আদিবাসী সংস্কৃতি: বিশ্বায়নের প্রভাব

0
107

আধুনিক সভ্যতার প্রেক্ষাপটে বিশ্বব্যাপী বিশ্বায়নের যে ব্যাপ্তি বা প্রভাব তা থেকে আমরা মুক্ত নই। বিশ্বায়ন যেভাবে সভ্যতার পাশাপাশি এগোচ্ছে, সেই সাথে বৃহৎ হতে ক্ষুদ্র জাতিস্বত্তার মধ্যেও দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে। এ পরিবর্তন অনেক ক্ষেত্রে আমাদের মাঝে বিরুপ প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে আমাদের মত ক্ষুদ্র জাতিস্বত্তার যে এর প্রভাব পড়ছে তা স্বকীয় অস্তিত্ত রক্ষার ক্ষেত্রে অনেকটা অশনিসংকেট বৈকি। পৃথিবীর ক্ষুদ্র-বৃহৎ জাতিস্বত্তার নিকট নিজস্ব সংস্কৃতি এক অনন্য সম্পদ। এতে কারও সংস্কৃতি সমৃদ্ধশালী, কারও সংস্কৃতি তত সমৃদ্ধ নয়। এখানে উল্লেখ্য যে, একজন মা শত হলেও তার বিকলাঙ্গ সন্তানকে যেমন- কখনও ত্যাগ করে না, তেমনি একজন সংস্কৃতিবান মানুষ সে যত ক্ষুদ্র জাতিস্বত্তার হোক না কেন সে কখনও নিজস্ব সংস্কৃতি কৃষ্টি অবহেলা করতে পারে না।

বর্তমান প্রেক্ষাপটকে বিশ্লেষন করলে দেখা যাবে, আদিবাসী জীবন ও সংস্কৃতি বর্তমানে কঠিন সময় অতিক্রম করছে। বিশ্বায়নের ডামাডোলে আদিবাসী সংস্কৃতি আজ আরও সংকীর্ণ এবং কোনঠাসা হয়ে পড়েছে। একদিকে বৃহৎ জাতি-গোষ্ঠীর প্রভাব অন্যদিকে বিশ্বায়নের প্রভাব এ দুটোর পেছনে অনেকটা দোদুল্যমান। ভাষাগত ও পোশাক-পরিচ্ছেদের ক্ষেত্রে দ্রুত সংকরায়ন ঘটছে বোদ্ধা মহলে তাও অনেকটা ভাবিয়ে তুলেছে। এটা বিশেষ করে উচ্চ এবং উচ্চ মধ্যবিত্ত পর্যায়ে লক্ষ্য করা যায়। অনেকে একে আধুনিকতা কিংবা বিশ্বায়নের প্রভাব বলে উড়িয়ে দিতে চাইবেন, এ ক্ষেত্রে বলা যায় যে, যে জাতি বা গোষ্ঠী যত আধুনিক কিংবা শিক্ষায় অগ্রসরমান হোক না কেন, তার নিজস্ব, কৃষ্টি, সংস্কৃতি রক্ষন-বর্জন-পোষণ তার চিন্তা-চেতনার উপরই নির্ভর করে। আধুনিক কিংবা বিশ্বায়নের মাতাল তালে যদি গা ভাসিয়ে সর্বস্ব বিলিয়ে দেয় তাহলে তা থেকে উত্তোরণের পথ যে ক্ষীন তা নূতন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। সমাজে আজ যারা নেতৃস্থানীয় সমাজপতি, নীতি নির্ধারক কিংবা শিক্ষা, বিত্ত বৈভবে প্রতিষ্ঠিত তারা যদি নিজেদের কৃষ্টি সংস্কৃতি বিষয়ে উদাসীন হন তাহলে আমরা এক্ষেত্রে কতটুকু সফলতা লাভ করবো তা সহজেই বোধগম্য। যারা নিন্ম বিত্ত বা সাধারণ গোষ্ঠী যতই আমরা একে নিয়ে হা-পিত্যিস করি না কেন, তা কোন ভাবই আশার বাণী বয়ে আনতে পারে না। আর একে টিকিয়ে কিংবা উজ্জীবিত রাখতে হলে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষকতা, সহমর্মিতা সর্বোপর সহযোগীতা প্রয়োজন।

আকাশ সংস্কৃতি বা বিশ্বায়নের দাপটে পৃথিবীর অন্যান্য ক্ষুদ্র পরিসর সংস্কৃতির মতো আমদের সংস্কৃতিও আজ হুমকির সম্মুখীন। একুশ শতকের বিশ্বায়ন, মুক্ত বাজার অর্থনীতি, শিল্পের বিকাশ এবং আকাশ সংস্কৃতির যুবকাষ্ঠে বিবর্তনের করাল গ্রাসে আমাদের ক্ষুদ্র জাতিস্বত্তার সংস্কৃতি, কৃষ্টি বিলীন হয়ে যাবে। বর্তমানে শেষ অস্তিত্ব রক্ষনাবেক্ষনে আমরা যদি যত্নশীল না হই, তাহলে অচীরে যেটুকু আছে তাও হারাতে হয়ত বেশি সময়ের প্রয়োজন হবে না। তাই আত্মপরিচয় নিয়ে মান্ডাতা আমলের আমাদের মাঝে যে হীনমন্যতা বোধ রয়েছে তাকে অতিক্রম করতে হবে। সেই সাথে নিজেদের সংস্কৃতি, কৃষ্টি, ভাষা ধরে রাখার মানসিক শক্তি অর্জন করতে হবে। তাইলে বাইরে যত নান্দনিক মুখরোচক সংস্কৃতি আমাদের প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করুক না কেন আমরা তা থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারবো। রাষ্ট্রীয় কিংবা বৃহত্তর পরিসরে আমাদের ভাষা-সংস্কৃতি প্রসারে আশাব্যঞ্জক পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় আমরা অনেকেই বৃহত্তর পরিসরে নিজেদের অবহেলিত এবং অসহায়ভাব পোষন করি। সংস্কৃতি, কৃষ্টি রক্ষা কিংবা চর্চার ক্ষেত্রে এটি মুখ্য নয়। বরং রাষ্ট্র-যন্ত্র এবং অন্যদিকে পৃষ্ঠপোষক কালে আমরা যদি তার সদ্ব্যবহারে যত্নশীল না হই, এবং নয়-ছয় করার স্বপ্নে বিভোর থাকি, তাহলে ভাগ্যদেবীও আমাদের ভাগ্য পরিবর্তন করার শক্তি রাখে না। বর্তমান বিশ্বায়নের প্রেক্ষাপটে ভাষা, আচার-ব্যবহার, নৈতিকতা, আনুষ্ঠানিক অনানুষ্ঠানিক প্রতিক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন এসেছে। বিশ্বায়নের তাল-মাতাল হাওয়া আমাদের মতো ক্ষুদ্র জাতিস্বত্তার সংস্কৃতির পালেও লেগেছে। সেই সাথে পরিবর্তন হচ্ছে সংস্কৃতি এবং চিন্তা চেতনা। আর পরিবর্তনের মাত্রা যদি অধিক হয় কিংবা আমাদের বেহজমির কারণ হয়ে যায় তাহলে তার ফলে কল্যানের চাইতে অকল্যান হবে বৈকি। অন্যদিকে কালের বিবর্তন সর্বক্ষেত্রে আমরা এড়িয়ে চলতে পারব না। আর একে গ্রহন-বর্জন করার প্রয়োজনীয়তার পরিমাণ আমাদের হজম ক্ষমতার মধ্যেই মূলত এটি বর্তায়। অন্যদিকে একে গড্ডলিকা প্রবাহেও গ্রহন করতে পারি না। তাই বিশ্বায়নের ডামাডোলে যে যতই উতল মাতাল হোক না কেন ব্যক্তি-জাতি-গোষ্ঠী স্বাতন্ত্রিক হিসেবে নিজেদের শেষ শক্তি দিয়ে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করা আমাদের জন্য উত্তম পন্থা নয় কী?


আনন্দ মিত্র চাকমা, সহকারী শিক্ষক, মোনঘর আবাসিক বিদ্যালয়, রাঙামাটি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here