দুলুহুমারী এবং কল্পনা চাকমা

0
650

জুন ১২, ১৯৯৬, সেদিনটিতে ছিলো বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন। 

এই দিনে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটি জেলার লাল্যাঘোনা (Lallyaghona) গ্রামে কল্পনা চাকমা নামের একজন আদিবাসী নারীকে তার নিজের বাড়ী থেকে ভোর রাতের অন্ধকারে অপহরণ করা হয়। কল্পনা চাকমা পার্বত্য চট্টগ্রাম উইমেন্স ফেডারেশনে (CHT Women’s Federation) সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে কাজ করতেন, এই সংগঠনটি মূলত কাজ করে সেইসব পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী মানুষদের অধিকার এবং নিরাপত্তা নিয়ে, যারা কিনা যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং সমতল থেকে আসা সেটলারদের দ্বারা জোর-জবরদস্তিপূর্বক ভূমিদখল সহ আরো বিভিন্ন নীপিড়নের শিকার হয়ে আসছে। 

কল্পনা চাকমা , Image Courtesy: Shahidul Alam (Kalpana-by-the-bridge)
        

কল্পনা নিজেও এসেছিলেন এক ভুমিহারা উদ্বাস্তু পরিবার থেকে, ১৯৬০ সালে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ বাঁধ (Kaptai hydroelectric dam) গঠনের ফলাফল হিসেবে সৃষ্টি হওয়া প্লাবনে, তার পরিবারকে তাদের ভিটামাটি হারাতে হয়।

কাপ্তাই বাঁধ হতে সৃষ্ট এই প্লাবনে পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় শহর রাঙ্গামাটি সহ এর আশেপাশের বেশ কয়েকটি গ্রাম সম্পূর্ণভাবে পানির নিচে তলিয়ে যায়, যার ফলস্বরূপ পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী মোট জনগোষ্ঠির এক তৃতীয়াংশ ভূমিহারা হয়ে যায়। ভূমিহারা হয় কল্পনার পরিবারের মতন আরো হাজার হাজার আদিবাসী পরিবার।  

পানির নিচে নিজেদের জায়গাজমি সব তলিয়ে যাওয়ার কারনে কল্পনাদের চাষ করার জন্যে আর কোন জায়গা অবশিষ্ট ছিলো না, যার কারণে তার ছয় ভাইয়ের মধ্যে দুই ভাইকে অন্যের জমিতে গিয়ে ভাড়ায় দিনমজুর খাটা লাগতো। তবে এইদিক দিয়ে তার অন্য ভাই-বোনদের থেকে কল্পনা চাকমার ভাগ্য তার দিকে সহায় ছিলো, স্থানীয় বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সহযোগীতায় সে তার নিজের পড়াশোনা চালিয়ে নিয়ে যেতে পেরেছিলো।  

যে সময় তাকে অপহরণ করা হয় তখন কল্পনা বাঘাইছড়ি কাচালং কলেজের (Baghaichari Kachalong College) বিএ পড়ুয়া ছাত্রী ছিলেন এবং সে তখন তার দুই ভাই, ভাইয়ের বউ ও তার বয়স্ক বিধবা মায়ের সাথে একই বাড়িতে বাস করতেন। 

তার গ্রামের পাশে অবস্থিত হোজোছড়ি মিলিটারি ক্যাম্প ( ১৭ ইস্ট বেংগল রেজিমেন্ট) (Kojochari military camp, 17 East Bengal Regiment) থেকে ল্যাফট্যানেন্ট ফেরদৌস কাইসার খানের নেতৃত্বে গঠিত একটি সশস্ত্র দল বন্দুকের মুখে কল্পনাকে অপহরণ করে।

তার মা এবং ভাইয়ের বউদের চোখের সামনে থেকে কল্পনা ও তার দুই ভাইকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয়। এইসময় কল্পনা এবং তার দুই ভাইয়ের হাত দড়ি বেঁধে দেওয়া হয় এবং সেই সাথে কাপড় দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয় তাদের চোখ। তাদেরকে এরপর বাড়ির পাশে এক জলাশয়ে নিয়ে যাওয়া হয়, সেইখানে এক ভাইকে জলাশয়ে হাঁটু সমান পানিতে দাঁড় করিয়ে আদেশ দেওয়া হয় তাকে গুলি করে মেরে ফেলতে। সেই আদেশ শুনে নিজের জীবন বাঁচাতে তার ভাই পানিতে ঝাপ দেয় এবং কোনরকমে অন্ধকারে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এই সময় গুলির শব্দ শুনে তার অন্য ভাইটিও জলাশয়ের পানিতে ঝাঁপ দেয়।

অপহরকারীরা তার দিকেও গুলি করে কিন্তু সেও পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এইসময় কল্পনা তার ভাইদেরকে কেঁদে কেঁদে বলেছিলো-

দা,দা মোরে বাঝা ” , যার বাংলা অনুবাদ  “দাদা,দাদা আমাকে বাঁচাও          

২০০৫ সালে, পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের দ্বারা প্রযোজিত প্রথম পূ্র্ণ্য দৈর্ঘ্য ফিল্ম ‘দুলুহুমারী’ ( Dulu Kumuri ) রিলিজ পায়।[1] এই ফিল্মটি স্থানীয় এক লোককথাকে ভিত্তি করে তৈরি, যেখানে দুলুহুমারী নামের এক যুবতিকে এক চিল অপহরণ করে নিয়ে যায় এবং তার সাত ভাই তাকে চিলের হাত থেকে উদ্ধার করে বাড়িতে ফেরত নিয়ে আসে। যেখানে পার্বত্য চট্টগ্রামকে নিয়ে তৈরি করা ফিল্ম খুবই বিরল সেখানে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী মানুষদের দ্বারা প্রযোজিত আদিবাসীদের নিয়ে তৈরি করা ফিল্ম তো বলতে গেলে অদ্বিতীয়।   

২০০৫ থেকে ২০০৬ এর মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের মোট জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশ এই ফিল্মটি দেখেছে। এই ফিল্মটি  পুরোটাই ঐতিহ্যবাহী জুমকে (jum) সেট হিসেবে ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে। জুম (jum) হচ্ছে পাহাড়ের চাষাবাদের একটি পদ্ধতি যাকে ঘিরে পাহাড়ি জনগোষ্ঠির জীবনযাত্রা। এই পদ্ধতিটি সমতলের চাষাবাদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা যার কারণে বাঙ্গালীরা পাহাড়ের যে ১১টি জনগোষ্ঠী জুমকে নির্ভর করে জীবনযাপন করে সেই ১১টি জনগোষ্ঠির নাম দেয় ‘জুম্ম’ “Jummas”। এই শব্দটি সময়ের সাথে সাথে পরবর্তীতে পাহাড়ে বসবাসকারী ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির জনগোষ্ঠিদের মধ্যেকার একতা ও গর্বের একটি প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

গল্পে দুলুহুমারী ছিলো পরিবারের সবচেয়ে কনিষ্ট এবং সবচেয়ে আদরের সদস্য, সে তার সাত ভাই ও ভাইয়ের বউদের নিয়ে পাহাড়ের জুমঘরে থাকতো। ফিল্মটিতে আদিবাসী জনগোষ্ঠিদের আনন্দময় জীবনযাত্রার একটি অংশকে তুলে ধরা হয়েছে যেখানে তারা পরিবারের সকলে একসাথে বসে ভাগাভাগি করে পাহাড়ের এতিহ্যবাহী খাবার খায়, একসাথে শিকার করতে এবং মাছ ধরতে যায়, অবসরে ঘিলেহেলা ও শামুক হেলা (ghile khaaraa and shaamuk khaaraa) নামের স্থানীয় প্রচলিত খেলা একে অপরের সাথে খেলে ও এতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে উবগীত (ubagiit) গান গায়।   

পাহাড়ের একটি হাসিখুশি আনন্দময় জীবনের চিত্র এইটি, যেখানে দুলুহুমারীর দৈনন্দিন জীবন তার ভাই, বোন, ভাবীদের নিয়ে হাসি ঠাট্টায় কেটে যায়, যে জীবন কিনা বাস্তবের মিলিটারীদের নিপীড়নে ভরা আতঙ্কময় পাহাড়ের জীবনচিত্র থেকে সর্ম্পূণ বিপরীত।     

যখন সাত ভাই ঘর ছেড়ে হাট্টনে (kaartton) যায় ( বাড়ির ছেলেদের গভীর জঙ্গলে গিয়ে বাঁস, কাঠ আর ভেষজ গাছপালা সংগ্রহ করতে জাওয়াকে হাট্টন বলে), তখন দুলু হুমারীর ভাইয়ের বউ একদিন বাড়ির সামনে উঠোনে একটি চিল দেখতে পায়, চিলটির ঠোঁটে ছিল আঙর মাছ (হাঙ্গর মাছ)। সেটা দেখে ভাইয়ের বউ ঠাট্টার ছলে চিলের কাছে আর্জি জানায় আঙর মাছটি তাকে দিয়ে যেতে তার বদলে উঠোনে ঘিলে হেলা খেলায়রত দুলুহুমারীকে নিয়ে যেতে।

কিছুক্ষণ পর সে যখন দুলুহুমারীকে বাড়ির উঠোনে খুঁজতে যায় তাকে সেখানে খুঁজে পায় না। আতংকিত হয়ে দুলুহুমারীর ভাইয়ের বউ পুরো গ্রামে দুলুহুমারীকে খুঁজে বেড়ায় কিন্তু কোথাও তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। সাত ভাই বাড়িতে ফিরলে সে তাদেরকে দুলুহুমারীকে খুঁজতে পাঠায়। অনেক খোঁজাখুঁজি পরও যখন দুলুহুমারীর খোঁজ পাওয়া যায় না তখন সাত ভাই গ্রামের বৈদ্যের কাছে দ্বারস্ত হয়, পরে বৈদ্যের কাছ থেকে খবর নিয়ে জঙ্গলের এক উঁচু গাছের মাথায় বানানো চিলের বাসায় দুলুহুমারীকে খুঁজে পায় তারা।

গাছে উঠার জন্যে সাত ভাই একটা লম্বা মই বানায় এবং সে মই এ করে দুলুহুমারীকে তারা উদ্ধার করে। পরে  ভাইয়েরা যখন তাদের বউয়ের সাথে চিলের আঙর মাছ বিনিময়ের কথা জানতে পারে তখন তারা অনেক রেগে গিয়ে তাদের বউকে শাস্তি দিতে যায় কিন্তু দুলুহুমারির মধ্যস্থতায় তারা তাকে মাফ করে দেয় এবং পরে সবাই মিলে তারা সুখে শান্তিতে বাস করতে থাকে।    

পার্বত্য চট্টগ্রামে চোখের আড়ালে ঘটে যাওয়া বহু অপহরণ এবং যৌন নির্যাতনের ঘটনা রয়েছে যেগুলো কখনোই লোকপ্রকাশ্যে আসেনি কিন্তু কল্পনা চাকমার মিলিটারিদের হাতে অপহরণ হওয়ার ঘটনাটি দেশ বিদেশের বহু মানবাধিকার সংস্থা[2] সহ আন্তর্জাতিক পার্লামেন্ট [3] এবং জাতিসঙ্ঘের বিভিন্ন এজেন্সির[4] নজর কাড়ে। বাংলাদেশের জাতীয় সংবাদ সংস্থা যেটি কিনা এর আগে ঘটে যাওয়া পার্বত্য চট্টগ্রামে নারীদের উপর হওয়া যৌন নিপীড়ন ঘটনাগুলোতে সবসময় নিরব ভুমিকা পালন করে আসতো, তারা পর্যন্ত এই ঘটনাটি নিয়ে নিউজ ব্রিফিং করার মাধ্যমে কল্পনা চাকমার অপহরনণের ঘটনাকে লোকসম্মুক্ষে আনতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। এই অপহরণের ঘটনাটি পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসী নারীদের উপর মিলিটারী কর্তৃক নিপীড়নের একটি দৃষ্টান্তমূলক প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায়।

কল্পনা চাকমার অপহরণ নিয়ে পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদন, Photographer: Shahidul Alam, Photo Source: Flickr

 

আমি যখন দুলুহুমারী ফিল্মের পরিচালক তরুণ চাকমার সাথে কথা বলি [5] তখন তিনি বলেন তার ফিল্মটি কোন রাজনৈতিক বার্তা বহন করে না।  

তবুও যারা এই ফিল্মটি দেখেছে তাদের মনে নিজের অজান্তে বারে বারে ফিল্মটি দেখার সময় দুলহুমারীর সাথে কল্পনার সাদৃশ্য ধরা দিয়েছে আর ফিল্মের শেষে দুলহুমারীর সাথে তার ভাইয়ের পূর্নমিলনের আনন্দময় সমাপ্তি ঘটলেও সেটির সাথে বাস্তবের কল্পনা চাকমার অসমাধিত অপহরণের ঘটনার মধ্যেকার তুলনা তাদের মনে আঘাত হানে।    

এই ফিল্মটি আদিবাসীদের মধ্যে চার দশক ধরে চলে আসা সংস্কৃতিকে কোনভাবে বিকৃ্ত না করে তাদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্রকে সুস্থভাবে তুলে ধরেছে এবং সেই সাথে ফিল্মটিতে তুলে ধরা পাহাড়ে বসবাস করা আদিবাসীদের সুখী জীবনযাত্রার চিত্রপট বর্তমানের পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসীদের উপরে মিলিটারী এবং সেটলারদের নিপীড়ন ও ভূমিদখলের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদী প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পাহাড়ের ভূমিদখলের আগ্রাসনে আদিবাসী নারীরাই মূলত সবচেয়ে বেশি নিপীড়নের লক্ষবস্তু হয়ে থাকে। কিন্তু তবুও এর বিপরীতে পাহাড়ের  সংস্কৃতির পুনরূত্থানে নারী এবং তাদের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, যা কিনা চরম দুঃসময়ের মাঝেও পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ভিন্ন ভিন্ন আদিবাসী  জনগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক একটি একতার মেলবন্ধন হিসেবে সবসময় কাজ করে এসেছে।     


লেখাটি মূলত Indigenous Women and Culture in the Colonized Chittagong Hill Tracts of Bangladesh by Kabita Chakma and Glen Hill এর একাংশ।

কল্পনা চাকমাকে নিয়ে ফটোগ্রাফার শহীদুল আলমের ছবি প্রদর্শনীর ছবির লিঙ্কঃ https://bit.ly/2WOZ581


[1] আরো বিস্তারিত জানতে পড়ুন, কবিতা চাকমা এবং গ্লেন হিলের লেখা জার্নাল অফ দ্য অরিয়েন্টাল সোসাইটি অভ অস্ট্রেলিয়া ( Journal of the Oriental Society of Australia (JOSA) 39-40 (2007-2008): 250-63)  তে প্রকাশিত  “Post-Nationalist Histories Within the Walls of Nationalism: The Case of Indigenous Peoples of the Chittagong Hill Tracts of Bangladesh,”   

[2] Amnesty International, AI Index: ASA 13/07/96, Bangladesh: Kalpana Chakma (f), aged

23, indigenous rights activist, July 1, 1996, and AI Index: ASA 13/09/96, further information

on UA 162/96 (ASA 13/07/96, July 1, 1996), August 28, 1996; two leaflets by Ain O Salis

Kendra (ASK) of Bangladesh: ASK Appeal June 24, 1996, and ASK Appeal for Action,

Abduction of Hill Women’s Federation Leader—Recent Developments, July 18, 1996.

[3] European Parliament, DOC_EN\RE\311\311501, G.1, October 23, 1996; Australian

Hansard, October 2, 1997, 7434, http://www.aph.gov.au/hansard/senate/dailys/ds021097.pdf.

[4] Radhika Coomaraswamy, special rapporteur on violence against women, its causes and consequences, Commission on Human Rights, Fifty-Third Session, E/CN.4/1997/47/Add. 4, page 2, January 30, 1997; Australian Red Cross, letter No. TR/330/98 275 dated 26.5.98 and letter No. TR/330/99/ 2341/C dated 24.2.99.

[5]     কবিতা চাকমার সাথে পরিচালক তরুণ চাকমার সাক্ষাৎকার, ২৫ই অক্টোবর, ২০০৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here