চাকমা সমাজের যত পূজা পার্বণ (পর্ব – ১)

0
75

ভূমিকা 

চাকমা সমাজে কোন শিশু ভূমিষ্ট হলে তার জন্মে কোন শাঁখ বাজেনা, উলুধ্বনি উঠেনা, কোন প্রকার মাঙ্গলিক অনুষ্টানই তার জন্মে অপেক্ষা করা থাকেনা। শুধু যখন নবজাতকের নাভি ঝরে যায় তখন একটা অনুষ্টান পালন করা হয়ে থাকে, যার মাধ্যমে নবজাতকসহ প্রসূতি পরিশুদ্ধি হয়ে হেঁসেলে ঢোকার অনুমতি পায়। এ অনুষ্টানের নাম ‘কজই পানি লনাহ্’। চাকমা বিশ্বাসমতে সন্তান প্রসবের পর প্রসূতির এক ধরণের অশুচিতা জন্মে, সে জন্যেই এই অনুষ্টান। এ উপলক্ষ্যে দু-একজন লোককে খাওয়ানো হয়ে থাকে। শিশুর নামকরণেও কোন আনুষ্ঠানিকতার বালাই নেই। বর্তমান শিক্ষিত সমাজের কথা বাদ দিলে, গ্রামের সাধরণ গৃহস্থ মা, বাপ, বুড়ো, জ্যেঠা যার যা খুশি একটা ডাকতে ডাকতেই শিশুর চলনসই একটা নাম হয়ে যায়। কারো কারো পোশাকী নামও অবশ্য একটা থাকে। বিশেষতঃ পাঠশালায় যারা যায়, শিক্ষক মহাশয়ের হাতেই তার নামকরণ ঘটে। এভাবে একজন চাকমা শিশু জন্মের পর থেকে সরল অনাড়ম্বর পারিপার্শ্বিকতার মধ্যে বেরে উঠতে থাকে। ছেলে হোক মেয়ে হোক সমাজে কিন্তু সব শিশুদের সমান কদর।

ভিন্ন সমাজে শিশুর জন্মলগ্ন থেকে অন্নপ্রাসন, নামকরণ ইত্যাদি একটা পর একটা উৎসব লেগেই থাকে; সেক্ষেত্রে চাকমা সমাজে অনুরুপ অনুষ্টানাদির অনুপস্থিতি স্বভাবতই চাকমা সমাজ ব্যবস্থা সম্পর্কে একটা বিসদৃশ ধারনা জন্মে। আরো মজার কথা, চাকমাদের মধ্যে নৃত্যগীত সমন্বিত কোন জাতীয় উৎসবেরই প্রচলন নেই। জাতীয় নৃত্যতো নেই বললেই চলে। গানের মধ্যও কয়েকটা সুরের সন্ধান পাওয়া যায়; যেমন, ‘অলি’ অর্থাৎ ঘুমপাড়ানী গান, উভোগীত, *গেংখুলীদের পালাগানের সুর ইত্যাদি। এসব কিছুর পেছনে কারণ কিন্তু একটাই। ব্রিটিশ শাসনাধীনে আসার আগ পর্যন্ত কয়েক শতাব্দীকাল চাকমারা বিরুপ পারিপার্শ্বিকতার টানা পোড়নে ইতস্ততঃ ভ্রাম্যমান জীবন যাপন করতে বাধ্য হয়। এই সময় দক্ষিণে মগ এবং পূর্ব দিক থেকে লুসাই উপজাতির ক্রমাগত হামলার মুখে তাদের একরূপ পালিয়ে বেড়াতে হয়। তাই নন্দন সংস্কৃতি বলতে যা’ বোঝায় চাকমাদের মধ্যে তা গড়ে উঠার সময় এবং সুযোগ কোনটাই ছিলনা। এ সময়ে রচিত একটা ছড়ার মধ্য তৎকালীন চাকমাদের সুরবস্থার একটা সম্যক ধারণা পাওয়া যায় –

‘ঘরত গেলে মঘে পায়,

ঝারত গেলে বাঘে খায়।

মঘে ন পেলে বাঘে পায়,

বাঘে ন পেলে মঘে পায়।

 

ঘরে গেলে মঘে পায়, ঝারে অর্থাৎ জঙ্গলে গেলে বাঘে খায়। মঘে না পায় তো বাঘে পায়, বাঘে না পায় তো মঘে পায়।

 

আর লুসাইয়ের উপদ্রব তো বঙ্গে বর্গীয় হাঙ্গামার মতো ‘কুগী ডর’ অর্থাৎ কুকীর ভয় নামে আজো কিংবদন্তী হয়ে আছে। এমনকি ব্রিটিশ আসার পরও এদের হামলার কোন কমতি ছিলনা। কথিত আছে, লুসাইরা একরাত্রে বাইশ মৌজার উপড় হামলা চালায়, যার ফলে বর্তমান নানিয়াচর উপজেলাধীন বড়াদম সাকিনের নীলাচন্দ্র দেওয়ান নামক জৈনক পুলিশ অফিসারের পিতাসহ অসংখ্য চাকমা নিহত হয়। বৃটিশ গভর্নমেন্ট তখন ব্যপক অভিযান চালিয়ে এদের দমন করেন।

চাকমারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী, সে কারণে চাকমাদের অধিকাংশ আচার অনুষ্ঠান পুরোপুরি বৌদ্ধধর্মভিত্তিক। এমনকি মৃত সৎকার এবং শ্রাদ্ধাদি অনুষ্ঠানেও ধর্মীয় প্রভাব সুস্পষ্ট। তবে এমন কিছু আচার অনুষ্টানও বেশ কয়েকটা দেখা যায়, যেগুলি বৌদ্ধ আদর্শের পরিপন্থী। এর কারণ সম্ভবতঃ এই যে এককালে ধর্মের অবনতির যুগে বৌদ্ধধর্ম হিন্দুদের তান্ত্রিক মতবাদের সাথে মিশে তন্ত্রযান, মন্ত্রযান, বজ্রযান ইত্যাদি নানা বিকৃত ধর্মের রুপ নেয়, আর সেই সঙ্গে হিন্দুদের বহুু দেবদেবী ও হিন্দু আচার অনুষ্ঠান এই ধর্মে অনুপ্রবেশ করে। চাকমা ভাষায় গাঙ্, গঙা, গঙ্গি ইত্যাদি শব্দ নদী অর্থে বুঝায়। আর চাকমাদের জল দেবীর নামও গঙা। এইসব শব্দ নিঃসন্দেহে গঙ্গানদী এবং হিন্দুদের গঙ্গাদেবীকে নির্দেশ করে। হিন্দু ভাবধারার সাথে সম্পৃক্ত যে সব পূজা-পার্বণ চাকমা সমাজে অনুষ্ঠিত হতে দেখা যায়, তার প্রায় সবগুলোতেই গঙা বা গঙ্গাদেবীর স্থান সর্বোচ্চ। এসব পূজায় পশুপাখি বলি দেওয়ার বিধান আছে। এতে মনে হয়, চাকমারা এক কালে বোধ হয় গঙ্গার তীরবর্তী বা গঙ্গার কাছাকাছি কোন স্থানে বসবাস করতো। বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রামে অন্য কোন উপজাতির মধ্য কিন্তু নদীকে গাঙ, গঙা অথবা গঙ্গি বলা হয় না। এ বিষয়ে চাকমাদের মধ্যে একটা কিংবদন্তী প্রচলিত আছে যে, চাকমারা ক্ষত্রিয় এবং নেপালের শাক্যদেরই একটা দলছুট গোষ্ঠী। রাজা বিড়ুঢূকের শাক্য নিধনের সময় কিংবা পরবর্তীতে বৌদ্ধ বিতাড়ন কালে নেপাল ছেড়ে হিমালয়ের পাদদেশ ধরে ক্রমে ক্রমে আসাম হয়ে এখানে এসে পড়েছে। কথাটায় বোধহয় অনেকাংশে সত্য নিহিত রয়েছে। এখানে অপ্রাসঙ্গিক হলেও একটা ব্যাপার বিশেষ উল্লেখযোগ্য। ঢাকায় অনুষ্ঠিত প্রথম সার্ক সম্মেলন চলাকালে বাংলাদেশ টেলিভিশন থেকে একটা নেপালী ডকুমেন্টারী ফিল্ম সম্প্রচার করা হয়েছিল। কাহিনীর মুখ্য বিষয় বস্তু ছিল নেপালী জাতীয় বিচার পদ্ধতি। ছবিতে অপরাধীকে যেই যেই দণ্ড দেওয়া হয়েছিল বলে দেখানো হয়েছে যেমন, দোষী ব্যক্তির মাথার চুল তিন ফালি করে কেটে দেওয়া, শুয়োরের খাঁচা কাঁধে নিয়ে ঢেঁড়া পিটিয়ে গ্রামের ঘরে ঘরে গিয়ে নিজের নিজের অপরাধের কাহিনী বলতে বাধ্য করা, ইত্যাদি সবই চাকমা জাতীয় বিচারে প্রযোজ্য দণ্ডের মতোই হুুবহু এক। তফাতের মধ্যে শুধু চাকমা অপরাধীকে এখন এখানে মুরগী খাঁচা গলায় ঝুলানো বিধি। তবে সামাজিক খানার জন্য শুয়োর দণ্ড দেওয়া তার পক্ষে অপরিহার্য। 

চাকমা সমাজে যে সব পূজা অনুষ্ঠান প্রচিলত আছে, তার মধ্য অনেকগুলিই মানসিক পূজা। যেমন অহ্হিয়া, আহ্জার বাত্তি, চামনী, চুমুলাং, ধর্মকাম, সিন্দি ইত্যাদি। বিপদে পড়লে প্রায় সবধর্মের লোকই বিপদ উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য হরহামেশা কিছু না কিছু মানত করে থাকে। বিপদ কেটে গেলে তারপর একসময় মানত শোধ করে। অনেকে পান তামাকও মানত করে এবং বিপদ কেটে না যাওয়া পর্যন্ত এসব জিনিস স্পর্শ করেনা। এটা এরকমের ব্রতপালন। বৌদ্ধধর্মে এটাকে ‘শীলব্রত পরামর্শ’ বলে। এখানে চাকমাদের পাশাপাশি বহুদিন ধরে যদিও আরো বহু বিভিন্ন উপজাতি বসবাস চলছে, তাদের পূজা পার্বণের সাথে কিন্তু চাকমাদের আচার অনুষ্ঠানাদির খুব কমই মিল দেখা যায়। মালক্ষী মা পূজা এবং থানমানা পূজা এই দুটি মাত্র অনুষ্ঠানে ত্রিপুরা সস্প্রদায়ের সাথে কিছুটা মিল থাকলেও পূজা পদ্ধতিতে অনেক পার্থক্য রয়েছে। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্য সার্বজনীন বিঝু উৎসব রূপেই পালিত হয়ে থাকে।

জাতির দুর্দিনে ধর্মেরও অবনতি ঘটে, এটা স্বাভাবিক। এমনি অন্ধকার যুগেরই সাক্ষ্য বহন করে চাকমা সমাজের পুরানো দিনের বৌদ্ধ পুরোহিতেরা, যাদের বলা হয় ‘রুরি’ বা ‘লুরি’। এই শব্দটা বোধহয় মধ্যযুগের রাউল বা রাউলী শব্দ থেকে এসেছে বয়োবৃদ্ধরা এদের আহ্বান করে থাকেন ‘থর্’ বলে, যেটা খুব সম্ভব পালি ‘থের’ অর্থাৎ স্থবির শব্দের অপভ্রংশ। এরা মাথা মুড়োয়, পীত বসন পরে কাছা দিয়ে। কথিত আছে, সেই বৌদ্ধ বিতারণের যুগে প্রাণভয়ে পলায়নের সময় বৌদ্ধভিক্ষুরা দ্রুত গমনের সুবিধার্থে কাছা দিতে বাধ্য হয়; আর তখন থেকেই এদের মধ্যে কাছা দিয়ে চীবর পরিধান করা চালু হয়ে যায়। ব্রহ্মচর্য এদের জন্য অপরিহার্য নয়। এরা বিয়ে করে সংসারী হতে পারে। অনেকে শুধু প্রয়োজনের সময় কাছায় ধারণ করে গৃহস্থ বাড়ী গিয়ে পূজাপাঠ সমাধা করে দিয়ে আসে। এদের ব্যবহার্য একমাত্র প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ ‘আঘরতারা’ চাকমাদের নিজস্ব বর্ণমালায় লিখিত। এখানে বিশেষ উল্লেখযোগ্য যে, সেই দূর অতীতে চম্পক নগরের যুবরাজ বিজয়গিরি যখন রাজ্য জয়ে বের হয়েছিলেন তখনও চাকমাদের মধ্যে লেখাপড়ার চর্চা ছিল এবং শিক্ষাদীক্ষার প্রতি তাদের যথেষ্ট আগ্রহ ছিল এরূপ প্রমাণ পাওয়া যায়। অভিযান যখন শেষ অর্থাৎ আরাকানের সমুদ্র উপকূল পর্যন্ত যখন চাকমাদের জয় করা হয়ে গেছে সেই সময়কার গৃহ প্রত্যাগমনোন্মূখ সৈন্যদের গানে আছে –

“পোর্ব্বুরা পন্দিত নেই যে দেজত,

থেদং নয় ভেইলক সে দেজত।

যেই যেই ভেইলক ফিরি যেই,

সাপ্রেই কুলত্ ফিরি যেই।”

 

পড়ুয়া পন্ডিত নেই যে দেশে, থাকবোনা ভাইসব সে দেশে। চল চল ভাইসব ফিরে যাই, সাপ্রেই কুলে ফিরে যাই।

 

বিশেষ লক্ষ্যণীয় যে, শিক্ষার প্রতি এতো অনুরাগ এতো আকুলতা খুব কম জাতিতেই দেখা যায়।

আঘরতারা বৌদ্ধ সূত্র পিটকের অন্তর্গত কয়েকটা সূত্রের সমষ্টি মাত্র। ভাষা বিকৃত পালি এবং দুর্বোধ্য। চাকমাদের প্রচলিত কিংবদন্তী মতে এটা হওয়াই স্বাভাবিক। দেশত্যাগ কালেই আঘরতারা সঙ্গে আনা হয়েছিলো এবং সুদীর্ঘ কাল ধরে এর পুনঃ পুনঃ অনুলিখন এর বিকৃতি ঘটার কারণ। অনেকে মনে করেন, চাকমাদের ব্রহ্মদেশ, আরাকান ইত্যাদি জায়গায় এসেই বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করে; কিন্তু সেক্ষেত্রে চাকমা ভাষার সঙ্গে সেসব দেশীয় ভাষার কিছু না কিছু ঘটা ছিল অনিবার্য। আশ্চর্যের বিষয় যে চাকমা ভাষায় ক্যং, স্বং, চাঙি, সাবেক এবং ওয়া এই কয়েকটি মগী শব্দ ছাড়া একটিও বার্মিজ শব্দ খুঁজে পাওয়া যায় না। সুতরাং ভাষার আদান প্রদান যেখানে অনুপস্থিত সেখানে ধর্মের আদান প্রদান কিভাবে সম্ভব? ধর্মের পুনরুজ্জীবনের সাথে সাথে আঘরতারা এখন অপ্রচলিত এবং অবহেলিত হয়ে আছে। রুরি কিন্তু সমাজে এখনো আনাচে কানাছে দু’একজন দেখা যায়। তখনকার দিনে মৃত্যু সৎকার ও শ্রদ্ধাদি কাজ এবং বৌদ্ধধর্ম ভিত্তিক পূজা পার্বণ এদের পৌরহিত্যেই সম্পন্ন হত। এখন বৌদ্ধ ভিক্ষুরা তাদের স্থান দখল করে নিয়েছেন।

বিয়েশাদী থেকে আর যাবতীয় সামাজিক ক্রিয়াকান্ডে পৌরহিত্য করার জন্যে সমাজে আরেক শ্রেণীর লোক আছে যাদেরকে বলা হয় ‘অঝা’। অঝা আসলে বাংলা ওঝাই। তবে চাকমা সমাজে অঝা বলতে বাংলা ধাইকেও বুঝায়, যে প্রসূতির গর্ভ খালাস করে থাকে। অঝারা তুকতাক মন্ত্র জানে তাছাড়া পাহাড়ী চিকিৎসা বিদ্যায়ও কম বেশি দক্ষতা থাকে। অনেক রোগে এদের বনজ ঔষধ অব্যর্থ। অনেক অঝা আবার ভালো সর্পবিদ্যা বিশারদ। এসব কারণে চাকমা সমাজে অঝা আর বৈদ্য শব্দ দু’টি প্রায় সমার্থবোধক। চাকমা ধাই অর্থাৎ স্ত্রী অঝারাও বড় কম যায় না। তাদেরও শিশুরোগ, স্ত্রীরোগ প্রভৃতি বিষয়ে যথেষ্ট অবিজ্ঞতা থাকে। গর্ভস্থ সন্তানের অবস্থান বুঝতে পারে। প্রসবের পক্ষে তেমন বিপজ্জনক মনে হলে হাতের কৌশলে গর্ভস্থ ভ্রূণের সঠিকভাবে সংস্থাপন করে সুপ্রসব করাতে জানে। এসব কারণে চাকমাদের মধ্য প্রসবকালীন শিশু মৃত্যুর হার তুলনামূলকভাবে কম। প্রতি পাড়াতে অভিজ্ঞ অঝা দু’একজন থাকে। বহুু অভিজ্ঞতা যাদের থাকে তাদের ‘রাজ অঝা’ বলে রটে যায়।

পুরুষ অঝাদের কিন্তু এখন খুব আকাল। সমাজে শিক্ষা সম্প্রচারণের সাথে সাথে পুরনো দিনের পূজাপাঠ অনেক কমে গেছে।তাছাড়া অর্থনৈতিক কারণেও এসমস্ত পূজা অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা এখন আর সম্ভব হয়ে উঠেনা। তাই সমাজে অঝাদের সংখ্যাও খুব কমে গেছে। চাকমাদের বিবাহ অনুষ্ঠানে অঝাদের পৌরোহিত্য অপরিহার্য, সে কারণে এখনও এরা টিম্ টিম্ করে টিকে রয়েছে।

পূজা পার্বণে ও পশুপাখি বলি দেওয়ারও একটা নির্দিষ্ট বিধান আছে। যে সমস্ত পূজায় বলি দেওয়ার বিধান থাকে সেক্ষেত্রে বলি দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট দেবতা ভোগ নিতে রাজী আছেন কিনা ‘আগ্ পাতা’ ফেলে আগে ভাগে তা’ যাচাই করা হয়। দুটো কাঁঠাল পাতার প্রস্থে মাঝামাঝি কেটে ল্যাজার অংশ দুটো তর্জনী, মধ্যমা ও অনামিকার ফাঁকে রেখে দেবতার উদ্দেশ্য তার মতামত প্রার্থনা করে পূজাবেদীর উপড় ছুঁড়ে দেওয়া হয়। পাতা দুটোর একটা যদি সামনের দিক আর অপরটার পিঠের দিক উপড়মুখী করে পরে তাহলে বুঝা যাবে দেবতা ভোগ নিতে রাজী আছেন। দুটো পাতাই যদি পিঠের দিক উপড়মুখো হয়ে পড়ে, তাহলে বুঝতে হবে দেবতা নারাজ। আর যদি দুটোরই সামনের দিক উপড়মুখী হয়ে পড়ে তাহলে বুঝতে হবে দেবতা চালাকী খেলছেন কিংবা ঠাট্টা করছেন। এই উভয় অবস্থাকে দেবতা যতক্ষণ না রাজী হচ্ছেন বার বার আগ্ পাতা ফেলা চলতে থাকে। বলি দেওয়ার সময় শুকর কিংবা হা্স মুরগীর ইত্যাদির শির ছিন্ন না করে শুধু কন্ঠনালী ছিন্ন করে বধ করলে চলে। কিন্তু পাঁঠা, মোষ ইত্যাদি পশুর বেলায় এক কোপে মুণ্ডুটা বিচ্ছিন্ন করাটাই বিধি। ব্যতিক্রম ঘটলে ঘোরতর আশঙ্কা করা হয়ে থাকে। তখন একটির স্থলে ফের জোড়াবলি দিয়ে প্রায়শ্চিত্ত করার বিধান আছে।

Sacrifice ceremony of Chakma
পশু বলি দান, ছবিঃ সংগৃহীত

পরিশেষে একটি কথা এই যে, পূজা পার্বণ একটা সমাজের জন্য শুধু কিছুটা আমোদ প্রমোদ বা কিছু পূজা অর্চনা এরূপ অর্থ বহন করেনা।

যে সমাজে যেই যেই আচার অনুষ্ঠান প্রচলিত থাকে, সেগুলি সেই সমাজের তথা সেই জাতির কুল প্রথা বা কুলাচার। এসবের ভিত্তিমূলে ধর্মীয় প্রভাব বা অন্যবিধ ভাবাদর্শ যাই থাকনা কেন, এগুলির যথাযথভাবে আচরণের মধ্যে দিয়ে জাতীয় বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়। জাতীয় ঐতিহ্য রক্ষিত হয় এবং সর্বোপরি সমাজ জীবনে অখণ্ডতা ও সংঘবদ্ধতা বজায় থাকে। সংঘবদ্ধ ভাবে কুলধর্ম আচরণ করা স্বয়ংবুদ্ধ কর্তৃক প্রশংসিত। লিচ্ছবীদের সপ্ত অপরিহানীয় ধর্মের এটি একটি অন্যতম ধর্ম। এখানে সর্বমোট পঁচিশ প্রকার চাকমা পূজা পার্বণের কথা তুলে ধরা হয়েছে; তবে এর কিছু কিছু তথ্য ইতিপূর্বে স্থানীয় সাপ্তাহিক বনভূমি পত্রিকায় ১৭ই সেপ্টেম্বর ১৯৭৮ ইংরেজী তারিখ থেকে ২৬শে মার্চ ১৯৭১ ইংরেজী পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়।


* চারণ কবি


লেখকঃ শ্রী বঙ্কিম কৃষ্ণ দেওয়ান

চাকমা পূজা পার্বণ, ১৯৮৯ ইং

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here