তঞ্চঙ্গ্যা রূপকথা – কলাত্থুর কন্যা (কলাবতী কন্যা)

0
68

সেই কবে থেকে আরাকান ‘রোয়াং দেশ’ নামে পরিচিত ছিল। চাকমাদের একটি রোয়াইঙ্গ্যারা (আরাকানীরা) দৈংনাক নামে অভিহিত করে। মারমারাও তাদের ন্যায় দৈংনাকই বলে। এখনো সে দেশে দৈংনাক বলা হয় এবং সে দেশে এখনো দৈংনাক আছে।

একবার একদল দৈংনাক স্বজাতি চাকমাদের অনুসরণ করে ‘আনক’ – (চট্টগ্রামে) চলে আসে। অন্যান্যদের ন্যায় চক্রধন আঙুও আত্মীয় স্বজন এবং তার অনুগত লোকজন নিয়ে আরাকান থেকে এতদঞ্চলে প্রবেশ করে প্রথমে আলীকদমের তৈনছড়ির অববাহিকা এলাকায় বসতি স্থাপন করে। (রোয়াং দেশ থেকে ‘আনক’ বা চট্টগ্রাম অঞ্চলে আসার পর, তৈনছড়িতে বসতি স্থাপন এবং কিছুকাল সেখানে অবস্থান করায়, তারা তৈনছর্য্যা বলে পরিচিত লাভ করে।)

তারা সেখান থেকে ক্রমে ক্রমে মাতামুহুরী নদীর অববাহিকা এবং শঙ্খ নদী পার হয়ে ‘বড়গাঙ’ বা কর্ণফুলী নদীর পাড়ে এসে পড়ে। কর্ণফুলীর উজানে অগ্রসর হয়ে, চন্দ্রঘোনার কয়েক মাইল উজানে রাম পাহাড় ও সীতা পাহাড়ে এসে থামে। তখন সেখানে জুমের উপযোগী প্রচুর বনভূমি ছিল। অনেকে সেখানে বসতি গড়ে তোলে। আবার কেউ কেউ কর্ণফুলীর ওপাড়ে ওয়াগ্গা, পূর্বে কাপ্তাই আর রাইংখং নদীর অববাহিকায় ছুড়িয়ে পড়ে। এইসব জায়গাতে তারা বসবাস করতে থাকে। তারা তৈনছড়ি থেকে এসেছে বলে চাকমা রাজার ভূমি অফিসে জুম-তৌজিতে তাদেরকে তৈনছর্য্যা চাকমা নামে তৌজিভুক্ত করা হয়। এই তৈনছর্য্যা শব্দটিই কালক্রমে তৈনচংগ্যায় রূপ লাভ করে বলে কারোর কারোর ধারণা। বর্তমানে তা ‘তঞ্চঙ্গ্যা’ লিখা হয়ে থাকে।

আমরা এবার ‘কলাত্থুর কন্যা’ রূপকথাতে ফিরে যাই। এই কাহিনীটি হলো সেই সময়ের যে সময় তঞ্চঙ্গ্যারা রাম পাহাড়, সীতা পাহাড়ে জুম করত। চক্রধন আঙুর আত্মীয় স্বজন সীতা মোইন বা সীতা পাহাড়েই বসতি স্থাপন করে। তার মেঝো মেয়ে সনামালা বিধবা। সে দ্বিতীয় বিয়ে করেনি। রোয়াঙে কলাডেন নদীর পাড়ে কুমুখ্যাং পাড়ায় তাদের ঘর ছিল। তার বাবা চক্রধন আঙু ও কার দল যখন এতদঞ্চলে আসে, বিধবা সনামালা তার একমাত্র সন্তান পাঁচ বছর বয়সী রাঙাধনকে নিয়ে এখানে আসে। সে তার বাপের পরিবারে থাকে না, রাঙাধনকে নিয়ে পৃথক ঘরে থাকে। তার ভাইয়েরা তার জুমের জন্য গভীর বন-জঙ্গল কেটে দেয়, শুকনো জঙ্গল আগুনে পুড়িয়ে দেয়। সনামালা আধমরা গাছের ডাল-পালা সাফ করে জুমের ক্ষেত তৈরি করে। তার ভাইয়েরাও এতে সাহায্য করে। ক্ষেত তৈরি হলে ধান, তিল, কার্পাস এবং নানান ফসলের বীজ বুনে। ক্ষেতের আগাছা বাছে, ধান পাকলে ধান কেটে ঘরে তোলে। রাঙাধন এখন চৌদ্দ/পনের বছরের তরুণ। সে তার মামাদের সঙ্গে জুমের জঙ্গল কাটা এবং তার মাকে জুমের কাজে একটু আধটু সাহায্য করে। বেশির ভাগ সময় তার খেয়াল খুশি মত এদিক ওদিক ঘুরে ঘুরে সময় কাটায়।

তখন রাম মোইন-সীতা মোইনে বিশাল বিশাল বৃক্ষাদির ফাঁকে ফাঁকে প্রচুর ‘তেল্যাকলার’ (একপ্রকার জংলী কদলী) থোর (মোচা) হতো। এসব দেখতে বেগুনী রঙের, তেলতেলে ও মসৃণ হয়ে থাকে।

সেই সময় রাঙাধনের বয়স চৌদ্দ/পনের বছর। তার তরুণ মনের আকাশে সবে মাত্র রঙধনুর রঙ্গিন আল্পনার আবির্ভাব হচ্ছে। সে তার মামাদের সাথে জুমের জঙ্গল কাটতে যায় এবং অন্যান্য কাজেও যায়। কিন্তু মন দিয়ে কাজ করেনা, করতে চায় না। খেয়াল খুশি মত চলে। কাজ করতে করতে প্রায় সে ‘ছড়া’ বা ঝিরির পাড়ে গিয়ে তেল্যাকলার বনে গিয়ে তেল্যাকলার থোরগুলি চেয়ে দেখে, আর কলা গাছের আগায় পাতায় যে রৌদ্রের ঝলক পড়ে, সেইসব চেয়ে চেয়ে দেখে। কচি কলাপাতা মৃদু সমীরণে দোলে, সূর্যের আলো তাতে আছড়ে পড়ে, ঝিলিক তুলে। রাঙাধন সেই ঝিলিকে মোহিত হয়, আনমনে হেসে ওঠে। মনে মনে বলে, তেল্যাকলার থোর এত সুন্দর কী করে হয়! তার মামতুতো বোন ধংমালা তার চেয়ে দু’বছরের ‍বড়। রাঙাধন তাকে মনে মনে বলে তুলনা করে তেল্যা কলার থোরের সঙ্গে। পিছল বেগুনী রঙের তেলতেলে কলার থোরের যে মায়াময় লাবণ্য, তা ধংমালার মাঝে সে দেখতে পায়। মনে মনে ধংমালাকে তার বৌ কল্পনা করে আনে সে ঘরে। তার মাকে মাঝে মাঝে হঠাৎ জিজ্ঞাস করে – মা, ধংমালা কবে আমাদের ঘরে আসবে? তার মা সনামালা বুঝতে পারে রাঙাধনের মনের বনে যৌবনের ভ্রমর পাখা মেলতে শুরু করেছে। কিন্তু কিছু বলে না, কারণ, ধংমালার সঙ্গে চক্রধন আঙুর আর এক নাতির ‘আইফাই’ (ভালবাসা) চলছে।

এক বছর তরুণ যুবক রাঙাধন তার মামাদের সঙ্গে জঙ্গল কাটতে গেছে। সেদিন সে একটা ঝোপ কাটার পর তার মামাদের থেকে সরে গিয়ে জুমের প্রান্তে ঝিরির পাড়ে চলে এল। এখানে ঘন তেল্যাকলার বন। তখন ফাল্গুন মাস। মনোরম তেল্যাকলার থোরগুলো বাতাসে দোলছে আর সোনালী রোদের ঝিলিক কচি কোমল মোলায়েম মসৃণ কলা পাতায় পড়ে ঝিকমিক করছে। রাঙাধনের চোখ সে দিকে গিয়ে আটকে গেল। থোরের অপরূপ লাবণ্য এবং কচি পাতায় রোদ্রের ঝলকে রাঙাধন পুলকিত হয়ে খিল খিল করে হাসতে লাগল। তখন তার চোখে ধংমালার রূপ লাবণ্য স্পষ্ট প্রতিভাত হতে লাগল। লোভনীয় এই থোর আহরণের জন্য গাছ কাটতে শুরু করে দিল রাঙাধন। চারটা কলা গাছ কাটার পর পঞ্চম কলা গাছে কোপ দিতেই ‍রাঙাধনের কানে এল কোমল নারী কণ্ঠের আবেদন, রাঙাধন, তুমি কলা গাছ কেটে শেষ করলে, আমার থাকবার স্থান নষ্ট করে দিয়েছ। রাঙাধন বিস্ময়াপন্ন হয়ে চকিতে চারদিকে তাকায়, কাউকেও না দেখে প্রশ্ন করল, – “তুমি কোন অচেনা নারী আমার নাম ধরে কথা বললে?” এবার কলাগাছের আগা থেকে রাঙাধন স্পষ্ট শুনতে পেল, – “আমি কলাত্থুর কন্যা”। রাঙাধন সেদিকে তাকিয়ে বিস্ময় বিস্ফোরিত দু’নয়নে দেখতে পেল – থোরের রঙে এক পরমা সুন্দরী ললনা। তার পোশাক পরিচ্ছদ ‘পিনন’ আর ‘খাদি’ কচি কলা পাতার রঙে সাজানো; মোলায়েম, কোমল এবং মসৃণ। রাঙাধন তাকে দেখে যেমন বিস্মিত হল, তেমনি যারপরনাই হল খুশি। এক মুহূর্ত ভেবে মৃদু হেসে বলল, – “আমি তোমাকে চিনি না অথচ তুমি আমাকে চেন, আমার নাম ধরে ডাকলে। তুমি কে বলতো?” কলাত্থুর কন্যা উত্তর দিল – “আমি কলাত্থুর কন্যা। আমি তোমাকে চিনি। কালাডেন গাঙের পাড়ে আমার ঘর। তোমরা এখানে আসার সময় আমার ঘরের সম্মুখ ‍দিয়ে এসেছিলে। আমার এখনো মনে আছে। তুমি আমার থাকার জায়গা নষ্ট করে দিয়েছ। তাই এখন আমাকে তোমার ঘরে নিয়ে যাও”।

Sketch of a Tanchangya Woman
কলাত্থুর কন্যা, ছবি: তঞ্চঙ্গ্যা রূপকথা লোককাহিনী ও কিংবদন্তী

রাঙাধন অতীব আশ্চর্যান্বিত হলেও কলাত্থুর কন্যার এই অনুরোধে দারুণ খুশি হল। কেননা, কলাত্থুর কন্যাকে দেখে সে মোহিত হয়ে গেছে। সিঁড়ি বানিয়ে সে উপরে উঠে কলাত্থুর কন্যাকে এক হাতে বুকে জড়িয়ে ধরে নীচে নামিয়ে আনল। তারপর তার এক হাত ধরে তাকে এনে ঘরের উঠানে নিয়ে এসে তার মাকে ডেকে বলল, “মা, মা, দেখ, আমি কলাত্থুর কন্যাকে বৌ করে এনেছি।”

তখন রাঙাধনের বড় মামা বিষুরাম আর কনিষ্ঠ মামা খুলারাম কাজ করতে করতে দুপুরে ভাত খাওয়ার জন্য ঘরে ওঠে ঘরের ‘চানায়’ (বারান্দায়) বসে আছে। রাঙাধনের মা সনামালা ভাত বেড়ে দিচ্ছে। তারা এক পলক দেখল কলাত্থুর কন্যাকে। দেখে চমকিত হল। কলাত্থুর কন্যা তাদেরকে দেখে ঘরে উঠল না। দৌড়ে কিয়ুদ্দুর গিয়ে বনে আত্মগোপন করল। রাঙাধনের কনিষ্ঠ মামা খুলারাম এখন পূর্ণ যৌবনের অধিকারী। এখনো সে বিয়ে করেনি। রাঙাধনের চেয়ে পাঁচ বছরের বড়। তার বয়োকনিষ্ঠ ভাগিনা রাঙাধন কলাত্থুর কন্যাকে বৌ নিয়ে এসেছে জেনে তার মনে খুব দুঃখ হলো। সে মনের দুঃখে অভিমান করে ভাত খেল না। তার দিদি সনামালা তাকে অনেক বোঝাল। খুলারাম জেদ করে থাকে; না সে ভাত খাবে না। সনামালা বার বার তাকে ভাত খেতে অনুরোধ করল। তবুও ভাত না খেয়ে খুলারাম অভিমান করে বসে রইল।

এইদিকে কলাত্থুর কন্যা সেই যে কলার বনে ঢুকেছে সেই কলার বন থেকে আর বের হচ্ছে না। ভাত খাবার পর খুলারামের বড় ভাই বিষুরাম আরার কাজ করতে জুমে গেল। খুলারাম অনাহারে ঘরে শুয়ে রইল, কাজ করতে গেল না। তার দিদি সনামালা তাকে বুঝিয়ে বলল, “তোমার ভাগিনা বৌকে দেখে তুমি রাগে অভিমানে ভাত খেলে না, লোকে তোমাকে দেখে হাসবে, তোমাকে পাগল বলবে। এসো ভাত খাও।” খুলারাম উত্তর দিল – “দিদি আমি পাগল নই। যারা যুবক অবিবাহিত তারাই আমার দুঃখ বুঝবে। তুমি আমার দুঃখ বুঝবে না। আমি ভাত খেতে পারি, যদি আমার ভাগিনা বৌ কলাত্থুর কন্যা আমাকে ভাত বেড়ে দেয়।” সনামালা বলল, “আচ্ছা।”

এদিকে রাঙাধন সারাক্ষণ ঘরের আশেপাশে, বনে কলাত্থুর কন্যার সন্ধান করল। কিন্তু ব্যর্থ হল। কোনখানে কলাত্থুর কন্যার সন্ধান পেল না। খুলারাম ভাবছে, আহা সে যদি রাঙাধন হত!

দিন শেষ হয়ে গেল। সূর্য অস্তমিত হলে সাঁঝের আঁধার নেমে এল। ফাল্গুনের নির্মল সুনীল আকাশে একটা করে অসংখ্য তারকা মিট মিট করে জ্বলে উঠল। তখন সে আলোয় ঘরের অদূরে বনে বলা গাছের উপরিভাগে কলাত্থুর কন্যাকে দেখা গেল। সনামালা, খুলারাম, রাঙাধন কলাত্থুর কন্যাকে দেখতে লাগল। রাঙাধন চট জলদি দৌঁড়ে গেল কলা গাছের গোড়ায়। কলা গাছের সিঁড়ি বানাতে বানাতে কলাত্থুর কন্যা তাকে বলল, “রাঙাধন, তুমি বদ্ধ ছেলে মানুষ, কলা গাছ কাটছ কেবল। এখন ঘরে যাও আমি আপনা আপনিই আসবো।” এদিকে খুলারাম তার দু’কানে যেন শুনতে পেল কলাত্থুর কন্যা তাকে বলছে, – “খুলারাম, তুমি কেন মনে দুঃখ পেলে। মনের দুঃখে অভিমান করে ভাত খেলে না কেন? তুমি আমাকে কলা গাছের উপর থেকে পেড়ে নিয়ে যাও – আমি তোমাকে ভাত বেড়ে দেব।” বলা বাহুল্য এই কথা শুধু খুলারামই নিজের কানে শুনল। অন্য কেউ শুনতে পেলনা। শুনে খুলারাম খুব খুশি হল। খুলারাম কাউকে কিছু না বলে বনের দিকে অগ্রসর হল।

সে সময় থেকে তঞ্চঙ্গ্যাদের অবিবাহিত পুরুষেরা ভাগিনার নবপরিণীতা বধূকে প্রথম যেদিন দেখে বা সাক্ষাৎ হয়, আকাশে তারকা দেখা না যাওয়া পর্যন্ত তাদের সে দিন ভাত খাওয়ার বিধান নেই। অবিবাহিত যুবকদের সঙ্গে বিবাহিত পুরুষেরাও ভাগিনার নববধূকে প্রথম যেদিন দেখে সেদিন আকাশে তারা দেখা না যাওয়া পর্যন্ত ভাত খাওয়ার নিয়ম নেই।


বীর কুমার তঞ্চঙ্গ্যা

তঞ্চঙ্গ্যা রূপকথা লোককাহিনী ও কিংবদন্তী


পিনন – মহিলাদের নিম্নাঙ্গে পরনের কাপড়।

খাদি – বক্ষবন্ধনী কাপড়।

তেল্যাকলা – একপ্রকার কলা।

কলাত্থুর – কলার মোচা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here