চাকমাদের ‘উং’ শব্দের ইতিকথা

0
103

একজন মানুষের বেঁচে থাকার জন্য দৈনন্দিন জীবনে যা কিছু উপকরণ প্রয়োজন সেই উপকরণ সামগ্রীই আমরা রসায়ন বলি। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা এই উপকরণগুলো রসায়নে বিদ্যমান। আমরা বেঁচে থাকার জন্য ভাত, পানি, দুধ, দই, লবণ, আম কাঠাল, নারিকেল যা কিছু খাই। পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকার জন্য ডিটারজেন্ট পাউডার, সাবান ইত্যাদি ব্যবহার করে থাকি। এইসব উপকরণই রসায়ন। আর এই উপকরণ থেকে যখন যেখানে প্রয়োজন তখন সেখানে ব্যবহার করি। শীতের অনুভব হলে শীতবস্ত্র পরিধান করি, অসুস্থ হলে বড়ি সেবন করি। সুতরাং বেঁচে থাকার জন্য উপরোক্ত সব উপকরণ যদি রসায়ন হয় তাহলে চাকমাদের মধ্যে ব্রত-পূজা চিকিৎসা তন্ত্র মন্ত্র সম্ভারে বিদ্যমান। যেহেতু চাকমা ওঝারা ‘কবচ ও মন্ত্র প্রয়োগ এবং ব্রত-পূজা’ চিকিৎসা করার সময় উং শব্দটি প্রথমে এবং শেষে জপ করেন।

দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের মতানুসারে চোখে যা দৃষ্টিগোচর হয় আকার, আয়তন, ঘনত্ব। আমরা যা খালি চোখে দেখি না তথাপি দূরবীক্ষণ বা বিভিন্ন যন্ত্রের সাহায্যে যা দৃষ্টিগোচর হয় সেগুলোও বস্তু বলি। দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের ফল হল যেমন- টেলিভিশন, উড়োজাহাজ, মোবাইল, কম্পিউটার ইত্যাদি। টিউমারের উপস্থিতি নির্ণয় ও তা নিরাময়ে তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ ব্যবহার করা হয়। নিরাময়ের জন্য কার্বন(৬০) আইসোটোপ থেকে নির্গত গামা রশ্মি নিক্ষেপ করে ক্যান্সার কোষকলাকে ধ্বংস করে হয়। বিজ্ঞানের অনুপস্থিতির সময়ে মানুষরা বিভিন্ন অপদেবতা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য, শত্রু বশ করার জন্য, সুখ, শান্তি কামনায় তন্ত্র মন্ত্রের আগারে আশ্রয় নেয়। সেকালের তন্ত্র মন্ত্রের স্বরূপ বর্তমানে বলতে গেলে যেকোনো জাতির মধ্যে এখনও বিদ্যমান আছে।

চাকমাদের তন্ত্র-মন্ত্র শাস্ত্রে বিজাতীয় তন্ত্র মন্ত্র লক্ষ্য করা যায়। কোন এক জাতের মানুষ জ্ঞান অন্বেষণের জন্য নিজ জাতের সাহিত্যসহ অন্যজাতির সাহিত্য অবশ্যই অধ্যয়ন করবে যেন তা জ্ঞান আরো বেশি তীক্ষ্ম হয়। যেমন- আমাদের দেশের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সাথে অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জনের জন্য পাঠাগার বিভিন্ন দেশের বইয়ের সমাহার। অনুরূপ জানতে হবে চাকমাদের তন্ত্র-মন্ত্র শাস্ত্রে বিজাতীয় তন্ত্র-মন্ত্র থাকার ফলস্বরূপ। বিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গিতে এই তন্ত্র-মন্ত্র বিধান কিছুই না। অবশ্য একজন ইতিহাসবিদের এগুলো দরকারী এবং প্রয়োজনীয়। কারণ জাতির পরিচিতি নির্ণয়ের ক্ষেত্রে সেই জাতির সংস্কৃতি অবশ্যই জানা প্রয়োজন। যেমন, একটা মন্ত্রের উদাহরণ: ‘নমঃ নমঃ পরমেশ্বরী পরমেশ্বর মা দুর্গা দক্ষ রাজার জী তুই মহা সতীনারী ডাগঙর মুই তরে গভীর করি, আয় আয় মা সর্বজীবের মা তুমি”। এই মন্ত্রের মধ্য দিয়ে বুঝা যায় তথাগত সম্যক সম্বুদ্ধ আবির্ভুত হবার পূর্বে চাকমারা নিজ মাতৃভাষায় দুর্গাপূজা করতেন। শুধু এই মন্ত্র না, দুর্গাপূজা করতে  যে সমস্ত মন্ত্রের প্রয়োজন সেই  মন্ত্রগুলো চাকমাদের তন্ত্র-মন্ত্র শাস্ত্রে আছে।

বুদ্ধের সমসাময়িক বিখ্যাত দুজন ব্রাহ্মণের বৌদ্ধসাহিত্যে পরিচয় পাওয়া যায়। তারা হলেন ব্রাহ্মণ সোনদত্ত এবং ব্রাহ্মণ কূটদন্ড। এই দুই জন ব্রাহ্মণের সূত্রে মেলে গৌতমবুদ্ধের পিতামাতা এবং তাদের পূর্ব পুরুষগণ উচ্চ কুলীন বংশজাত ছিলেন। সোনদন্ড ও কূটদন্ড – র্দীঘ নিকায়- এ আমাদের প্রমাণ করে দেয়। সোনদন্ড ও কুটদন্ড এই দুইজন ব্যক্তি পরিচয় অনুসারে বুদ্ধধর্ম আবির্ভূত হবার র্পূবে শাক্যজাতিরা (চাকমার) ব্রাক্ষন ধর্ম পালন করতেন। সেই হিসাবে চাকমারা তৎকালীন সময়ে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম অনুসারী ছিলেন। এটাও একটা চাকমা জাতিদের উৎকৃষ্ট প্রমাণ। তাছাড়াও চাকমা জাতির ইতিহাসে রাধামন ধনপুদি পালাতে দৃষ্টি দিলে পাওয়া যায়। রাধামন ধনপুদি পালাতে চাকমা জাতিরা ব্রাহ্মণ্য ধর্ম পালন করতেন তার নিদর্শন এই-

সাজের গাবুরে ব-কাদি

সিদুগা মানুষ্যন অজাদি

চুমা কাবিন্যায় পানি খেই

তারার কারত্তুন পৈদা নেই

দুধে খাদি সিজেদং,

পৈদা বারাত গরি আমি সিদু বেরেদং।

 

অর্থাৎ, আরাকান লোকেরা অনুন্নত তাদের পৈতা ছিল না বলে আমরা জল পান করতাম না। আমরা দুধের দ্বারা অন্ন পাক করতাম আর পৈতা কাঁধে বেড়াইতাম। এটাও উৎকৃষ্ট প্রমাণের দলিল স্বরূপ। শুধু এই কাব্যতে না চাকমা জাতির প্রাচীন সাহিত্যে আমরা দেখতে পাই। ব্রত-পূজা হোক বা কবচ মন্ত্র প্রয়োগ হোক উভয় ক্ষেত্রে চাকমা ওঝারা ‘উং’ শব্দটি জপ করেন। ‘উং’ শব্দটি হল পঞ্চভূত। অগ্নি, বায়ু, জল, আকার এবং পানি এই উপাদানগুলিকে পঞ্চভূত বলে। এই উপাদান ছাড়া কোন প্রানীর জন্ম হবার লক্ষণ নাই। সর্বজীব পঞ্চভূতের সাথে মিশিয়ে যায়। পঞ্চভূত ‘উং’ শব্দকে পরিচালনা করে। ‘উং’ শব্দটি পরিচালনা করে ব্রক্ষা, বিঞ্চু এবং শিব এই তিনজনকে। ব্রক্ষা, বিঞ্চু এবং শিব নির্দেশ করে ১৬ (ষোল)টি কার্য কারণ তাৎপর্যকে। তাৎপর্যগুলো হল: ১) চন্দ্র ২) পক্ষ ৩) নেত্র ৪) বেদ ৫) বাণ ৬) রিতু ৭) সমুদ্র ৮) বসু ৯) গ্রহ ১০) দিক ১১) অশ্বিনী কুমার ১২) রাশি ১৩) টেরা ১৪) বনবাস ১৫) পেয়ো এবং ১৬) কেলা। কোন ব্যক্তি এই ষোলটি তাৎপর্য থেকে যে কোন একটার দোষ হলে তখন সেই ব্যক্তি অসুস্থ হবে। যেন অসুস্থ হতে সুস্থ হয়, সুস্থতেই সুস্থ থাকে সেজন্য উং কার শব্দটি জপ করা হয়। চাকমাদের বর্ণ পিজপূজ আ এর নিচে একটান দিলে উ হয়। এই উ দিয়ে ‘উং’ লিখলে মন্ত্রের গুন থাকে না। তথাপি বচ্চি উ দিয়ে উং লিখলে মন্ত্রের গুন থাকে। বচ্চি উ দিয়ে ‘উং’ লেখার সময় উ এর নিচে দুইটান এবং উ এর উপরে চন্দ্রবিন্দু দিতে হয়। মূলত সেই চন্দ্র বিন্দু চাঁদ হিসেবে পরিগণিত হয়। চাঁদটা দেয়ার তাৎপর্যও আছে। সুতরাং চাকমাদের ‘উং’ কার শব্দটি এক অক্ষরের চিন্ময় অক্ষর। সনাতন ধর্মের ওঁ শব্দটি সম্পর্কে শ্রীমদ্ভাগবদগীতার প্রথম অধ্যায় ১৭ নম্বর শ্লোকে বর্ণনা আছে। শ্লোকটি নিন্মরুপ:

অভ্যসেস্মনসা শুদ্ধং ত্রিবৃদব্রক্ষাক্ষরং পরম্

মনো যচ্ছেজ্জিতশ্বাসো ব্রক্ষবীজমবিস্মরণ ।।১৭

 

অর্থাৎ ওঁ কার বা প্রণব হচ্ছে চিন্ময় বা উপলব্ধির বীজ। ত্রিবৃদব্রক্ষাক্ষরণং বলতে তিনটা চিন্ময় অক্ষর অ-উ-ম বা ওহম। ওঁ কার হচ্ছে বিশেষ এক সম্বোধন, যেমন- ‘হে ভগবান’। ওঁ হরি। ওঁ মানে হচ্ছে ‘হে আমার প্রভু’। কোন এক অভিজ্ঞ মহাযোগী ওঁ কার জপের ফলে বিষয়াসক্ত মনকে বশীভূত করা যায়। তাই মনের অভ্যাস পরিবর্তনের জন্য এই ওঁ কার শব্দটি হচ্ছে উত্তম পন্থা। ওঁ কার সমস্ত চিন্ময় ধ্বনির বীজ এবং একমাত্র চিন্ময় ধ্বনিই মন ও ইন্দ্রিয়গুলো পরিবর্তন করতে পারে। শুধু সেটা না উম্মাদ ব্যক্তিকেই ওঁ কারের চিন্ময় ধ্বনির জপের দ্বারা চিকিৎসা করার ফলে সুস্থ করা যায়। সেজন্য শ্রীম্ভাগবদগীতায় ওঁ কারকে পরম সত্যের অখন্ডন প্রত্যক্ষ এবং আক্ষরিক অভিব্যক্তি বলে স্বীকার করা হয়েছে। ভগবানের দিব্য নাম ভগবান থেকে অভিন্ন। তেমনই ওঁ কারও ভগবান থেকে অভিন্ন।

সনাতন ধর্মের ওঁ কার শব্দটি স্বয়ং পরমেশ্বর ভগবান বা সৃষ্টির স্রষ্টাকে নির্দেশ করে। সনাতন ধর্মের আদি ধর্ম গ্রন্থ বেদ। বেদ এর একটি অংশ ঋক বেদ। ঋক বেদে মোট ১০,৪৭২টি মন্ত্র এবং ১,০২৮টি সুক্ত রয়েছে। সুক্ত বলতে একই দেবতার উদ্দেশ্যে রচিত মন্ত্রসমূহকে বুঝায়। যেমন ইন্দ্রকে প্রশংসা করে একটি রকে বলা হয়েছে:

ইন্দ্রং বয়ং মহাধন

ইন্দ্রমর্বে হবামহে

যুজং বৃত্রেষু বজ্রিণম ।।

 

অর্থাৎ ইন্দ্র আমাদের সহায়। শত্রুদের কাছে বজ্রধারী। আমরা অনেক সম্পদের জন্য কিংবা অল্প সম্পদের জন্য ইন্দ্রকে আহবান করি। ওঁ কার একাধারে শক্তি এবং শক্তিমান। অর্থাৎ পরমেশ্বর ভগবানই শক্তিমান। পরমেশ্বর ভগবান শক্তিমান হওয়ার সত্ত্বেও ইন্দ্রকে প্রশংসা করা হয়েছে। পক্ষান্তরে চাকমাদের ‘উং’ শব্দটি স্রষ্টার সহিত সৃষ্টকর্তা, পালনকর্তা, সংহারকর্তা যথাক্রমে ব্রক্ষা, বিঞ্চু, শিব এবং ১৬টি কার্যকরণের তাৎপর্য। চাকমা জাতির চিন্ময় অক্ষর ‘উং’ কার শব্দ থেকে অভিন্ন। সতীশ চন্দ্র ঘোষ মহাশয় তাঁর ‘চাকমা জাতি’ গ্রন্থের ২১০ পৃষ্ঠায় দেখিয়েছেন চাকমা ওঝারা মন্ত্র পড়ার আগে হুঁ হুঁ করে জপ করে। যা অতি রঞ্জিত ছাড়া কিছুই না। মূলত নির্দেশনা, পরিচালনা হতে চাকমা জাতির ‘উং’ এবং হিন্দুদের ওঁ কার উচ্চারণগত দিক দিয়ে এক বা অভিন্ন নয়, ভিন্ন।


লেখক: সুমঙ্গল চাকমা, পানছড়ি, খাগড়াছড়ি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here