জুমিয়ার একাল-সেকাল

0
67

সময়ের পরিক্রমায় বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় সবকিছুই পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে, ব্যতিক্রম ঘটেনি পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত জুমিয়াদের বেলায়ও। যুগ যুগ ধরে চলতে থাকা জুমিয়া পূর্বপুরুষদের মেনে চলা আচার আচরণ, রীতি ও পদ্ধতি, সমাজব্যবস্থা এবং জীবনাচরণের ধারাবাহিকতা রক্ষায় যেমন ভাঁটা পরেছে তেমনি সংস্কৃতি, ঐতিহ্যেও জোঁয়ার আসেনি। নিজেদের অস্থিত্ব ভুলে আমরা ভাসি আধুনিকতার সমুদ্রে।

একটু সেকালে ফিরে আলোচনা করা যাক অন্তত কিছুক্ষনের জন্য পূর্বপুরুষদের সুখের দিনগুলো অনুভব করা যাবে।

রাঙ্গামাটি জেলাধীন বরকল উপজেলার সুবলং ইউনিয়নের ১নং ধামাইছড়া মৌজার বাজেই চান চাকমাদের গ্রামে শুধু চার (৪) পরিবার লোকের বসবাস ছিল। সে বেশি দিনের কথা নয় ১০০ কি ১৫০ বছর আগের কথা।একান্নবর্ত্তী পরিবার হলেও নিজের সুখের সীমা ছিলনা। নিজ পরিবারের সদস্য তথা গ্রামের সকলের সাথে একে অপরের ভালোবাসা, মায়া-মমতা, বড়দের সম্মান, ছোটদের প্রতি স্নেহ আদর কোনটির কমতি ছিলনা। একে তো অভাব নামের অভিশাপ ছিলনা তাই সুখের বদলে দুঃখের প্রশ্নই ওঠে না। একটা জুম করে দিব্বি পুরা বছর সুখে কাটানো যেত কোন অভাবের তাড়না ছাড়া। এক কথায় স্বাবলম্বী স্বাধীন ছিল জুম্মরা। কিছুটা অন্যের উপর নির্ভরশীল হলেও নিজেদের উপর নির্ভর করে বাঁচা কঠিন ছিল না। কথাগুলো বলছিলেন বাজেই চানের ছোট ছেলে কৃষ্ণমনি চাকমা যার জম্ম ১৯২০ সালের দিকে। তার পূর্ব-পুরুষদের কাছ থেকে শোন আর নিজে প্রত্যক্ষ করা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বলছিলেন তিনি। নিজেদের তৈরি কাপড়-চোপড়, নিত্যব্যবহার্য সামগ্রী তথা যন্ত্রপাতি গর্বের সাথে ব্যবহার করা যেত। বড় বড় ধনী লোকের মত অনেক কিছু না থাকলেও এই অল্প কিছুতেই আমরা সন্তুষ্ট ছিলাম। ঠিকটাক একটা জুম করতে পারলে আর গোটা বছরের জন্য চিন্তা করতে হতনা। জুম থেকে ধানের (ভাত) পাশাপাশি নানান ধরনের সবজি ও ফলমূল উৎপাদন সম্ভব হত। তার মধ্যে সুগুরিগুলো (মিষ্টি কুমড়া), দুব্ হুমুড়ো (কুমড়া), মামমাড়া ও চীনদিরে (ফল জাতীয়), আমিলে, ডুমোরশমি আরো গোচ্চে চারা লাগানো হতো। আরো থাকতো সাবারাং, বাগোর ও পজির মত অনেক সুগন্ধি মসলা জাতীয় পণ্য। এক জুম থেকে ভালো ফলন হলে যে পরিমাণ মিষ্টি কুমড়া পাওয়া যেত তা সারা বছরও খেয়ে শেষ করা যেত না।পাশাপাশি সুতা বা তুলার গাছ লাগানো হতো যেখান থেকে প্রক্রিয়াজাত করে নিজেদের পরিধেয় বস্ত্র বানানো হত। এখানে নিশ্চই সেই বিখ্যাত চাকমা গানের কথা মনে পরে…

“হৈ… হৈ… হৈ… হৈহৈ হৈহৈ জুমোত যেবং
জুমোত যেনে গচ্চি সুদো তুলিবং।

গানের কলিটি শুনলে এখনকার দিনে সকল জুম্মরা কল্পনা করে সেই পিনোন হাদি পরা হবং বান্নে (চাকমাদের পোষাক) সেই জুমিয়া মেয়েটিকে যে কিনা জুম যাবে, জুম থেকে গচ্চে আর সুতা তুলবে বলে মনে মহা খুুশিতে গাইছে। আর বাড়ির পাশে থাকতো নানা শাক সবজির আবাদ যার মধ্যে হুদুগুলো গিল (লাউ শাক) সবার ঘরের চালের উপর প্রায় থাকে, পুজোক শাক গিল (পুঁই শাক) প্রায় সবার ঘরে ঘরে থাকতো। এই লাউ, মিষ্টি কুমড়া, পুঁই শাক সহ ডাটাগুলো জুম্মদের খুবি প্রিয় খাবার তাই শাক বা সবজি খাওয়া শেষ হলে ডাটাও তরকারি হিসেবে বেশ জমে। আর এগুলো গ্রামে সকলে ভাগাভাগি করে খাওয়ার রীতিও দেখাযায়। ছিলোনা জুম চাষ করার মত জায়গার অভাব, পণ্য উৎপাদিত হতো শুধু নিজেদের ব্যবহারের জন্য, কৃষ্ণমনির ভাষায় সেসময় প্রচুর ফলমূল এমনিতেই গাছে পেকে ঝরে যেত খাওয়ার লোক ছিল কম আর কেউ বাজারে নিয়ে বিক্রি করার প্রয়োজনীয়তাও অনুভব করেনি। তাঁর আক্ষেপ বর্তমান যুগে খাওয়ার লোকের অভাব নেই অভাব খাবারের।

সেসময় আমিষের উৎস ছিল বন্য প্রাণী শিকার করা আর ঝিরিতে মাছ-কাঁকড়া ধরা সাথে চিংড়ি, শামুকও ধরা হয়। আশা করি কাঁকড়া মিশিয়ে বাচ্চুরি তোনের স্বাদ সবাই পেয়েছেন। ঝিরিতে মাছ-কাঁকড়া ধরার সত্যতা মিলে সেই বিখ্যাত আরেক গানে….

আয় তুঙঅবি মঅ লগে হাঙাড়া ধরা যেই
ছড়া পার জুম লেজা লুড়ো লবং ধোরে
হাঙাড়া ধরা যেই।

(এসো তুঙবি (আদর করে ঢাকা) আমার সঙ্গে কাঁকড়া ধরতে যাই, ছড়ার পারে, জুমের নীচ ঢালে মোশাল জ্বালিয়ে নিবো, চলো কাঁকড়া ধরতে যাই)

জুমের সাথে যে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক সেটা জুমিয়াদের প্রতিটি গান তথা আচার অনুষ্ঠানই প্রমাণ করে। সেসময় গ্রামের সকলে একে অপরের সুখ-দুঃখের ভাগীদার ছিলেন। জুম থেকে  নতুন ফসল তোলার পর নো-ভাত হানা (বেশি ধান পেলে মুরব্বিদের খাওয়ানোর রীতি, যদিও ছোট বড় সবাই ডাক পায়), বিঝু উৎসব, গ্যাংহুলি শুনা, ঘিলে হারা (চাকমাদের ঐতিহ্যবাহী খেলা) নাদেং হারা (লাটিম), পালাগান শোনা সবকিছু মিলে পুরা গ্রামে দুঃখের লেজমাত্র ছিল না। সবাই মিলে যে আর একটা পরিবার সেটা বোঝার বাকি থাকার কথা নয়। কৃষ্ণমনির ভাষ্য, আমার আমল পর্যন্ত গ্রামে অনেক লোক বেড়েছে, বেড়েছে পারিবারের সংখ্যা তারপরও সুদিনের কমতি হয়নি, দুঃখ শুরু হয় আমার ছেলে মেয়েদের প্রজম্ম থেকে। দেশ ভাগ হয় ধর্মের ভিত্তিতে আমরা পরি মহা সমস্যায়। তার চেয়ে বড় সমস্যা হয় যখন ষাটের দশকে কাপ্তাই বাঁধের ফলে ডুবে যায় আমাদের ঘরবাড়ি জায়গা জমি শুরু হয় দুর্দিনের ঘনঘটা।

তাঁরা নিজেদের গড়া পরিবারের সকল সম্বল ডুবে যেতে দেখেছেন নিজের চোখের সামনে। পাশের মানুষজন অনেকে অনেক দূরে গিয়ে ঘর বেঁধেছেন যেখান পর্যন্ত পানি ওঠেনি সেসব জায়গাতে, অনেকে বা দেশ ত্যাগ করে চলে গেছেন ভারতের মিজোরাম, ত্রিপুরা, অরুণাচলে। আজ অবধি ষাট বছরের কাছাকাছি অতিবাহিত হতে চললেও তাদের শরনার্থী জীবনের ইতি ঘটেনি। না নেয়া হয়েছে ফিরিয়ে আনার কোন উদ্যোগ না দেয়া হয়েছে সেখানকার নাগরিকত্ব তথা নাগরিক অধিকার।

সেদিন কৃষ্ণমনি সহ নৌকাযোগে একটা জায়গায় যাচ্ছিলাম কিছুদূর গিয়ে তিনি ইঙ্গিত করছিলেন এই যে এই পানির নীচ বরাবর আমাদের বাড়ি ছিল ঐখানে ছিল অমুকের ঘর, অমুক বাপের বাড়ি ছিল ঠিক ঐখানটাই। ঐ যে ভিটা সেসময় অনেক জঙ্গল ছিল হরিণ, আর সঙঅরা (বড় ধরনের হরিণ) প্রায় সময় এখানে এসে নাচানাচি করত। আরো অনেক কথা শুনলাম তার কাছ থেকে আনন্দ আর দুখের কথা। তাঁরা ছিলেন অনেক সৎ, কখনো মিথ্যা বলতেন না, বড়দের সম্মান করতেন, নিজেদের মধ্যে কোন বিবাদ ছিলনা, ছিলনা হিংসা-দ্বেষ।

তাঁদের রোগবালাই ছিলনা বললেই চলে কারণ তাঁদের এই অধুনিক যুগের ফরমালিন মিশ্রিত খাবার খেতে হয়নি, ছিলেন সুঠাম দেহের অধিকারী ও বলশালী শুনা যার জুম্মদের মধ্যে অনেক বড় বড় বলি (শক্তিমান লোক) ছিলেন। কথা প্রসঙ্গে না বললেই নয় – এক জুম্ম বলি নাকি রাঙামাটির বাজারে গিয়েছিলেন এবং বাজার শেষ বাড়ি ফিরবেন বলে নৌকাতে উঠেছিলেন সেই মুহুর্তেই নাকি ঢাক-ঢোল পিঠিয়ে এক বাঙালি বলিকে আনা হচ্ছে। জানা গেল বলিটি ময়মনসিংহের এবং সে নাকি চ্যাম্পিয়ন তাই কেউ তাকে ধরতে (মোকাবেলা করতে) রাজি নয়, এদিকে জুম্ম সেই বলি আর ঐ বাঙালি বলিকে পরাজিত না করে যেতে রাজি নয়। যেই কথা সেই কাজ নৌকা থেকে উঠে এসে বাঙালি বলিকে ধরে এক আচার মেরে চলে যান এদিকে সেই ময়মনসিংহ চ্যাম্পিয়ন বাঙালি বলি আর উঠে দাড়াতে পারেনি বলে শুনা যায়। এরকম গৌরবময় আর সুখের দিন ছিল আমাদের জুম্মদের। আজ আমরা সেই সুদিনের চিহ্ন কি পায়? সেদিন ছিলনা স্কুল, কলেজ,বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে তাদের চিন্তা, না ছিল ধর্মের কোন কট্টর রীতি, আজ জুম্মরা আধুনিকতার ছোঁয়া পেয়েছে তারা কিছুতা শিক্ষিত হয়েছে, স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ছে, বড় বড় সরকারি প্রতিষ্ঠানে অনেকে চাকরি করে, ধর্ম করতে শিখেছে কিন্তু লোপ পেয়েছে মানবতার, লোপ পেয়েছে তাদের আদর্শের, জুম্ম স্বকীয়তার। বৃহৎ নৃ-গোষ্ঠীর সংস্পর্শে আজ আমরাও হয়েছি দালাল, হিংসুটে নরপশু, হয়েছি নেশাখোর-মাদকাসক্ত। আজ আধুনিক জুম্মরা তার জাত ভাইকে ঠকাতে দ্ধিধাবোধ করেনা, জাত মা-বোনের প্রতি কুনজর, কু-উক্তি তাদের আর বাঁধেনা। জুম্ম লোকের দেহে আজ হিংসার  ফরমালিন রন্ধ্রে রন্ধ্রে। একজনের ভালো আরেকজনের সহ্য হয়না। জাতির অস্থিত্বের ক্রান্তিলগ্নে আমাদের শুভবুদ্ধির উদয় হয়না, আমরা ভুলে যায় সেই সুদিনের কথা। শিক্ষিত সমাজ আজ আত্নকেনন্দ্রিকতায় ব্যক্তিস্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত সে বৃহৎ স্বার্থ রক্ষার্থে ক্ষুদ্রতম ব্যক্তি স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিতে প্রস্তুত নয়। এদিকে হায়েনারা তাড়িয়ে বেড়ায় এইতো খেয়ে ফেলবে বলে। আমাদের জাতীয় স্বকীয়তা, অস্থিত্বকে সমুন্নত করে রাখতে শত শত জুম্ম বাপ ভাই শহীদ হয়েছেন। আমরা কতটুকু পেরেছি তাদের সেই সম্মান ধরে রাখতে, আমরা কি পেরেছি তাদের যথাযথ মর্যাদা দিতে? নাকি পেরেছি এনে দিতে তাদের সেই চাওয়াকে যার জন্য তারা জীবন উৎসর্গ করেছিলেন? শিক্ষিত সমাজ, ছাত্র সমাজ আজ মুখ তুবড়ে পরেছে তারা হারিয়েছে উদ্যম।

তাহলে কি ফিরে পাবোনা সেই হারিয়ে যাওয়া সুখের সোনালী দিনগুলো? পারবোনা ফিরিয়ে আনতে নিজেদের স্বকীয়তা? কথাই আছে-

সংসার সাগরে দুঃখ তরঙ্গের খেলা
আশা তার একমাত্র ভেলা।

আজ বাজেইচান নেই,নেই তার ছেলে কৃষ্ণমনি নেই তাদের সেই সোনালী রঙিন দিন জুম্মদের বুকে শুধু বেঁচে আশে আশা! তাদের আশা একদিন মাথা উচু করে দাঁড়াবে এই জুমিয়ারা। শত শত বীর শহীদের রক্ত আমাদের শিরায় বহমান একদিন এই শিরার রক্ত উত্তপ্ত হবে, জাগ্রত হবে নির্জীব জুমিয়রা ভাঙবে পরাধীনতা!


লেখকঃ দীপন চাকমা, আইন বিভাগ, রাবি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here