কেমন আছেন আদিবাসী নারীরা?

0
586

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে এখন গণমাধ্যমে পরিচিত একটাই নাম – মো. আবুল কালাম। কে তিনি , কি তার পরিচয়? অনেকে হয়ত জানেন, আবার অনেকে হয়ত জানেন না৷ যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশি সময় কাটান তাদের কাছে এ ব্যক্তিটি অজানা হওয়ার কথা নয়। কি এমন করেছেন যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে তার নাম?

গত সপ্তাহে উপজেলা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বান্দরবানের আলীকদমে উপজেলা চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হয়েছেন এই আবুল কালাম। মূলত তিনি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর ২৩ মার্চ শনিবার স্থানীয় নয়াপাড়া ইউনিয়নের মেরিনচর পাড়ায় সংবর্ধনা নিতে যান যেখানে ম্রো সম্প্রদায়ের মানুষের বাস। সেখানে সংবর্ধনা নেওয়ার সময় জনসম্মুখে তিনি ম্রো সম্প্রদায়ের এক মহিলাকে জড়িয়ে ধরেন। জানা যায়, মহিলাটি বিধবা।

আবুল কালামের ম্রো নারীকে অশালীনভাবে জড়িয়ে ধরার ভাইরাল হওয়া ছবি, Image Source: Facebook

তাঁর স্বামী মারা গেছেন। এভাবে বিধবা মহিলাকে জড়িয়ে ধরার কারণ জানতে চাওয়া হলে মো. আবুল কালাম প্রথমে বলেন যে মহিলাটি তার ছোটবোনের মত। ছোটবেলা থেকে তাঁর পরিবারের সাথে একটা সম্পর্ক রয়েছে। তাকে নির্বাচনের কাজে সহায়তা করেছেন অনেক৷ তার জন্য অনেক কেঁদেছেন। তিনি তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য জড়িয়ে ধরেছিলেন। (সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন পত্রিকা, যমুনা টিভি)

আবার, অপরদিকে একাত্তর টিভি যখন কালামের সাথে সরাসরি কথা বলে, তখন তার মুখে শোনা যায় নতুন কথা। মহিলাটি নাকি তাকে দেখে কেঁদে দিয়েছিলেন। কালামের মনে হচ্ছিল মহিলাটি পড়ে যাবেন তাই তাঁর হাত ধরেছিলেন। মহিলাকে তিনি জড়িয়ে ধরেননি। একাত্তর টিভির সাথে কথাবার্তার সময় দেখা যায়, তিনি বারবার প্রসঙ্গ থেকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। তিনি শুধু বলছিলেন, যদি তার কথা বিশ্বাস করা না হয় সেক্ষেত্রে সেই মহিলার সাথে যোগাযোগ করা হোক।

আবুল কালামের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগে মামলা, কালের কণ্ঠ, ১০ জুন ২০১০

এর পূর্বেও কালামের বিরুদ্ধে শ্লীনতাহানির অভিযোগে মামলা করেন একই উপজেলা পরিষদের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান শিরীন আক্তার। যদিও সেই যাত্রায় বেঁচে যান আবুল কালাম (সূত্র: কালের কণ্ঠ; ১০ জুন ২০১০)। পরে তার বিরুদ্ধে সেই মামলার জন্য তদন্তেরও নির্দেশ দেওয়া হয় (সূত্রঃ কালের কণ্ঠ, ৮ মার্চ, ২০১৭)

যারা ছবিগুলো দেখেছেন, তারা হয়তো দেখেছেন জড়িয়ে ধরা অবস্থায় মহিলাটির মুখে এক ধরণের বিরক্তিভাব ফুটে উঠেছিল। তিনি বারবার চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন নিজেকে কালামের হাত থেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার। কিন্তু কালাম জোরপূর্বক মহিলাকে ধরেছেন যা এক দুইটা ছবিতে কালামের হাতের দিকে লক্ষ করলে দৃশ্যমান। একজন নারীকে অশালীনভাবে জড়িয়ে ধরা কোন শিষ্টাচারের মধ্যে পড়ে না। মহিলা ছিলেন অত্যন্ত বিব্রত।

আবুল কালামের ম্রো নারীকে অশালীনভাবে জড়িয়ে ধরার ভাইরাল হওয়া ছবি, Image Source: Facebook

কালামের পক্ষ নিয়ে একজন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন যে, কালাম সাহেব সবার সাথে এভাবেই ছবি তুলেন। কারণ তিনি খুব সরল প্রকৃতির মানুষ। তিনি তার এলাকার লোকজনদের খুব ভালোবাসেন। তিনি যাকে তার ছোটবোন সমতুল্য দাবি করছেন, তার সহকর্মীও দাবী করছেন তাই বলে কি তিনি প্রকাশ্যে জড়িয়ে ধরার অধিকার পান? একজন জনপ্রতিনিধির কাছ থেকে কি পার্বত্য অঞ্চলের মানুষেরা এটাই আশা করেন? বিনা অনুমতিতে কোন নারীকে জড়িয়ে ধরতে পারেন না সে জনপ্রতিনিধিই হোক কিংবা সাধারণ মানুষ।

পার্বত্য অঞ্চলের মানুষ বলেন কিংবা সমতল অঞ্চলের মানুষ বলেন, বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে আমরা কখনো কাণ্ডজ্ঞানহীন এ ধরনের জনপ্রতিনিধির উপস্থিতিকে মেনে নিতে পারি না। তিনি আবার জনগণের ভোটেই নির্বাচিত প্রতিনিধি।

আবুল কালামের ম্রো নারীকে অশালীনভাবে জড়িয়ে ধরার ভাইরাল হওয়া ছবি, Image Source: Facebook

মহিলাকে জড়িয়ে ধরার সময় সেখানে অনেক ম্রো সম্প্রদায়ের লোকজনও ছিলেন। তারাও দেখছিলেন। কিন্তু কোন প্রতিবাদের চিত্র দেখা যায়নি। একাত্তর টিভিতে যখন দেখা যায়, মো. আবুল কালাম নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের জন্য বারবার বলছিলেন মহিলার সাথে যোগাযোগ করার জন্য তখনই স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায় পার্বত্য অঞ্চলের নারীদের অনিরাপত্তার বিষয়।

আমার কল্পনার চোখে ভেসে আসে সেই মহিলার ক্রন্দনরত চেহারা। এই বিধবা মহিলাকেও কতই মানসিকভাবে নির্যাতনের মধ্যদিয়ে যেতে হচ্ছে যিনি কিনা স্বামীকে হারিয়ে দিনের পর দিন মানসিকভাবে যন্ত্রণার মুখে ছিলেন। ছবিগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসে আমরা হয়ত আশা করেছিলাম এর সুষ্ঠু বিচারের, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি মোতাবেক আমরা সেই বিধবা নারীর ক্ষতিসাধন ছাড়া আর কিছুই করতে পারিনি। তাঁর নিরাপত্তার দায়িত্ব কি এখন সেই জনপ্রতিনিধির হাতেই ছেড়ে দিবে সমাজ?

আদিবাসী সমাজ স্বভাবতই প্রান্তিক, আর এখানে প্রান্তিকতার কিনারায় রয়েছেন আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর নারীরা। আর এ নারীদের উপর সহিংসতা, যৌন হয়রানী, নিপীড়ন কিংবা ধর্ষণ কেবলই আদিবাসীদের উপর অব্যাহত জাতিগত কর্তৃত্বপরায়ণতারই বহিঃপ্রকাশ।

আবুল কালামের ম্রো নারীকে অশালীনভাবে জড়িয়ে ধরার ভাইরাল হওয়া ছবি, Image Source: Facebook

আমরা ইতিপূর্বেও দেখেছি আদিবাসী নারী নিপীড়ন করে পার পেয়ে যাওয়ার নজির। তারই সূত্র ধরে গতকাল ভুক্তভোগী ম্রো নারী ও তাঁর ভাইকে সামনে রেখে একটা সংবাদ সম্মেলন করা হয়। কোন নির্ভরযোগ্য গণমাধ্যম সেখানে ছিল বলে জানা যায় না। উপস্থিত সাক্ষাতকার গ্রহণকারীর শুরুর প্রশ্নগুলোকে সাংবাদিকতার ভাষায় বলা চলে “লিডিং কোশ্চেন”। আকাঙ্ক্ষিত উত্তর উল্লেখ করে প্রশ্ন করাকে অবশ্যই মানসম্মত সংবাদ সম্মেলন বলা চলবে না। এছাড়া এটাও স্পষ্ট যে, কথিত সংবাদ সম্মেলনে নারীটির বক্তব্যকে প্রভাবিত করা হচ্ছিল। ক্ষমতাসীন আবুল কালামের ক্ষমতার জোরেই সংবাদ সম্মেলনের নাটক মঞ্চস্থ করা হয়েছে, এই জিনিসটা সহজেই অনুমেয়।

প্রভাব খাটিয়ে ভিক্টিমকে দ্বারা মিথ্যা বলানো সম্ভব, কিন্তু ছবিগুলোতে তাঁর চেহারায় যে প্রকাশ পেয়েছে বিরক্তিভাব। এটাকে কি আর মিথ্যা বলা যায়? ছবি কথা বলে। ভাইরাল হওয়া ছবিগুলো দেখলেই বোঝা যায়, সেই ম্রো নারীর চেহারায় শুধুই বিরক্তির ছাপ। তাঁর চেহারায় বিন্দুমাত্র খুশির ছাপ নেই, আছে বরং অস্বস্তির ছাপ।

আদিবাসী নারীদের প্রতি যৌন সহিংসতার চিত্রের ভয়াবহতা বুঝতে হলে আমাদের নিচের পরিসংখ্যানের সাহায্য নিতে হবে।

কাপেং ফাউন্ডেশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০০৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৬ সালের  সেপ্টেম্বরের মধ্যে আদিবাসী নারী এবং মেয়ের প্রতি সহিংসতার কমপক্ষে ৪৬৬টি ঘটনা রিপোর্ট হয়।[1] কাপেং ফাউন্ডেশনের রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১৪ সালে ৫০ জন ধর্ষণের শিকার, ধর্ষণের প্রচেষ্টার শিকার এবং গণধর্ষণের শিকার আদিবাসী নারী ও শিশুর বিপরীতে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের রিপোর্ট অনুযায়ী এমন ঘটনার শিকার মূলধারার বাঙালি নারী ও মেয়ের সংখ্যা ৬১৫ জন।

শুধু ২০১৪ সালের হিসাব অনুযায়ী আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে এমন যৌন নিপীড়নের শিকার নারী ৭.৫২%, যারা কিনা দেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র ১.৮% অপরদিকে বাকি ৯২.৮% ভিক্টিম বাঙালি সম্প্রদায়ের যারা কিনা দেশের মোট জনসংখ্যার ৯৮.২%।[2] পরিসংখ্যানের তথ্য থেকে এটা পরিষ্কার যে আদিবাসী নারীর প্রতি যৌন নিপীড়নের প্রবণতার পরিমাণ বাঙালি নারীর প্রতি যৌন নিপীড়নের চেয়ে বেশি। পাহাড়ে এবং সমতলে আদিবাসী নারীর প্রতি যৌন নিপীড়নের ক্ষেত্রে দেখা যায় যৌন নিপীড়নকারী প্রায় সবসময়ই বাঙালি।

সিএইচটি কমিশনের রিপোর্ট অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘটিত এমন ডকুমেন্টেড ঘটনার ২১৫টিতে কোন যৌন নিপীড়নকারীই সাজা পায়নি।[3]

আদিবাসী নারীর প্রতি যৌন নিপীড়ন একটি সিস্টেমেটিক নিপীড়ন, একজন আদিবাসী নারী শুধু নারী হওয়ার কারণে এমন যৌন নিপীড়নের শিকার হয় না, এক্ষেত্রে তার আদিবাসী পরিচয়টাও এমন নিপীড়নের এক বড় কারণ।


[1] Kapaeeng Foundation (2016) Human Rights Report 2015 on Indigenous Peoples in Bangladesh ed. Mong Shanoo Chowdhury and Pallab Chakma, Dhaka.

[2] Kapaeeng Foundation (2015) Human Rights Report 2014 on Indigenous Peoples in Bangladesh, ed. Mong Shanoo Chowdhury and Pallab Chakma, Kapaeeng Foundation, Dhaka

[3] Chittagong Hill Tracts Commission (2014) Marginalization and Impunity: Violence against Women and Girls in the Chittagong Hill Tract, Dhaka.


লেখকঃ জ্যোতিষ্ক চাকমা, আইন বিভাগের শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here