দাঁড়ভাঙা কাঁকড়ার গল্প

0
57

সেদিন সন্ধ্যায় যে বড় ভাইয়ের বাসায় থাকি তিনি কয়েক কেজি ইয়া বড় বড় (জ্যান্ত) কাঁকড়া নিয়ে আসলেন বাজার থেকে। কাঁকড়া, তার উপরে এত্ত বড় বড় সাইজের দেখে ভাবলাম খাওয়াটা বেশ ভালই জমবে। যারা কাঁকড়া খান না তাদের বলে রাখি আপনার এখানে ঘেন্নায় মুখটা বাকা না করলেও চলবে! মনে রাখবেন কাঁকড়া খাওয়াটা খুবই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার আর পৃথিবীর খুবই সুস্বাদু, পুষ্টিকর এবং মোটামুটি দামী খাবারগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে কাঁকড়া। তবে আমার এই গল্প ঠিক কাঁকড়া খাওয়ার গল্প নয়।

যাই হোক, বড়ভাই সেই কাঁকড়াগুলোর অর্ধেক ‘সাইজ’ করলেন গরম পানি দিয়ে পরিষ্কার করে, ব্রাশ দিয়ে মেজে। সাথে ভাঙলেন তাদের শক্তিশালি দাঁড়দুটি আর সূচালো পাগুলো। আর বাকি অর্ধেক কাঁকড়া তিনি রেখে দিলেন একটা বড় হাঁড়ির মাঝে পানি দিয়ে যাতে করে পরের দিন আরেকবেলা টাটকা কাঁকড়া রান্না করে ভোজন সেরে নেওয়া যায়। সেই হাঁড়িটা তিনি ঢেকে রাখলেন একটা ঢাকনি দিয়ে যার উপড়ে দিলেন পাথরের তৈরি ভারী একটা ‘কইজ্যে’ (যাকে বাংলায় সম্ভবত হামানদিস্তা বলে)। তো বড় ভাইয়ের মাখা মাখা করে রান্না করা (মারাত্মক!) ঝাল ভূনা কাঁকড়া তরকারি দিয়ে তৃপ্তি সহকারে রাতের খাবার খেলাম আর ফ্লোরে পাতা বিছানায় দিলাম সুখনিদ্রা। আহ!

Freedom, Freedom, Freedom…!!!

পরদিন ভোর প্রায় ছয়টা সাড়ে ছয়টা বাজে হঠাত ঘুম ভেঙে গেল। আমার ঘুম সাধারণত ভাঙে এর দুয়েকঘন্টা পর। সেই আধো ঘুম আধা জাগা অবস্থায় পাশ ফিরলাম আর হঠাত হাতখানা শক্ত কোন কিছুতে বারি খেল। তখন আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় আমার মাথার কাছে সিগনাল দিল, কুচ গড়বড় হ্যায়! আমার মোবাইলখানা তো আমি এপাশে রাখিনি, তাহলে এই শক্ত জিনিসখানা কী? তখন আধো জাগা অবস্থা থেকে পূর্ণভাবেই জাগলাম। বাতি জ্বালালাম। মনে মনে যা ভেবেছিলাম তাই! একটা কাঁকড়া। হাঁড়ি-ঢাকনা-কইজ্যের শৃংখল-কারাগার তাকে ধরে রাখতে পারে নি। তার মুক্তির তীব্র আকাঙ্খার কাছে সেই আবু গারাইব কারাগারের বাধা যেন তুচ্ছ। তখন সে তার সর্বোচ্চ শক্তি, মেধা, আর কৌশল প্রয়োগ করে বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে সে তার চূড়ান্ত মুক্তির পথ খুঁজছিল। এমনই মুহূর্তে আমায় দেখে তার সেই মুক্তির স্বপ্ন-সম্ভাবনা যেন ফিকে হয়ে এল। তখন সে তার একখানা দাঁড় পুরোপুরি উঁচু করে আমার দিকে তাক করল। আর আরেকখানা দাঁড় কোনমতে হালকা করে উঁচু করল। তাও তাক করা অবশ্য আমার দিকেই। যেন আমার মত হানাদার-সেটলার আর একটু এগোলেই, তার মুক্তির পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ালেই, তার দাঁড় দু’খানা দিয়ে আমাকে করে দিবে দুই টুকরো। আর আমাকে পরাভূত করতে পারলেই জয়ী হবে তার চূড়ান্ত মুক্তিযুদ্ধে!

Crab
কাঁকড়া, ছবি: Pinterest

কিন্তু আমি তো হানাদার, আমি তো সেটলার! আমি যে রাস্ট্রের মতই শক্তিশালি! ওর দুটা দাঁড় আছে তো আমার আছে চারটা দা। আর দা’য় যদি না কুলোয় আছে চামচ-চিমটার মত কত কত শক্তিশালি অস্ত্র! আর তার সাথে আছে আমার গুরুদের দেয়া শিক্ষা কীভাবে একটা কাঁকড়াকে ভাগ করে শাসন করতে হয়। আমি পারি তার দুটো দাঁড়ের একটি ভেঙে আর একটির বিরুদ্ধে লড়াই লাগিয়ে দিতে। একটি দাঁড় ভাঙবে আর একটি দাঁড়কে।

তো, নিয়ে এলাম মোক্ষম একখানা অস্ত্র – বড় একটা কাঠের চামচ। চামচটা ওর কাছে নিতেই তার যে শক্তিশালী দাঁড়খানা আছে সেটি দিয়ে আত্মরক্ষা করতে চাইল (যদিও আমি আমার আধিপত্যবাদী মানসিকতা থেকে তার আত্মরক্ষাকে প্রতিআক্রমণ হিসেবেই নিলাম)। বুঝলাম যে অপর দাঁড়খানা আসলে আহত, এত দুর্বল যে ঠিকমত নাড়াতেই পারছিল না। তার পরও তার মুক্তির তরে তার যা আছে তাই নিয়েই সে ঝাপিয়ে পড়েছিল। তখন আমি আমার মাথার “স্পেশাল ব্রাঞ্চের ইন্টেলিজেন্স” নিয়ে বুঝে নিলাম তাকে বশ করতে কী করতে হবে। আমি কাঠের চামচটা আবারও ওর কাছে নিলাম আর সে তার শক্তিশালী দাঁড়খানা দিয়ে প্রাণপণে আমার চামচটা জাপটে ধরল, সম্ভবত তা গুড়ো করে দেওয়ার কিংবা কেড়ে নেওয়ার জন্য। কিন্তু সেতো জানে না আমার ‘ইন্টেলিজেন্স” কী জিনিস, আমার অস্ত্র কী জিনিস! সে আমার অস্ত্র কেড়ে নিতে গিয়ে বরং আমার পাতা ফাঁদেই পা দিল। তাকে তার দাঁড়খানা দিয়ে আমার অস্ত্রটা (চামচটা) ধরতে দিলাম আর তাকে তুলে নিয়ে আসলাম সে যে আবু গারাইব কারাগার ভেঙে বেড়িয়ে এসেছিল মুক্তির সন্ধানে ঠিক সেইখানে – সেই হাঁড়িতে।

হাঁড়ির উপরে এনে আমি তাকে ঝাঁকি দিয়ে সেই চামচ্টা থেকে ছাড়িয়ে হাঁড়ির মধ্যে রাখতে চাইলাম। কয়েক ঝাঁকি দিলাম। কিন্তু দেখি কাঁকড়াটা পড়ছে না। আর একবার জোর করে ঝাঁকি দিতেই কাঁকড়াটা পড়ে গেল হাঁড়িতে। কিন্তু ভেঙে গেল তার শক্তিশালি দাঁড়খানা। সেই অদম্য সাহসী প্রাণপণ মুক্তির লড়াইয়ে কাঁকড়াটা হারাল তার প্রিয় শক্তিশালী দাঁড়খানা। তো আমার এখন সেই দাঁড়খানা যে চামচটায় আটকে আছে সেটাকে সরানোর পালা। সেটা ছাড়ানোর জন্য দিলাম ঝাঁকি দুই-তিনবার। পড়লো না দেখে আর দু’একবার ঝাঁকি দিলাম। তখনি ঘটল আমার জীবনে দেখা সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ঘটানাগুলোর মধ্যে একটি। সে কাঁকড়াটা তার অবশিষ্ট দাঁড়খানা রয়েছে, যেটি সে নাড়াতেই পারছিল না, সেটি দিয়ে সে হঠাত তার ভেঙে যাওয়া শ্ক্তিশালি দাঁড়টাকে আকড়ে ধরল। প্রাণপণে, একেবারে আক্ষরিক অর্থেই। আমি একেবারে থ’ হয়ে গেলাম। একটু আগে যার সেই দাঁড়খানা নাড়ানোর শক্তিই ছিল না, সে তার বিচ্ছিন্ন দাঁড়টিকে আকড়ে ধরার শক্তি কোথা থেকে পেল? তারপর আর একটা চামচ দিয়ে কোনরকম ভাঙা দাঁড়খানা ছাড়িয়ে দিলাম। তাকে ফিরিয়ে দিলাম তার ভাঙা দাঁড়খানা তারই কাছে। সেই বিচ্ছিন্ন দাঁড় হয়ত আর কোনদিন আর জোড়া লাগবে না। কিন্তু তার দাঁড় তো অন্তত তার কাছেই রয়ে গেল। সেও আকড়ে রইল তার দাঁড়খানা পরম যতনে–বিশ্বাস করুন আর নাই করুন। আমি সেখানে আর থাকলাম না। সেখান থেকে প্রস্থান করলাম এক অদ্ভুদ ধরণের মিশ্র অনুভূতি নিয়ে।

গল্প শেষের গল্প: আমরা, এদেশের আদিবাসীরা প্রাণ হারাই, সম্ভ্রম হারাই, ভূমি হারাই, বসতবাড়ি হারাই, সম্পদ হারাই, সংস্কৃতি হারাই, আত্মপরিচয় হারাই, ভাষা হারাই,… , সর্বোপরি আমাদের মুক্তি হারাই হানাদারদের কাছে, সেটলারদের কাছে, উগ্র সাম্প্রদায়িক-মৌলবাদিদের কাছে, বেনিয়াদের কাছে, কর্পোরেট ব্যাপারীদের কাছে, …, এই রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে। কাঁকড়াদের মত আমাদেরও বিক্রি করা হয় বাজারে, কিনে নিয়ে রান্না করে খাওয়া হয় হরেক রকমের রেসিপি দিয়ে, আর প্রয়োজন হলে বন্দী রাখা হয় নানা ধরণের হাঁড়ি-ঢাকনা-কইজ্যে দিয়ে। আর প্রয়োজনে ভাঙা হয় আমাদের দাঁড়গুলো, লাগিয়ে দেওয়া হয় সেই দাঁড়দের মাঝে ঠোকাঠুকি। ভাঙে দাঁড়, হয় কাঁকড়ার জীবন ছারখার।

আর আমরা যদি আমাদের জীবনটাকে ছারখার করতে না চাই তাহলে বেশি কিছু করার প্রয়োজন না। উপরের গল্পের কাঁকড়াটির মত ভালবাসতে হবে আমাদের প্রতিটি অঙ্গ। আর শক্তিশালী করতে হবে আমাদের দাঁড়গুলো – চিন্তা, চেতনা, বোধ, মেধা, মনন, জ্ঞান, বিজ্ঞান, যুক্তি, সংস্কৃতি… দিয়ে। তবেই যে হানাদার, সেটলার, বেনিয়া, মৌলবাদী-ই আসুক না কেন পারবে না কেরে নিতে আমাদের প্রাণ, আমাদের সম্ভ্রম, আমাদের ভূমি, আমাদের বসতবাড়ি, আমাদের সম্পদ, আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের আত্মপরিচয়, আমাদের ভাষা,… আমাদের মুক্তি।


বাবলু চাকমা (Bob Larma)
আদিবাসী জীবনসংগ্রামের একজন আজীবন ছাত্র
Mohammadpur, Dhaka
December 4, 2013
ইমেইল: babluchakmacht@gmail.com

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here