়ে পড়ে যে পার্বত্য চট্টগ্রামকে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলে পরিণত করার লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানের। তথাপি, মুসলিম দেশ হওয়ার পরিবর্তে পাকিস্তান একক জাতিগত দেশে পরিণত হয়ে গেল না। আফগানিস্তানের সাথে সীমান্ত অঞ্চলে এবং উত্তরের পার্বত্য অঞ্চলে উপজাতীয় এলাকা থাকার কারনে পাকিস্তান তাদের স্বায়ত্তশাসনকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিল।

অপরদিকে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর সংস্পর্শে আসার প্রথম দিকে ১৭৬০ সাল থেকে ভোগ করে আসা পাহাড়ী জনগনের স্বায়ত্ত শাসনের মর্যাদা শেষ করে দেয়ার জন্য পূর্ব পাকিস্তান সরকার দৃঢ় প্রতীজ্ঞ ছিল। ১৮৬০ সালের এ্যাক্ট XXII অনুসারে চট্টগ্রাম থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয় পার্বত্য চট্টগ্রামকে এবং সুপারিনটেডেণ্ট অব হিল ট্রাইব নামে এক অফিসারের নিয়ন্ত্রনে ফেলা হয়। সাত বছর পর, ১৮৬৭ সালে সেই টাইটেলও পরিবর্তন করে ডেপুটি কমিশনার অব হিল ট্রাক্টস নামে অভিহিত করা হয়। এ অঞ্চলের অভ্যন্তরীন শাসন ব্যবস্থাকে তিন জন রাজা-চাকমা, মগ এবং বোমাং-এর হাতে রাখা হয় যারা প্রত্যেকেই আলাদাভাবে স্বাধীন থেকে যায়। বৃটিশ সরকার চিটাগং হিল ট্রাক্টস ফ্রণ্ট্রিয়ার পুলিশ রেগুলেশনস প্রণয়ন করেন ১৮৮১ সালে এবং পাহাড়ী মানুষদের নিয়ে একটি পুলিশ বাহিনী গঠনের কর্তৃত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে অর্পণ করেন। অবশেষে ১৯০০ সালে সরকার চিটাগং হিল ট্রাক্টস রেগুলেশনস প্রণয়নের মাধ্যমে অত্র অঞ্চলের শাসনকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেন। পার্বত্য চট্টগ্রামকে পূর্ব পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত করার সাথে সাথে ১৮৮১ সালের চিটাগং হিল ট্রাকস ফ্রণ্টিয়ার পুলিশ রেগুলেশনসকে সংশোধন করা হয় এবং পাহাড়ীদের পুলিশ বাহিনীর অবলুপ্তি ঘটে। ১৯৬৪ সালে এক সাংবিধানিক সংশোধনের দ্বারা পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় অঞ্চল হিসেবে বিশেষ মর্যাদাও শেষ করে দেয়া হয়। তবুও, বাস্তবিক অর্থে পার্বত্য চট্টগ্রামের কিছু বিশেষ প্রশাসন অব্যাহত  থাকে। ১৯৬০সালের পর থেকে পূর্ব পাকিস্তান সরকার সমতল এলাকার ভূমিহীন মুসলিম পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনর্বাসনের একটি পরিকল্পিত কৌশল গ্রহণ করেন। যার উদ্দেশ্যে ছিল এ অঞ্চলের জনসংখ্যার মানচিত্র বদলে ফেলা। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের অভ্যুদয় হওয়ার পরও এই কৌশল অব্যাহত থাকে। ইতোমধ্যে, ১৯৬৪ সালে কর্ণফুলী নদীতে একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প চালু করা হয়। এ প্রকল্প পার্বত্য চট্টগ্রামের কেন্দ্রে এক বিশাল হ্রদের জন্ম দেয় এবং ২০০০০ পাহাড়ী মানুষকে বিতাড়িত করে। এই কাপ্তাই প্রকল্প পাহাড়ীদের অর্থনৈতিক মেরুদন্ড ভেঙে দেয় এবং ব্যাপকভাবে পাহাড়ী জনসংখ্যা কমিয়ে দেয় আর ১,০০,০০০-এর বেশি পাহাড়ী মানুষকে বিতাড়িত করে। এই কাপ্তাই প্রকল্প পাহাড়ীদের অর্থনৈতিক মেরুদন্ড ভেঙে দেয় এবং ব্যাপকভাবে পাহাংড়ী জনসংখ্যা কমিয়ে দেয়। এই সকল উন্নয়ন যুগপৎভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে অত্যাচার ও অবিশ্বাসের এক পরিস্থিতির জ্ম দেয় এবং যার ফলে, অবশেষে সেখানে গেরিলা বিদ্রোহী আন্দোলনের উদ্ভব হয়। ১৯৭২ সালে ‘জন সংহতি সমিতি’ তথা হিল পিপলস পলিটিক্যাল পার্টি গঠন হয় একই সাথে এরই এক সশস্ত্র শাখা, শান্তি বাহিনীর জন্ম হয়। ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবের প্রাণ নাশের পর ভারত সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় শান্তি বাহিনী খুবই সক্রিয় হয়ে উঠে। শান্তি বাহিনী বাঙ্গালী সেটেলারদের উপর বার বার আক্রমণ পরিচালনা করে এবং এই সেটেলারদের রক্ষা করতে এ অঞ্চলে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ী জনগণের জীবনে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে যায়। পরিস্থিতির শিকার হয়ে তারা আন্তর্জাতিক সীমানা পার হয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্য, বিশেষত ত্রিপুরা ও মিজোরামে আশ্রয় নেয়।

সুতরাং, ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তি পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা ও অন্যান্য জাতি গোষ্ঠীগুলির ভবিষ্যত নির্ধারণে এক অত্যন্ত নির্মম ভূমিকা রাখে। পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি শাসন বহির্ভূত অঞ্চল হিসেবে, স্যার সিরিল রেডক্লিপের নেতৃত্বে বেঙ্গল বাউন্ডারী কমিশনের বস্তুত এখতিয়ারের বাইরে ছিল। বাংলার আইন সভায় পাহাড়ী জনগণের কোন প্রতিনিধিত্ব ছিল না এবং তাই বাংলার বিভক্তির বিষয়ে যা সিদ্ধান্তমূলক সেই ২০ জুনের মত প্রদানে তাদের কোন বক্তব্যই ছিল না। শাসন বহির্ভূত অঞ্চল হওয়ার অছিলায় ৩ জুনের পরিকল্পনায় পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাংলা কি পূর্ব বা পশ্চিম অংশে অন্তর্ভুক্তির কোন যৌক্তিকতাই থাকতে পারে না। তবুও, দেশভাগের মৌলিক যুক্তিকে অবহেলা করেই পার্বত্য চট্টগ্রামকে পূর্ব পাকিস্তানে দেয়া হল। এটি নিঃসন্দেহে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ী মানুষদের স্বায়ত্ত শাসনের অধিকারকে অগ্রাহ্য করা। দেশভাগ তাই পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা ও অন্যান্য পাহাড়ী জাতিগোষ্ঠীগুলির ভাগ্যকে অন্ধকারে ফেলে দিল। তারা তাদের পিতৃভূমি থেকে ব্যাপক হারে উচ্ছেদ হল এবং উপমহাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে শরণার্থীর জীবন যাপনে বাধ্য হল। এটিই হল দেশভাগের কারনে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপর নির্মম পরিণতি।


 লেখকঃ প্রধীর তালুকদার (রেগা), প্রাবন্ধিক, ভারত, ই-মেইলঃ [email protected]

3 COMMENTS

  1. মান্যবরেষু,
    নমস্কার নিবেন। আমার নাম রিপন চাকমা। আমি ফেইসবুক-এ Reference নামে একটি পেইজ মেইনটেইন করি (Internal link)। অনেক বিদ্যান লেখক, গবেষকদের সুবিধার্থে এই পেইজে ইতিহাস নির্ভর ও তথ্যসমৃদ্ধ প্রবন্ধ, লেখা ইত্যাদি আমি সন্নিবেশিত করে থাকি। আমি বিশ্বাস করি যে, এই উদ্যোগ অনেককে পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং তার অধিবাসীদের সঠিক ইতিহাস জানতে উতসাহিত করবে। সেই সাথে সাহিত্য ও প্রাসঙ্গিক কিছু বিষয় সম্পর্কেও এই পেজ কিছু তথ্য দিতে সহায়তা করবে।
    আমার এই পেজের চলার পথে কয়েকটা পোস্ট আমি কপি করে রেখেছিলাম যেগুলির লিঙ্ক Jumjournal-এর। কিন্তু আমি গতকাল অর্থাৎ ২০/০৮/১৮ তারিখে খেয়াল করলাম যে Jumjournal-এর সাথে লিঙ্ককৃত পোষ্টগুলো খুলছে না। আমি আজ আবার Jumjournal-এ প্রদত্ত লিঙ্কটা (https://bn.jumjournal.com/2018/03/19/%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A6%A4%E0%A7%8D&#8230😉 নতুন পেজে পেস্ট করে চেষ্টা করেও খুলতে পারিনি। ব্যাপারটা একটু নজর দিলে আপনার প্রতি বাধিক এবং কৃতজ্ঞ থাকব।

    নমস্কার।

    রিপন
    রাঙ্গামাটি
    বাংলাদেশ।

    • নমস্কার এবং সেই সাথে ধন্যবাদ, আমরা ওয়েবসাইটের লিঙ্কগুলি আপডেট করেছি তাই আমাদের পুরাতন লিঙ্কগুলি কাজ করছে না। আপনি আমাদের ওয়েবসাইটের সার্চে অপশনে সার্চ করলে আপনি আমাদের পুরাতন পোস্টগুলি খুঁজে পাবেন।

      টিম জুমজার্নাল

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here