নতুন প্রজন্মের তরুণদের কাছে একটি খোলা চিঠি

0
65

প্রিয় তরুণ,

আপনি, যিনি এ চিঠি[1] পড়ছেন, এখন বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজে পড়াশুনা করছেন হয়তবা। হতে পারে আপনি ছাত্র ইউনিয়নের সমর্থক বা কর্মী, যে সংগঠনের একটি প্রকাশনার জন্য লেখার আমন্ত্রণ পেয়ে এই চিঠি লিখতে বসেছি আমি অথবা সমমনা অন্য কোনো সংগঠনের অনুসারী, একজন সমাজসচেতন শিক্ষার্থী, বা স্রেফ একজন কৌতুহলী পাঠক। আপনি যেই হোন, আমার শুভেচ্ছা নিন। জীবনের চলার পথে আপনি এখন যে পর্যায়ে আছেন (আমি ধরে নিচ্ছি আপনার বয়স ১৮ থেকে ২৪ বছরের মধ্যে, বা কাছাকাছি কিছু), সেটা আমি নিজে পেরিয়ে এসেছি এক প্রজন্ম আগে। আমি যখন আপনাদের বয়সের তরুণ ছিলাম ১৯৮০’র দশকে, আমি ও আমার সতীর্থরা নিজেদের নিয়ে এবং সমাজ, দেশ ও পৃথিবী নিয়ে, কি ভাবতাম, কি ধরনের স্বপ্ন দেখতাম, সেই কাহিনীর কিয়দংশ বলতে বসেছি এ চিঠির মাধ্যমে।

আপনি নিশ্চয় জানেন, ১৯৮০’র দশকের প্রায় পুরোটা বাংলাদেশে ক্ষমতার শীর্ষপদে অধিষ্ঠিত ছিলেন জেনারেল এরশাদ, শুরুতে দুই-আড়াই বছর নেপথ্যে এবং ১৯৮২ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে। তাঁর শাসনামলের অধিকাংশ সময় আমি অবশ্য ছিলাম আমেরিকায়, যেখানে সৌভাগ্যক্রমে একটা বৃত্তি পেয়ে পড়াশুনা করতে চলে যাই ১৯৮২ সালের আগস্টে। এরপর দেশে ফিরে আসি ১৯৯১ সালের জানুয়ারিতে, জেনারেল এরশাদ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ঠিক পরের মাসে।

খাগড়াছড়ি, ১৯৮৫
বাড়ি থেকে তোলা ছবি, খাগড়াছড়ি, ১৯৮৫, ছবি: প্রশান্ত ত্রিপুরা

তবে আমেরিকায় যাওয়ার আগেকার সময়ের বাইরেও মাঝে ১৯৮৪, ৮৫ ও ৮৬ এই তিন বছর প্রতিবার  গ্রীস্মের ছুটিতে আমি এসেছিলাম দেশে, যেখানে ১৯৮৯ সালেও ছিলাম টানা ৯ মাস। সেই সময়গুলিতে এরশাদের শাসনামলের বেশ কিছু নমুনা নিজের চোখে দেখার সুযোগ হয়েছিল আমার ঢাকায় এবং খাগড়াছড়িতে। উল্লেখ্য, আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা খাগড়াছড়িতে, যেখানে আমার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবনের প্রথম নয়টি বছরও কেটেছিল। পরে মাধ্যমিক পর্বের শেষ এক বছরের পড়াশুনা রাঙ্গামাটিতে সারার পর নতুন অধ্যায় শুরু করি ঢাকাতে, যেখানে উচ্চ মাধ্যমিক পর্ব শেষে একবছর বুয়েটের ছাত্র ছিলাম আমেরিকায় পড়তে যাওয়ার আগ পর্যন্ত। বুয়েটে থাকার সময় আমি ছাত্র ইউনিয়নের একজন সক্রিয় সদস্য হয়ে পড়েছিলাম। সে সূত্রে নিয়মিত বিভিন্ন দলীয় কর্মকান্ডে অংশ নিতে শুরু করেছিলাম, এমনকি আমি যে হলে থাকতাম সেখানকার ছাত্র সংসদের একটি পদে নির্বাচনও করেছিলাম, যখন বিজয়ীদের মধ্যে সর্বাধিক ভোট পেয়েছিলাম আমি! উল্লেখ্য, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে সংশ্লিষ্টতার সুবাদে সেসময় আমার বেশ ভালো একটা পরিচিতি গড়ে উঠতে শুরু করেছিল বুয়েটে। যেমন, আন্তঃহল সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় আমার একটা কবিতা প্রথম হয়েছিল তখন। ‘কর্ণফুলী’ নামের সেই কবিতার কিছু অংশ এখানে তুলে ধরা যেতে পারে:[2]

সেদিন সাঁঝে সেই মেয়েটি
চুপি চুপি বললো আমায়
বুকের কিছু সুপ্ত কথা

[…]

এইতো সেদিন চলতে নাকি
আপন মনে সেই মেয়েটি,
ফুলগুলো সব পড়তো নাকি
বুকের উপর ঝরে ঝরে।
কত কথাই বললো আমায়
সে সব দিনের হাজার কথা।
বললো শেষে ডুক্‌রে কেঁদে –
বন্দিনী সে।

কবিতাটার মান যাই হোক না কেন, আমি সেটার অংশবিশেষ তুলে ধরলাম আমার নিজের মধ্যে যে আকারে ইতিহাসবোধ গড়ে উঠছিল, তার একটা নমুনা তুলে ধরার উদ্দেশ্যে। উপরে উল্লেখ করা শিরোনাম ও উদ্ধৃতাংশের চিত্রকল্প থেকে আপনার নিশ্চয় বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না যে, আমার এই কবিতার বিষয়বস্তু ছিল কাপ্তাই বাঁধ, যেটি ঠিক আমারই সমবয়সী, যদি বাঁধের কাজ সমাপ্ত হওয়ার সময়টা থেকে সেটির বয়স হিসাব করি।

Pakistan Constitution 1962 Stamp
Pakistan Constitution 1962 Stamp

উল্লেখ্য, আমার জন্মের বছর ১৯৬২ সালে, পাকিস্তানে চলছিল সামরিক শাসন, তবে সে বছরই সামরিক শাসকরা সাময়িকভাবে ক্ষমতা থেকে সরে গিয়েছিলেন নতুন একটি সংবিধান প্রবর্তনের পর। সেই সংবিধানে পাহাড়িদের জন্য সংরক্ষিত এলাকা হিসাবে ব্রিটিশ আমল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের যে বিশেষ প্রশাসনিক মর্যাদা ছিল, তা তুলে নেওয়া হয়। সে বছরই আবার মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা নামের এক তরুণ রাঙামাটিতে একটা ছাত্র সম্মেলন করেছিলেন, যিনি পরে কাপ্তাই বাঁধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে কারারুদ্ধ হন।

Kaptai Dam, 1965
কাপ্তাই বাঁধ, ছবি: উইকিপিডিয়া

পুরো উপমহাদেশের প্রেক্ষিতে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ১৯৬২ সালে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘটনা ঘটেছিল। যেমন: চীন ও ভারতের মধ্যে একটা যুদ্ধ হয়েছিল এবং দেখা গিয়েছিল কিউবা মিসাইল সংকট, যখন মার্কিন-সোভিয়েত দ্বন্দ্বের একটা বিশেষ পর্যায়ে পারমাণবিক বোমার হামলাসম্বলিত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বেঁধে যেতে পারত, এমন পরিস্থতির উদ্ভব ঘটেছিল। এদিকে সে বছরই বর্ণবাদ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে গিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকাতে কারাবরণ করেন নেলসন ম্যান্ডেলা। ঘটনাক্রমে আমার জন্মের বছরটা ছিল সি রাইট মিল্‌স নামের একজন মার্কিন সমাজ বিজ্ঞানীর মৃত্যুর বছরও। তাঁর কথা এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করলাম এজন্য যে, আমি আমেরিকায় অধ্যয়নকালে যেসব অধ্যাপকের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে এসেছিলাম, তাঁদের কয়েকজনের উপর তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক প্রভাব ছিল এবং সে সূত্রে তিনি আমার চিন্তাভাবনাকেও প্রভাবিত করেছিলেন, যার প্রতিফলন এই চিঠিতেও রয়েছে। কি আকারে তা আছে, সেটা খুলেই বলি। সি রাইট মিল্‌স ছিলেন ‘তরুণ কার্ল মার্ক্স’-এর একজন অনুরাগী ও অনুসারী, যাঁর বেশ কিছু গ্রন্থ এখনো আমেরিকার সমাজবিজ্ঞানী মহলে সমাদৃত। এগুলির একটি হল দ্য সোশিওলজিক্যাল ইমাজিনেশন,[3] যে বইয়ে তিনি পাঠকদের উদ্বুদ্ধ করেছিলেন নিজেদের ব্যক্তিজীবন ও সামষ্টিক ইতিহাসের সন্ধিস্থলে চোখ রাখার মাধ্যমে সমাজকে বোঝার কল্পনাশক্তি অর্জনের ব্যাপারে। একটা উদাহরণ দিয়ে বলা যাক তিনি কি বোঝাতে চেয়েছিলেন। ধরুন আপনি একজন বেকার তরুণ, অথবা দারিদ্র্যের কষাঘাতে পিষ্ট একজন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী। আপনি যে সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, সেটাকে আপনি একান্তই ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সমস্যা হিসাবে দেখতে ও উপলব্ধি করতে পারেন। কিন্তু আপনি যদি বেকারত্ব বা দারিদ্র্যের গতিপ্রকৃতিকে বৃহত্তর সামাজিক-ঐতিহাসিক প্রবণতার আলোকে দেখতে শেখেন, তখন ব্যক্তি ও সমষ্টির মধ্যেকার যোগসূত্রকে আরো ভালো করে অনুধাবন করবেন, আপনার মধ্যে সঞ্চারিত হবে সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি। এরকম বিবেচনা থেকেই আমিও নিজের অভিজ্ঞতা ও স্মৃতি নির্ভর এই লেখার মাধ্যমে আপনাদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করছি আপনাদের জন্মের আগেকার কিছু বৃহত্তর প্রবণতার ছবি।

Cuban missile crisis
Cuban missile crisis

এবার আবার ফিরে যাই আমার ঢাকার সংক্ষিপ্ত ছাত্রজীবনে, যার দু’বছর উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে কেটেছিল রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুলে, খুবই শৃঙ্খলাবদ্ধ একটা পরিবেশে। পড়াশুনায় আমি ভালোই ছিলাম, তবে বিজ্ঞানের ছাত্র হলেও শখের সাহিত্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে আমার যে ঝোঁক ছিল আগে থেকেই, তা নিজের মত করে ধরে রেখেছিলাম হোস্টেল-বন্দী জীবনেও। তখন আমার মধ্যে কাজ করত একটা পিছুটান, ফেলে আসা সময় ও স্থানের জন্য একটা কাতরতা, যা খুঁজে পাওয়া যায় সেসময় কবিতার আকারে টুকে রাখা আমার বিভিন্ন স্মৃতিচিহ্নে। এরকম একটি কবিতা হল ১৯৭৯ সালে ঢাকায় বসে লেখা ‘ওপার’, যার অংশবিশেষ আমি অরণ্য থেকে অন্তর্জালে, রাঙা মাটির পথ থেকে রাজপথে: আদিম অন্যতার জমিন শিরোনামের একটা নিবন্ধে উল্লেখ করে এ প্রসঙ্গে লিখেছিলাম,[4]

যে সময় আমি কবিতাটা লিখেছিলাম, তখন আমার জীবনের লক্ষ্য ছিল ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার, এই দুটি  ভূমিকার মধ্যে একটিকে বেছে নেওয়া, যেভাবে সময় ও পরিপার্শ্ব ঠিক করে দিয়েছিল। সে অনুযায়ী উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে বুয়েটে ঢুকলাম তড়িৎ প্রকৌশলী হওয়ার চিন্তায়। সেখানে একটা ছাত্র সংগঠনে যোগ দিয়ে সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে হুঙ্কার [দিয়ে মিছিল করা], রাত জেগে পোস্টার লেখা, ইত্যাদি কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার পর হঠাৎ করে পেয়ে গেলাম একটা বৃত্তি, তাও আবার এমন একটা দেশে, যেটির কালো হাত গুঁড়িয়ে দেওয়ার কথা বলে স্লোগান দিতাম! আমি যে দল করতাম, সেই দলের নেতা … এ নিয়ে ভীষণ ক্ষুন্ন হয়েছিলেন।

এখানে কোন নেতার কথা বলা হয়েছে, সে প্রসঙ্গে আসছি চিঠির শেষ অংশে। তার আগে অন্যান্য প্রসঙ্গ একটু আলাপ করে নেই। আপনারা নিশ্চয় জানেন, বহু ত্যাগের মিনিময়ে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও এ দেশে প্রায় শুরু থেকেই রাজনৈতিক অস্থিরতা, সাধারণ মানুষের আর্থসামাজিক সংগ্রাম এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ লেগেই ছিল। তারপর ১৯৭৫-এর পটপরিবর্তনের পর ঘটেছে অভ্যুত্থান ও পাল্টা-অভ্যুত্থনের বহু ঘটনা, যেসবের ফলশ্রুতিতে দীর্ঘ পঁচিশ বছর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সেনা শাসনের মধ্য দিয়ে গিয়েছে দেশটি। এই দীর্ঘ সময়কালে সারাদেশের বহু মানুষ নানা ধরণের আত্মত্যাগ, আপোষ ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গেছে, তবে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের পাহাড়ি জনগণের উপর যে ধরনের দুর্যোগ নেমে আসে, তা প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগীরা ছাড়া অন্যরা কেউ কল্পনাও করতে পারবে না। সেই ইতিহাস বর্ণনা করতে গেলে আমার এই চিঠি দীর্ঘ এক গ্রন্থে পরিণত হবে। আমরা সেই বৃত্তান্তে যাব না, তবে আমি বিশ্বাস করি আপনি বিভিন্ন সূত্রে কিছুটা হলেও জেনেছেন সে ইতিহাস, আর যদি কোনো কারণে না জেনে থাকেন, তাহলে বলব, সেটা আপনার জানা উচিত। কারণ পার্বত্য চট্টগ্রামে এ যাবত যা ঘটেছে, ঘটছে সেগুলি বিশ্লেষণ করলে একটা জাতি-রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশের চরিত্রের এমন কিছু রূপ ফুটে ওঠে, যেগুলি নিয়ে আপনার আমার সবার চিন্তিত হওয়ার কারণ আছে, প্রয়োজন আছে সেগুলিকে পাল্টে দেওয়ার উপায় খোঁজার, সে অনুযায়ী কাজ করার।

যাহোক, ১৯৭০-এর দশকের শেষদিক থেকে শুরু করে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়িদের উপর যে ধরনের চরম বৈষম্যমূলক আচরণ রাষ্ট্রীয়ভাবে করা হয়েছে, সে সম্পর্কে একটা ধারণা আমি আপনাকে দেওয়ার চেষ্টা করব ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে। আপনার কি বিশ্বাস হবে ঢাকায় উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থী থাকা অবস্থায় একবার বাবার সাথে বাড়ি ফেরার পথে রাঙ্গামাটি থেকে মহালছড়িগামী একটা লঞ্চে আমি শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হয়েছিলাম একটা সরকারি বাহিনীর একজন প্রতিনিধির হাতে! তিনি অযাচিতভাবে আমাকে বিভিন্ন প্রশ্ন করতে গিয়ে এক পর্যায়ে তাঁর করা একটা আপত্তিকর মন্তব্যের প্রতিবাদ করাতে আমাকে সেই লাঞ্ছনা সহ্য করতে হয়েছিল। কিন্তু শুধু তাতেই তিনি ক্ষান্ত হননি, আমাকে গুলি করার হুমকি দিয়ে টেনেহিঁচড়ে লঞ্চের নিচের অংশে নিতে শুরু করেছিলেন, তখন হৈ চৈ শুনে কেবিনে বসা আমার বাবা বেরিয়ে আসেন সেই বাহিনীরই একজন কর্মকর্তাসহ। বাবাও ছিলেন একজন সরকারি কর্মকর্তা, তিনি নিজের পরিচয় দিয়ে আমাকে সরিয়ে নেন আর কোনো কথা বলতে না দিয়ে আমিও বাড়তি কোনো লাঞ্ছনা বা আঘাত থেকে বেঁচে যাই সে যাত্রা, কিন্তু সেদিনের অপমান এখনো বুকে বয়ে বেড়াই। শারীরিক লাঞ্ছনা ছাড়াও পথেঘাটে নানাভাবে অপমানিত ও নিগৃহীত হওয়ার নিয়মিত বিভিন্ন ঘটনাতো ছিলই। এগুলির মধ্যে একটা খুব সাধারণ ঘটনা ছিল, চেকপোস্টে বাস থামিয়ে সশস্ত্র সেনাদের ঘোষণা, ‘উপজাতি যারা আছেন সবাই নামেন’, এরপর তাদের জেরা করা হত একে একে, এরকম কত কি। তবে এসবের চাইতেও তিক্ত ও চরম বেদনাদায়ক বিভিন্ন স্মৃতি আছে অগণিত পাহাড়ি নারী-পুরুষের। বড় ধরনের নির্যাতন ও আগ্রাসনের বহু ঘটনা যখন ব্যাপক আকারে ঘটতে শুরু করে, আমি বেশিরভাগ সময় ছিলাম ঢাকায় বা দেশের বাইরে। দূর থেকে এসব শুনে আমার প্রাণ কাঁদত, কখনো বা মনের ক্ষোভ ও হতাশার কথা লিখতাম কবিতার আকারে। যেমন, বুয়েটে পড়া অবস্থায় ১৯৮১ সালে ত্রিপুরাদের কাছে ‘গুমতি হারুঙ (গোমতী উপত্যকা)’ নামে পরিচিত একটা এলাকায় সংঘটিত হামলায় বহু মানুষের প্রাণহানির খবর শুনে আমি ঢাকায় বসে ত্রিপুরা ভাষায় একটা কবিতা লিখেছিলাম, যেটির নিজের করা বাংলা অনুবাদ থেকে প্রথম ও শেষের কিছু পংক্তি এখানে তুলে দেওয়া হলঃ

উঁচু পর্বতচূড়ায় উঠে তাকিয়ে দেখ –
দূরে ধোঁয়ায় ছেয়ে আছে গুমতি উপত্যকা।
চেঙ্গীর কোলে থাকা নারীপুরুষেরা
যেনবা দুঃস্বপ্নের ঘোরে মাঝরাতে জেগে দেখে –
রক্তের মত লাল হয়ে উঠেছে দিগন্তের আকাশ।

[…]

আকাশে বাতাসে সবখানে শুধু
একটা বুকফাটা চীৎকারই ভেসে বেড়ায় –
আর কতদিন চোখের জল ঝরিয়ে
শুধু বসে বসে তাকিয়ে দেখব?

একই ধরনের বিষয়কে মাথায় রেখে আরেকটা কবিতা, বাংলায়, আমি লিখেছিলাম ১৯৮১ আলের অক্টোবরে। ‘সুখ’ নামের সেই কবিতা থেকে, যা এ যাবত কোথাও প্রকাশ করিনি আমি, কিছু অংশ এখানে তুলে ধরছি:’

কিছুই পারেনি দিতে সুখের সন্ধান।
ঘুরেছি অনেক।
[…]
কোথাও দু’দণ্ড বসতে পারেনি যাযাবর মন।

গোমতীর বুকে রক্ত কেন
দূরন্ত চেঙ্গী সে জবাব দেয় নি।

[…]

তাহলে সুখ কোথায়?
এ প্রশ্নই করেছি আমি
আমারই বুকে তাক করা
আর্মি অফিসারের হাতের ঝকঝকে অস্ত্রটাকে।

তপ্ত বুলেট যখন আমার হৃদ্‌পিণ্ড পেরুচ্ছিল
তখন চীৎকার করে বলেছি আমি আবারো,
সুখ তুমি কোথায়?

মৃত্যুর ঠিক পূর্বমুহূর্তে বুঝেছি
পরজন্মে আবারো সুখের সন্ধান করতে হবে,
হাতে থাকবে ঘাতক অস্ত্রটাই।

কাব্যিক কল্পনায় হাতে অস্ত্র তুলে নিলেও, বাস্তবে অবশ্য কখনো তা করার কথা সেভাবে ভাবি নি আমি, যদিও আমার সহপাঠী থেকে শিক্ষক অনেককেই দেখেছিলাম সে পথে পা বাড়াতে। এই অবস্থাতেই, ১৯৮২ সালে, অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবে পেয়ে যাই আমেরিকায় পড়তে যাওয়ার একটা বৃত্তি,[5] যার বদৌলতে কম্পিউটার বিজ্ঞানী হওয়ার ঘোষিত লক্ষ্য নিয়ে আমি চলে যাই আমেরিকায়। কিন্তু দু’বছরের মাথাতেই কিভাবে যেন আমি নৃবিজ্ঞান পড়তে শুরু করি, এবং ১৯৮৬ সালে যখন আমি আমার বিভাগীয় পর্যায়ের কমেন্সমেন্ট অনুষ্ঠানে একজন নির্ধারিত বক্তা হিসাবে কথা বলার সুযোগ পাই, তখন আমি পার্বত্য চট্টগ্রামের কথা উল্লেখ করে একই বিষয়ে উচ্চতর পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে আমার অন্তর্দ্বন্দ্বের কথা প্রকাশ করেছিলাম। ‘পড়াশুনা করে কি অন্যায় থামাতে পারবে তুমি?’ নিজের ভেতরের এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে আমি শরণাপন্ন হয়েছিলাম এক কবির, যার কথাটা বাংলায় সহজ করে বললে অনেকটা এরকম দাঁড়ায়, “যারা কোনো কিছু বোঝার চেষ্টা করে, তারাও ইশ্বরের (বা মানবতার) সেবা করে।”[6] অস্ত্র দিয়ে যে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়, এই বিশ্বাসের ভিত্তিতে আমি যে অস্ত্রের বদলে কলমই হাতে তুলে নিয়েছিলাম চিরতরে, সে ঘোষণাই আমি একভাবে দিয়েছিলাম সেদিন – নিজের কাছে, অন্যদের সামনে। সেই বিশ্বাস আমার এখনো আছে, এবং সেই ধারাবাহিকতাতেই আপনার কাছে এই চিঠি লিখতে বসেছি। অবশ্য যা ভেবেছিলাম, চিঠিটা তার চেয়ে অনেক বেশি লম্বা হয়ে গেছে এর মধ্যেই। আমার হাতে সময়ও নেই আর। যেসব কথা বলব বলে ভেবেছিলাম, তার মধ্যে আছে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ বা প্রজন্ম চত্বরের কথা। এসব কথা অন্যত্র, একটা ইংরেজি নিবন্ধের মাধ্যমে, কিছুটা বলেছি ইতোমধ্যে, চাইলে আপনি সেটা দেখে নিতে পারেন।[7] বা প্রয়োজনে আমি পরে আবার লিখব।

তবে শেষ করার আগে আপনার উদ্দেশ্যে কয়েকটি কথা বলে যেতে চাই। আমি যেসময় আমেরিকা থেকে দেশে স্থায়ীভাবে ফিরে আসি, তখন আপনার হয়ত জন্ম হয়নি। আমার নিজের একটা গ্লানি ছিল, আমার তারুণ্যের একটা বড় অংশ পুরো আশির দশক দেশে জেনারেল এরশাদের শাসন আর বৈশ্বিকভাবে রিগ্যান ও থ্যাচারের মত ডানপন্থী নেতাদের ছায়াতে কাটাতে হয়েছিল। ওদিকে মাঝপথে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেছে, ধ্বসে পড়েছিল বার্লিন দেওয়াল, যেগুলির ব্যাপারে আরো অনেকের মতই আমার মনেও অনেক প্রশ্ন ছিল। তবে দেশে ফেরার আগে বন্দীদশা থেকে মুক্ত নেলসন ম্যান্ডেলাকে স্বচক্ষে দেখেছিলাম সান ফ্রান্সিস্কোর একটা বিশাল জনসমাবেশে, যাতে অংশ নিতে পেরে মনে হয়েছিল, সুন্দর একটা বিশ্বের যে স্বপ্ন সারা দুনিয়ার বহু মানুষ দেখে, আমরা নিশ্চয় সে পথেই আছি। এদিকে ১৯৯১ সালে দেশে ফেরার পর কাগজে কলমে গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন দেখে আশাবাদী হয়েছিলাম, হয়ত বাস্তবেও তা অনেকখানিই ঘটবে, গোটা দেশে যেমন, তেমনি পার্বত্য চট্টগ্রামেও। কিন্তু এসবতো আপনা থেকেই হওয়ার কথা নয়। জনগণের একটা বড় অংশের দাবি, আকাঙ্ক্ষা ও প্রয়াস এক জায়গায় মিললেই কেবল তা সম্ভব। এক্ষেত্রে আপনারা যারা তরুণ আছেন, আপনাদের প্রতি আশার দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল গোটা বাংলাদেশ দু’বছর আগে যখন শাহবাগের সেই অভূতপূর্ব জাগরণ দেখা গিয়েছিল। এর মধ্যে আবার গত বছর একটা বহুল বিতর্কিত ও আলোচিত নির্বাচন হয়ে গেছে, যার জের ধরে দেশে এখনো গভীর রাজনৈতিক সংকট চলছে। আমি জানি না আপনি সেই নির্বাচনে ভোট দিতে চেয়েছিলেন বা পেরেছিলেন কিনা। যদি ভোট দিয়ে থাকেন, সেটা হয়তবা ছিল বাংলাদেশের নাগরিক হিসাবে আপনার প্রথম ভোটাধিকার প্রয়োগের অভিজ্ঞতা। কিন্তু ভোট দিয়ে থাকুন বা নাই দিয়ে থাকুন, একটা কথা নিশ্চয় আপনিও ভালো করেই বুঝে গেছেন, নির্বাচন – সেটা যদি অবাধ, সুষ্ঠু, স্বচ্ছও হয় – গণতন্ত্রের একটা ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। যে ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত, তার থেকে আমরা এখনো বহুদূরে। কিন্তু লক্ষ্যে পৌঁছানোর চেষ্টা আমাদের করতেই হবে, এবং এক্ষেত্রে সকল ধরনের সহিংস পন্থা এড়িয়ে, সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকেই, আমাদের খুঁজে নিতে হবে সামনে আগানোর পথ। আর এ কাজে আপনারা, তরুণরাই, সত্যিকার অর্থেই আমাদের চূড়ান্ত ভরসা। আপনারা যাঁরা নতুন একটা বাংলাদেশের কথা ভাবছেন, সে লক্ষ্যে কাজ করছেন, আপনাদের প্রতি আমার একটা বিশেষ অনুরোধ – ‘উপজাতীয়’, ‘ক্ষুদ্র’ ইত্যাদি অবমাননাকর অভিধায় ভূষিত জনগণও যেন মর্যাদাজনক পরিচয়ে এই প্রক্রিয়ায় শামিল হতে পারে, সেদিকে খেয়াল রাখবেন, আপনি ব্যক্তিগতভাবে এসব বর্গে নিজে পড়েন বা না পড়েন।

শেষ করার আগে আবার ফিরে যাই আমার বুয়েটের দিনগুলিতে। আমি আমেরিকায় বৃত্তি নিয়ে যাব শুনে একজন ছাত্রনেতা ক্ষুন্ন হয়েছিলেন বলে উল্লেখ করেছি উপরে এক জায়গায়। সেই ছাত্র নেতার নাম আপনি শুনেছেন কিনা জানি না। তিনি ছিলেন খন্দকার ফারুক আহমেদ – যিনি ছিলেন আমাদের সময়কার ইউকসুর জনপ্রিয় ভিপি ও ছাত্র ইউনিয়ন নেতা এবং যিনি পরে হয়ে উঠেছিলেন স্বৈরাচারবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একজন অন্যতম সংগঠক। আমি আমেরিকা থেকে দেশে ফেরার পর তাঁর সাথে আর আমার কখনো দেখা হয়নি। আমার আশা ছিল, তাঁর সাথে কোথাও দেখা হবে, এবং দেখা হলে আমি কিছু কথা বলব তাঁকে, এবং আমিও তাঁর কথা শুনব। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠে নি, এবং কোনোদিন হবেও না। কারণ গত বছর, ২০১৪ সালের জুনে, তিনি চলে গেছেন পৃথিবী ছেড়ে। আজ এই চিঠি লিখতে বসে তাঁর কথা বিশেষভাবে মনে পড়ছে, কারণ আজকের দিনটা (১৪ই ফেব্রুয়ারি) ‘ভালোবাসা দিবস’ হিসাবে উদযাপিত হলেও এটি ‘স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’ও বটে। চিঠিটা শুরু করার পর ফারুক ভাই সম্পর্কে গুগলে একটু অনুসন্ধান করতেই অন্যান্য ফলাফলের মধ্যে পেয়ে গেলাম নিচের তথ্য:

১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি শহীদ জয়নালের লাশ নিজের কাঁধে বহন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হলে পুলিশের থাবা থেকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করছিলেন একজন দীর্ঘদেহী সুদর্শন যুবক। তিনি আর কেউ নন, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের তৎকালীন সভাপতি, ইউকসু’র ভিপি খ ম ফারুক, যিনি ছিলেন স্বৈরাচারবিরোধী ছাত্র-গণআন্দোলনের অন্যতম মস্তিষ্ক।[8]

Noor Hossain Postage
Noor Hossain Postage

যে সময়ের কথা হচ্ছে, তখন বাংলাদেশে ‘ভালোবাসা দিবস’ নামে কোনো কিছুর অস্তিত্ব ছিল না। কিন্তু ফারুক ভাইদের মত মানুষের বুকে দেশের জন্য দশের জন্য ভালোবাসার কোনো কমতি ছিল না। তাঁদের দেখানো পথ ধরেই তাঁর অনুজ তরুণেরা অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন জেনারেল এরশাদকে হটিয়ে ‘গণতন্ত্র’ ফিরিয়ে আনতে। কিন্তু সেই গণতন্ত্রের একি হাল আমরা আজ দেখি? দেশ আজ কোন খাদে? আপনি এবং আপনার মত নতুন প্রজন্মের যে অগণিত তরুণ আছেন, আপনাদের সবার ভালোবাসা জড়ো করে কি এই খাদ থেকে টেনে তোলা যাবে না বাংলাদেশকে?

ইতি,

শুভকামনা ও প্রত্যাশাসহ,

প্রশান্ত ত্রিপুরা

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫


টীকা

জয়ধ্বনি[1] বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সাময়িকী জয়ধ্বনি’র একুশে সংকলনে (২০১৫) প্রথম প্রকাশিত, যেখানে কোনো টীকা ছিল না। উভয় ভাষ্যের মধ্যে সম্পাদনা-সংশ্লিষ্ট আরো কিছু ছোটখাটো পার্থক্য রয়েছে।

[2] আহসানউল্লা হল (উত্তর) ছাত্র সংসদ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত একর্ষিআহসানউল্লাহ হল (উত্তর) বার্ষিকী ১৯৮১-৮২-তে কবিতাটা প্রকাশিত হয়েছিল।

[3] C Wright Mills, The Sociological Imagination, Oxford University Press, 1959.

[4] নিবন্ধটি ব্যক্তিগত ব্লগের বাইরে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল হুচ্‌ নামের একটি কাগজে (৫ম বর্ষ ১ম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০১৪)। এটির একটি সম্পাদিত ভাষ্য ‘আদিম অন্যতার জমিন: বাংলাদেশের শিল্প সাহিত্যে আদিবাসী জীবন’ শিরোনামে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে এই লেখকের বহুজাতির বাংলাদেশ: স্বরূপ অন্বেষণ ও অস্বীকৃতির ইতিহাস নামের একটি গ্রন্থে (সংবেদ, ফেব্রুয়ারি ২০১৫)।

[5] এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, বৃত্তিটা বা আমার বুয়েটে ভর্তি হওয়া কোনোটাই ‘উপজাতীয়’ কোটায় ছিল না। কথাটা বলে নিলাম এই কারণে যে, আমার ‘ত্রিপুরা’ পরিচয়ের কারণে এদেশে অনেকে আমাকে ‘উপজাতীয়’ বা ‘অনগ্রসর’ হিসাবে বিশেষ সুবিধা পাওয়া একজন ব্যক্তি হিসাবে ধরে নেন, এমন অভিজ্ঞতা আমার আছে।

[6] আমার সেই বক্তৃতার মূল ইংরেজি ভাষ্য দেওয়া আছে ব্যক্তিগত ব্লগে

[7] Defining a generation: Making sense of our lives and times, before and beyond Shahbagh, in Opinion, bdnews24.com, March 03, 2013.

[8] বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের যে ওয়েবসাইট থেকে এই উদ্ধৃতি মার্চ ২০১৫-তে নেওয়া হয়েছিল, তা পরে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে একই উদ্ধৃতির অংশবিশেষ bdnews24.com-এ  ২৯-৬-২০১৪ তারিখে প্রকাশিত খ ম ফারুকের মৃত্যুসংবাদ-এ রয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here